ঢাকা সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

এক জমি, তিন আয়

এক জমি, তিন আয়
×
×

নিজ বাগানে বগুড়া সদর উপজেলার খামারকান্দি গ্রামের কৃষক কামাল হোসেন সমকাল

 লিমন বাসার, উত্তরাঞ্চল

প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৩১

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাগানে ঢুকতেই চোখে পড়ে সারি সারি গাছ। তাতে ঝুলছে সবুজ ফল। একটু নিচে তাকালে হলুদ। কোথাও মৌসুমি সবজি। একই জমি। অথচ ফসলের কত আয়োজন! ওপরের স্তরে পেঁপে। নিচে হলুদ–সবুজ সবজি। জমির ফাঁকা জায়গাটুকু যেন এখানে অলস বসে নেই।

এভাবে পাঁচ বিঘা জমির হিসাব বদলে দিয়েছেন বগুড়া সদর উপজেলার খামারকান্দি গ্রামের কৃষক কামাল হোসেন। পেঁপের পাশাপাশি হলুদ ও মৌসুমি সবজি চাষ করে একই জমি থেকে তুলছেন বাড়তি আয়। শুধু ফসল নয়, নিজের উৎপাদিত চারা বিক্রি করেও আয় করছেন তিনি।

এক জমি, একাধিক ফসল
চার বছর আগে এক বিঘা জমিতে পেঁপে চাষ দিয়ে শুরু কামালের। ফলন ভালো। বাজারেও রয়েছে চাহিদা। ধীরে ধীরে বাড়িয়েছেন জমি। এখন পেঁপের বাগান পাঁচ বিঘায়। প্রায় আট বছর ধরে শাহী জাতের পেঁপে নিয়ে কাজ করছেন। তবে পেঁপের সারির মাঝের জমি ফেলে রাখেননি। সেখানে করেছেন হলুদ ও মৌসুমি সবজি।
আগে একই জমিতে ফুলকপি, বেগুন, আলুসহ বিভিন্ন ফসল চাষ করতেন। পরে কৃষি বিভাগের পরামর্শে পেঁপে চাষে আসেন। এখন তাঁর চাষাবাদের কৌশল একটু আলাদা। একটি ফসলের জন্য পুরো জমি আটকে না রেখে একই জমিতে একাধিক ফসলের সুযোগ তৈরি করেছেন। এটি আন্তঃফসল বা সাথি ফসলব্যবস্থার স্থানীয় একটি প্রয়োগ। কামাল হোসেনের কথা খুব সহজ, জমিতে জায়গা যখন আছে, সেখানে আরেকটি ফসল করলে বাড়তি টাকা আসে।

কামালের এ ধারণার পেছনে কৃষিবিজ্ঞানেরও যুক্তি আছে। কৃষি তথ্য সার্ভিসের গবেষণাভিত্তিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপযুক্ত সাথি ফসল যুক্ত করে একই জমিতে একাধিক ফসল চাষ করলে জমির উৎপাদনশীলতা ও মোট মুনাফা বাড়ানোর সুযোগ থাকে। গবেষণায় এর কার্যকারিতা বোঝাতে ব্যবহার করা হয় ল্যান্ড ইকুইভ্যালেন্ট রেশিও বা এলইআর। সহজ ভাষায়, একই জমিতে একাধিক ফসল চাষ করে যে উৎপাদন পাওয়া যায়, সেই উৎপাদন আলাদাভাবে একক ফসল হিসেবে করতে কতটুকু জমি লাগত–এ দুইয়ের তুলনাই এলইআর। অনুপাত একের বেশি হলে আন্তঃফসল ব্যবস্থায় জমি ব্যবহারের বাড়তি সুবিধা রয়েছে বলে ধরা হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, হলুদের সঙ্গে বিভিন্ন সাথি ফসলের সমন্বয়ে দুইয়ের বেশি এলইআর পাওয়া যাবে। 

এক গাছে দুই বছরের আয়
কামালের বাগানের আরেকটি বৈশিষ্ট্য–একই গাছ থেকে দীর্ঘ সময় আয় নেওয়া। তাঁর হিসাবে, একটি পেঁপে গাছ থেকে প্রায় দুই বছর পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়। প্রথম বছর পাকা পেঁপে। পরের বছর পুরোনো গাছ থেকে কাঁচা পেঁপে বিক্রি করেন তিনি।
কোনো কোনো পেঁপের ওজন ছয় থেকে সাত কেজি পর্যন্ত হয়। তবে গড়ে দুই থেকে তিন কেজি। একটি গাছ থেকে এক মৌসুমে দুই থেকে চার মণ পর্যন্ত পেঁপে পাওয়া যায় বলে জানান কামাল।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পেঁপে দ্রুত বর্ধনশীল ফসল। সাধারণত পাঁচ থেকে ছয় মাসের মধ্যে ফুল আসে। আট থেকে ৯ মাসের মধ্যে পাকা ফল সংগ্রহ শুরু করা যায়। ফলে ফলনের জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয় না। 

