বর্জ্য সরছে, অনিশ্চয়তা কাটছে না
সেন্টমার্টিনে পড়ে থাকা বর্জ্য সংগ্রহ করছেন কর্মীরা। ছবিটি সম্প্রতি তোলা সমকাল
আব্দুর রহমান, টেকনাফ (কক্সবাজার)
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:০২ | আপডেট: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:৩১
| প্রিন্ট সংস্করণ
বুধবার সকাল সাড়ে ৮টা। সেন্টমার্টিন জেটির কাছে পূর্বপাড়ার পশ্চিম সৈকতমুখী এলাকায় পড়ে আছে পচনশীল ও অপচনশীল বর্জ্যের স্তূপ। প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিনসহ নানা ধরনের আবর্জনায় মলিন সৈকত। পাশেই বর্জ্য সংগ্রহে ব্যস্ত পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। কেউ কুড়িয়ে নিচ্ছেন প্লাস্টিক, কেউ সংগ্রহ করছেন পচনশীল বর্জ্য।
দ্বীপের বর্জ্যদূষণ কমাতে ২০২৫ সালে ম্যাটেরিয়ালস রিকভারি ফ্যাসিলিটি (এমআরএফ) বা বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কল্পের কাজ শুরু হয়। পরিবেশ অধিদপ্তরের সঙ্গে ব্র্যাকের তিন বছর মেয়াদি এ চুক্তির প্রথম পর্যায়ের মেয়াদ আগামী ৩০ নভেম্বর শেষ হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের অর্থায়নে ব্র্যাকের বাস্তবায়িত প্রকল্পের আওতায় গত ১১ মাসে প্রায় ১৫০ টন বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। বর্জ্য আলাদা করা, প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার এবং পচনশীল বর্জ্য থেকে জৈব সার তৈরির উদ্যোগও রয়েছে। তবে পর্যটন মৌসুম শুরুর আগেই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে। ফলে দ্বীপের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আশঙ্কা, বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত না করে প্রকল্পের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলে দ্বীপে আবারও বর্জ্য জমতে পারে। এতে সৈকতের পরিবেশের পাশাপাশি সেন্টমার্টিনের প্রবালসমৃদ্ধ প্রতিবেশ ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যও হুমকিতে পড়তে পারে।
দ্বীপজুড়ে বর্জ্য সংগ্রহ
সেন্টমার্টিনের পূর্বপাড়া ছাড়াও বাজারপাড়া, কবরস্থান রোড, ময়নামতি রোড, কোনারপাড়া, নজরুলপাড়া, গলাচিপা ও ছেঁড়াদ্বীপসহ বিভিন্ন এলাকায় বর্জ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। সংগৃহীত বর্জ্য নেওয়া হয় সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশনে (এসটিএস)। সেখানে বাছাই করে পচনশীল ও অপচনশীল বর্জ্য আলাদা করা হয়।
দ্বীপের বিভিন্ন স্থানে স্থাপন করা হয়েছে ৩৬টি বড় কমিউনিটি বিন। বর্জ্য সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত রয়েছেন নয়জন প্রশিক্ষিত কর্মী। তাদের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে তিনটি বর্জ্য সংগ্রহের ভ্যান। এ ছাড়া ১৬টি বিন থেকেও বর্জ্য সংগ্রহের কথা জানিয়েছে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র।
প্রকল্পের একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী মো. ফয়সাল বলেন, ‘প্লাস্টিকের বোতল ও পলিথিনে দ্বীপটি সয়লাব হয়ে যাচ্ছে, যা প্রবালসমৃদ্ধ পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। আমরা প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৪০০ কেজি বর্জ্য সংগ্রহ করে দ্বীপকে পরিচ্ছন্ন রাখার চেষ্টা করছি। এ প্রকল্পের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি নিজের দ্বীপের পরিবেশ রক্ষায় অবদান রাখার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এ ধরনের কার্যক্রম চলমান রাখা দরকার।’
দ্বীপের পরিবেশকর্মী আয়াত উল্লাহ বলেন, ‘বছরব্যাপী বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উদ্যোগ দ্বীপবাসীর মধ্যে স্বস্তি তৈরি করেছে। এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে দ্বীপের পরিবেশ সুরক্ষার পাশাপাশি বর্জ্য থেকে সম্পদ তৈরির উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় বাসিন্দারাও উপকৃত হবেন।’
বর্জ্য থেকে সম্পদ তৈরির উদ্যোগ
সেন্টমার্টিনে সংগৃহীত বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের উপযোগী করে তোলার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে ব্র্যাকের পক্ষ থেকে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্মিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রে এক হাজার কেজি পিইটি প্লাস্টিকের বোতল হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ছাড়া বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে দ্বীপে ইতোমধ্যে একটি গ্যাসিফায়ার এবং ম্যাটেরিয়াল রিকভারি ফ্যাসিলিটি (এমআরএফ) স্থাপন করা হয়েছে। এসব প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহারের পাশাপাশি গ্যাসিফায়ার প্রযুক্তির মাধ্যমে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এ কার্যক্রম এখনও বাস্তবায়িত হয়নি।
