চুয়েট
১৮ কর্মদিবসে ৮৬৪ ক্লাস ও ৩৩ পরীক্ষা বাতিল
অনিশ্চয়তায় সাড়ে ৪ হাজার শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন
সারোয়ার সুমন ও ফাহিম রেজা, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬ | ০৯:৫২ | আপডেট: ১৬ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:৪৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে সংকটের সমাধান না হওয়ায় অনিশ্চয়তার মধ্যে আজ শুক্রবার থেকে পূজার ছুটিতে যাচ্ছে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)। এরই মধ্যে গত ১৮ কর্মদিবসে বাতিল হয়েছে ৩৩টি সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা ও ৮৬৪টি ক্লাস। ল্যাব কার্যক্রমও বন্ধ থাকায় সাড়ে চার হাজার শিক্ষার্থীর নষ্ট হয়েছে ৫ লাখ ৬৭ হাজার শিক্ষাঘণ্টা।
তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী নোমান আহমদ নাঈম মৃধা বলেন, ‘টানা ২৪ দিন ক্লাস-ল্যাব বন্ধ থাকায় আমরা সেশনজট, চাকরির সার্কুলারে আবেদনের সুযোগ হারানো, বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও স্কলারশিপের সময়সীমা মিস করাসহ ভবিষ্যতে অপূরণীয় ক্ষতির আশঙ্কায় আছি। একটি প্রশাসনিক সংকটের মূল্য যেন হাজারো শিক্ষার্থীকে তাদের ভবিষ্যৎ দিয়ে দিতে না হয়।’
পূজার পর ক্লাস শুরু হলে সে ক্ষেত্রে পরীক্ষা শুরু করতে কত দিন সময় লাগতে পারে– জানতে চাইলে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক মইনুল ইসলাম বলেন, ‘এটা সাধারণত পরীক্ষাবিষয়ক সভাপতি, অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট বিভাগের বিভাগীয় প্রধানরা আমাদের পরীক্ষা শুরু করতে চিঠি দেন। তারপর এটি একাডেমিক কাউন্সিলে যায়। সেখান থেকে অনুমোদিত হলে পরীক্ষা শুরু হবে।’
আরও পিছিয়েছে ডব্লিউআরই বিভাগ
চুয়েটে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর মিলিয়ে পাঁচটি অনুষদের অধীনে মোট ১৮টি বিভাগ। তার মধ্যে শুধু স্নাতক পর্যায়ে ১২টি বিভাগ। বর্তমানে চুয়েটে সব মিলিয়ে ২০০-এর অধিক শিক্ষক ও চার হাজার ৫০০-এর অধিক শিক্ষার্থী রয়েছেন। গত বছর বিভাগের নাম পরিবর্তন-সংক্রান্ত আন্দোলনে গিয়ে শিক্ষাজীবন থেকে প্রায় দুই মাস হারান ওয়াটার রিসোর্স ইঞ্জিনিয়ারিং (ডব্লিউআরই) বিভাগের শিক্ষার্থীরা। চলমান আন্দোলনের কারণে তারা আরও এক ধাপ পিছিয়েছেন।
কার কত পরীক্ষা বাতিল হলো
চুয়েটের স্নাতকোত্তর পর্যায়ে বর্তমানে কোনো পরীক্ষা চলমান নেই। অন্যদিকে, গত ২২ সেপ্টেম্বরের পর থেকে পূজার ছুটির আগ পর্যন্ত স্নাতক পর্যায়ে বিভিন্ন বিভাগের মোট ৩৩টি সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা বাতিল হয়েছে। এর মধ্যে ষষ্ঠ সেমিস্টারের সাতটি, সপ্তম সেমিস্টারের ২২টি এবং চতুর্থ সেমিস্টারের চারটি পরীক্ষা বাতিল হয়।