চার লাখ খরচ, ১৫-১৬ লাখ বিক্রি
পাকা ও কাঁচা–দুই ধরনের বাজার থাকায় পেঁপেতে কৃষকের লাভের সম্ভাবনা বেশি। বাজারদর ও সময় বুঝে পণ্য বিক্রির ধরন ঠিক করতে পারলে লোকসান হয় না জানালেন কামাল হোসেন। চলতি বছর পাঁচ বিঘা জমিতে পেঁপে চাষ করেছেন। খরচ হয়েছে প্রায় চার লাখ টাকা। বাঁশ, সার ও জৈব সারে গেছে উল্লেখযোগ্য অংশ।
কামাল হোসেনের আশা, সাড়ে চার বিঘা জমির পাকা পেঁপে থেকে এবার ১৫ লাখ থেকে ১৬ লাখ টাকা বিক্রি হবে। বাজারদর ভালো থাকলে এই আয় হতে পারে। তবে ১৫-১৬ লাখ টাকা বিক্রির সম্ভাব্য হিসাবকে সরাসরি লাভ বলা ঠিক নয়। কারণ এতে জমির মূল্য, পারিবারিক শ্রম, পরিবহন, বাজারজাতকরণসহ সব ব্যয় ধরা হয়নি। তবে বাগানের পাশেই বাইপাস সড়ক বাড়তি সুবিধা দিয়েছে তাঁকে। বাগান থেকে দ্রুত পেঁপে নেওয়া যায় বগুড়া শহরের চেলোপাড়া পাইকারি বাজারে। দ্রুত পচনশীল ফলের ক্ষেত্রে উৎপাদনের পর যত দ্রুত বাজারে পৌঁছানো যায়, কৃষকের ঝুঁকিও তত কমে।

ফসলের সঙ্গে চারার ব্যবসা
কামালের কৃষি এখন শুধু পেঁপে বিক্রিতে থেমে নেই। নিজেই বীজ সংগ্রহ করেন। তৈরি করেন চারা। নিজের জমির প্রয়োজন মিটিয়ে অন্য কৃষকদের কাছেও বিক্রি করেন। চলতি বছর প্রায় দুই হাজার শাহী জাতের চারা বিক্রি করেছেন। এতে অতিরিক্ত আয় হয়েছে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা।
তাঁর বাগান দেখে আশপাশের কৃষকরাও পেঁপে চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। কৃষক লাভলু কামালের বাগান দেখে প্রায় ৫০ শতক জমিতে পেঁপে চাষ করেছেন। লাভলুর ফলন ভালো হয়েছে। তবে চলতি মৌসুমে বাজারদর কিছুটা কম থাকায় প্রত্যাশিত লাভ হচ্ছে না। তারপরও লোকসানের আশঙ্কা নেই বলে জানান তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা লাভলু সরকার বলেন, ‘কামাল চাচার বাগানে অনেক বড় বড় পেঁপে হয়েছে। বড় অফিসসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ বাগানটি দেখতে আসেন।’

বগুড়ায় বাড়ছে পেঁপের আবাদ
কামালের সাফল্যের পাশাপাশি বগুড়ায় পেঁপে চাষের বিস্তারও বাড়ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) মাহফুজ আলম বলেন, বর্তমানে জেলায় প্রায় ৬৫০ হেক্টর জমিতে পেঁপে চাষ হচ্ছে। গ্রীষ্মকালীন সবজি চাষ হচ্ছে ১০ হাজার ২০২ হেক্টর জমিতে। আগাম শীতকালীন সবজি চাষ হয়েছে ১ হাজার ২৩৭ হেক্টর জমিতে।
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা কে এম মনসুর রহমান জানান, তিন বছর আগে কৃষক কামালের সঙ্গে পরিচয়ের পর তাঁকে শাহী জাতের পেঁপে চাষে উদ্বুদ্ধ করেন। পেঁপের সঙ্গে হলুদের মতো সাথি ফসল চাষ করায় তাঁর মুনাফা বাড়ছে। গত বছরও কামাল ১৫ থেকে ১৬ লাখ টাকার পেঁপে বিক্রি করেছেন বলে জানান তিনি। এবারও একই রকম সাফল্যের আশা করছেন।
কৃষক কামাল হোসেন বলেন, ‘অন্যান্য ফসলে বাজারে ধস নামলে লোকসানের ভয় থাকে। পেঁপেতে দাম একটু কম হলেও লাভ থাকে। তাই গতানুগতিক চাষাবাদের পাশাপাশি নতুনদের পেঁপে চাষে এগিয়ে আসা উচিত।’ তাঁর পরামর্শ, নিয়মিত সার প্রয়োগ এবং গাছের মধ্যে সঠিক দূরত্ব রাখা গেলে ফলন ও ফলের আকার ভালো হয়।
 

আরও পড়ুন

×