মৃত মায়ের মুখ শেষবার দেখতে শূন্যরেখায় মেয়ে
মায়ের মরদেহ শেষবারের মতো দেখতে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন তার মেয়ে। ছবি- সমকাল
মেহেরপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬ | ২২:০৬
কাছাকাছি বসবাস হলেও মাঝে দুই দেশের সীমান্ত। তাই দেখা-সাক্ষাতের সুযোগ মিলত কালেভদ্রে। মোবাইল ফোনেই মা মোছা. জায়রার (৭০) সঙ্গে যোগাযোগ হতো হাফিজা খাতুনের। বার্ধক্যজনিত রোগে গত বুধবার রাতে মারা যান ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের নদীয়া জেলার বাসিন্দা মোছা. জায়রা।
শেষবারের মতো তার মুখ দেখার জন্য বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সঙ্গে যোগাযোগ করেন বাংলাদেশের বাসিন্দা মেয়ে হাফিজা। ভারতীয় স্বজনেরাও এ জন্য ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) স্থানীয় কর্মকর্তাদের কাছে বিষয়টি জানান।
অবশেষে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর উদ্যোগে বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মোছা. জায়রার মরদেহ আনা হয় মুজিবনগর সীমান্তের মেইন পিলার ১০৯-এর কাছাকাছি নাজিরাকোনা পশ্চিমপাড়া এলাকায় শূন্যরেখায়। সেখানে কান্নায় ভেঙে পড়েন মুজিবনগরের ভবানীপুর গ্রামে বসবাসরত মেয়ে হাফিজা খাতুন। তার সঙ্গে ছিলেন স্বামী ফিকির আলীও।
হাফিজা বলেন, ‘সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া আমাদের অনেক দূরে রেখেছে। মা অসুস্থ ছিল। তবুও দেখতে যেতে পারিনি। ফোনেই খোঁজ নিতাম। আজ মায়ের শেষ বিদায়ে দুই দেশের দূরত্বটা কমিয়ে আমাদের দেখা করার সুযোগ দেওয়ায় সকলকে ধন্যবাদ জানাই।’
মায়ের লাশ বহন করে নিয়ে আসা হাফিজার ভাই সজিবুল হক বলেন, ‘দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যরা আমাদের প্রতি যে মানবিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন তাদের আমরা সাধুবাদ জানাই। কাছাকাছি বসবাস হলেও সীমান্তের কারণে দেখা-সাক্ষাৎ করার কোনো সুযোগ নেই। ফোনের মাধ্যমে আমার বোন মায়ের খোঁজখবর নিতেন। মা আজ চলে যাচ্ছেন। মাকে শেষ বারের মতো দেখার বোনের আকুতি দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী সদস্যরা খুবই আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেছেন। আমরা তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ।’
এতে সীমান্তের নিরাপত্তা রক্ষার পাশাপাশি মানবিক পরিস্থিতিতে এমন সহানুভূতিশীল ভূমিকা দুই দেশের মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির সম্পর্ক আরও দৃঢ় করবে বলেও মনে করেন তিনি।
মুজিবনগর উপজেলা প্রেস ক্লাবের সভাপতি ওমর ফারুক প্রিন্স বলেন, সীমান্তের শূন্যরেখায় মায়ের শেষ দর্শনের এই দৃশ্য যেন বার্তা দেয়, রাষ্ট্রের সীমানা আলাদা হতে পারে, কিন্তু মানবিকতার কোনো সীমানা নেই। বর্তমানে সীমান্তগুলোতে যেভাবে পুশইনের ঘটনা ঘটছে তাতে বর্ডার সব সময় উত্তপ্ত থাকছে। এর মধ্যে দুই দেশের সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর এই মানবিক উদ্যোগকে সাধুবাদ জানান তিনি।
এ সময় বাংলাদেশের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন মুজিবনগরের নাজিরাকোনা বিজিবি ক্যাম্পের কমান্ডার হাবিলদার মো. শরিফুল ইসলামসহ পাঁচ সদস্য। ভারতের পক্ষে ছিলেন বিএসএফের পাথরঘাটা ক্যাম্পের ইন্সপেক্টর এস কে রয়সহ পাঁচ সদস্য।
হাবিলদার মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, মোছা. জায়রা পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার চাপড়া থানার গোবিন্দপুর গ্রামের বাসিন্দা। তার মেয়ে হাফিজার স্বামীর বাড়ি বাংলাদেশের মুজিবনগর উপজেলার ভবানীপুর গ্রামে। মায়ের মুখ শেষবারের মতো দেখতে তিনি আকুতি জানান। ভারতে বসবাস করা আত্মীয়-স্বজনেরা বিএসএফের কাছে আবেদন করলে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে আলোচনা হয়। পরে দুই বাহিনীর সমন্বয়ে সীমান্তের শূন্যরেখায় মরদেহ দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়।
- বিষয় :
- মরদেহ