বিভাগভিত্তিক হিসাবে, ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ষষ্ঠ সেমিস্টারের তিনটি এবং বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চারটি পরীক্ষা বাতিল হয়েছে। সপ্তম সেমিস্টারে ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং, মেকাট্রনিকস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চারটি করে পরীক্ষা বাতিল হয়। এ ছাড়া মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ও ওয়াটার রিসোর্সেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তিনটি করে এবং ম্যাটেরিয়ালস অ্যান্ড মেটালার্জিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের একটি পরীক্ষা বাতিল হয়েছে। পাশাপাশি ওয়াটার রিসোর্সেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চতুর্থ সেমিস্টারের
চারটি পরীক্ষাও বাতিল হয়। এসব পরীক্ষা বাতিলের ফলে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত একাডেমিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
বাতিল হয়েছে ৮৬৪টি ক্লাস
২২ সেপ্টেম্বর থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) স্নাতক পর্যায়ের ১২টি বিভাগের নিয়মিত ক্লাস ও ল্যাব কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। শুক্র ও শনিবার এবং সরকারি ছুটি বাদ দিলে এই সময়ে ১৮টি কার্যদিবসে প্রতিদিন চারটি করে ক্লাসের হিসাবে প্রতিটি বিভাগে ৭২টি করে এবং ১২টি বিভাগে মোট ৮৬৪টি ক্লাস বাতিল হয়েছে। এর পাশাপাশি প্রতি সপ্তাহে দুই থেকে তিনটি করে ব্যবহারিক ক্লাস হওয়ার কথা থাকলেও তা ব্যাহত হয়েছে।
৫ লাখ ৬৭ হাজার শিক্ষাঘণ্টা নষ্ট
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সাড়ে চার হাজার শিক্ষার্থীর জন্য প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত নির্ধারিত সাত ঘণ্টার শিক্ষাসময় বিবেচনায় ১৮ কার্যদিবসে প্রতি শিক্ষার্থীর ১২৬ ঘণ্টা পাঠদানের সময় ব্যাহত হয়েছে। সে হিসাবে সাড়ে চার হাজার শিক্ষার্থীর মোট নষ্ট হওয়া শিক্ষাসময় দাঁড়ায় ৫ লাখ ৬৭ হাজার ঘণ্টা। অর্থাৎ, ক্লাস বন্ধ থাকায় সম্মিলিতভাবে বিপুল পরিমাণ পাঠদান ও শেখার সময় হারিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
পুনরায় সার্কিট হাউসে ফিরলেন উপাচার্য
দুদিন চিকিৎসা নিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল ছেড়েছেন নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. শরীফুল আলম। এরপর তিনি উঠেছেন চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে। তবে হাসপাতালে বসেই ভিসি বলেছেন, কাউকে মুচলেকা দিয়ে সেদিন ক্যাম্পাস ছাড়েননি তিনি। ভিসি হিসেবে যে কোনো সময় চুয়েটে যাবেন তিনি। সরকারের সিগন্যাল রয়েছে।
যা বলছেন শিক্ষার্থীরা
চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী রাসেল আহমেদ বলেন, ‘পরীক্ষা বাতিল হওয়ায় আমাদের শিক্ষাজীবন দীর্ঘায়িত হচ্ছে। অন্যান্য ভার্সিটির তুলনায় আমাদের গ্র্যাজুয়েশন শেষ অনেক দেরিতে হবে। ফলে আমাদের বিভিন্ন চাকরির সুযোগ অনেকাংশে কমে যাবে।’ তিনি বলেন, ‘সময়মতো স্নাতক শেষ করতে না পারলে অনেক সরকারি চাকরির পরীক্ষা মিস হতে পারে। পাশাপাশি চাকরির বয়সসীমা নিয়েও দুশ্চিন্তায় থাকতে হচ্ছে। বিদেশে উচ্চশিক্ষার নির্ধারিত সেশন মিস করলে পরবর্তী সেশনের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হবে।’
- বিষয় :
- চুয়েট