অন্যদিকে, পচনশীল বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট সার তৈরির কাজ চলছে। উদ্যোগটি সফল হলে উৎপাদিত সার স্থানীয় কৃষিকাজে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে। এতে বর্জ্যের পরিমাণ কমানোর পাশাপাশি তা সম্পদে রূপান্তরের সম্ভাবনা তৈরি হবে।
উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী মো. ফারুক হোসেন বলেন, ‘ব্র্যাকের সেন্টমার্টিনের প্রতিনিধি আমাদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রে এক হাজার কেজি পিইটি বোতল হস্তান্তর করেছেন। এসব প্লাস্টিক বর্জ্য গ্যাসিফায়ারের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। পরিবেশসম্মতভাবে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হলে দ্বীপের বর্জ্যদূষণ কমাতে ভূমিকা রাখবে।’
তিনি আরও বলেন, পচনশীল বর্জ্য থেকে জৈব সার তৈরির কাজ চলছে। প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হলে কৃষিকাজে ব্যবহারের জন্য এ সার সরবরাহ করা হবে।
সচেতনতা বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে
বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ বাড়াতে বাড়ি বাড়ি প্রচারণা ও উঠান বৈঠক করছেন ব্র্যাকের কমিউনিটি ভলান্টিয়াররা। স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের সচেতন করতে লোকনাট্য, স্টিকার, ব্যানার, বিলবোর্ড ও স্ট্রিট আর্টের মাধ্যমেও প্রচারণা চালানো হয়েছে। পাশাপাশি চারটি স্কুল ও মাদ্রাসার ৩৮০ শিক্ষার্থীকে পরিবেশবিষয়ক কর্মশালায় যুক্ত করা হয়েছে।
দ্বীপের কমিউনিটি ভলান্টিয়ার সালমা আক্তার বলেন, ‘সেন্টমার্টিনে জন্ম ও বেড়ে ওঠার ৩৪ বছরের অভিজ্ঞতায় স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়ে এমন ধারাবাহিক উদ্যোগ খুব একটা দেখিনি। এখন বাড়ি বাড়ি ও উঠান বৈঠকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে কথা বললে অনেকেই আগ্রহ নিয়ে অংশ নেন। এতে অনেকের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনও এসেছে।’
দ্বীপের পূর্বপাড়ার বাসিন্দা রোকেয়া বেগম বলেন, ‘ব্র্যাকের কর্মীদের কাছ থেকে পচনশীল ও অপচনশীল বর্জ্য চেনা এবং নির্দিষ্ট স্থানে সেগুলো ফেলার নিয়ম শিখেছি। সেটি আমি কাজে ব্যবহার করছি।’
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম অনীক চৌধুরী বলেন, ‘এই কার্যক্রমের ফলে সেন্টমার্টিনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কিছুটা উন্নতি হয়েছে। সামনে পর্যটন মৌসুম থাকায় দ্বীপের পরিবেশ সুরক্ষা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা প্রয়োজন। এজন্য সংশ্লিষ্টদের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি।’
প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ
দ্বীপের বাসিন্দা ও পর্যটন ব্যবসায়ী তৈয়ব উল্লাহর মতে, পর্যটন মৌসুমের আগে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলে দ্বীপের পরিবেশ রক্ষায় সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাঁর ভাষ্য, ছেঁড়াদ্বীপ ও সৈকতসহ বিভিন্ন স্থান থেকে নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ, প্লাস্টিক পুনরুদ্ধার এবং পরিবেশ সংরক্ষণের উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে চালু রাখা প্রয়োজন।
সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, ‘সেন্টমার্টিনের মতো পরিবেশগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কোনো মৌসুমি কার্যক্রম হতে পারে না; এটি সারাবছর চালু রাখা প্রয়োজন। দ্বীপের পরিবেশ, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ও পর্যটন ব্যবস্থাপনার স্বার্থে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রকল্পটির কার্যক্রম অব্যাহত রাখার আহ্বান জানাই।’
সেন্টমার্টিনে ব্র্যাকের ফিল্ড কো-অর্ডিনেটর মংওয়ান লাইন রাখাইন বলেন, ‘সাগর ও ছেঁড়াদ্বীপসহ বিভিন্ন স্থান থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। পর্যটন মৌসুমের আগে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলে দ্বীপে বর্জ্য সংগ্রহ না হলে সংকট বাড়তে পারে, যা সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর, জৈব সার উৎপাদন, স্থানীয়দের টেকসই জীবিকা এবং পরিবেশ সুরক্ষায় এ কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করা জরুরি।’
চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ও প্রকল্প পরিচালক কামরুল হাসান বলেন, অর্থায়ন সংকটের কারণে চুক্তি নবায়নের বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়নি। বিষয়টি নিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা চলছে। পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করতে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদকে সম্পৃক্ত করার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সেন্টমার্টিনকে পরিচ্ছন্ন রাখা শুধু পর্যটন আকর্ষণ রক্ষার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রবাল, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়। সবাইকে একসঙ্গে পরিবেশবান্ধব কার্যক্রমে এগিয়ে আসতে হবে।’
- বিষয় :
- সেন্টমার্টিন