হাতি-ঘোড়া-পুতুলে নির্ঘুম কনিকা রানী
দুর্গাপূজার মেলা উপলক্ষে মাটির খেলনা তৈরিতে ব্যস্ত রাজারহাটের কনিকা রানী সমকাল
আসাদুজ্জামান আসাদ, রাজারহাট (কুড়িগ্রাম)
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:২৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
সকাল থেকে রাত–দম ফেলার ফুরসত নেই কনিকা রানী পালের। দুর্গাপূজার মেলায় মাটির খেলনা ও তৈজসপত্র তৈরিতে বলতে গেলে নির্ঘুম রাত কাটছে তাঁর। মেলার দোকানিরা আগেই দিয়েছেন পাইকারি অর্ডার। নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে দিন-রাত এক করে কাজ করছেন কনিকা। তাঁর এক হাতে কাদামাটি, অন্য হাতে রং তুলি। মাটির তৈরি এসব পণ্য বিক্রির আয়ই তাঁর ছয় সদস্যের পরিবারের একমাত্র ভরসা।
কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার মামাবাড়ি কালীর মেলা গ্রামের বাসিন্দা কনিকা রানী পাল। বংশ পরম্পরায় মৃৎশিল্পের সঙ্গে যুক্ত তাঁর পরিবার। স্বামী শিবু চন্দ্র পাল ও শ্বশুর খগেন্দ্রনাথ পাল মেলায় ও হাট-বাজারে মাটির তৈরি পণ্য বিক্রি করেন। আর বাড়িতে বসে মাটি ছেনে বিভিন্ন আকৃতির পণ্য তৈরির প্রধান কাজটি করেন কনিকা রানী। পরিবারের নারী-পুরুষরাও তাঁকে সহযোগিতা করেন।
সারাবছর কমবেশি মাটির কাজ করলেও মূলত দুর্গাপূজার জন্য তারা অপেক্ষা করেন। এ সময় মাটির পণ্যের চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। দোকানিরা আগে থেকে অর্ডার দিয়ে রাখায় এখন তাদের রাত-দিন কাজ করতে হচ্ছে। পূজার মৌসুমের আয় দিয়ে বছরের সংসার খরচের বড় একটি অংশ মেটাতে হয়।
কনিকা রানীর বাড়ির উঠানে এখন মাটির ঘ্রাণ আর রঙের মেলা। তৈরি হচ্ছে শিশুদের জন্য মাটির হাতি, ঘোড়া, বাঘ, পুতুল ও ব্যাংক। পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে হাঁড়ি, পাতিল, কলস, কুলা, ধূপদানি, সানকি, সানাইসহ নানা সামগ্রী। কাঁচা মাটির পণ্য শুকিয়ে পোড়ানোর পর তাতে লাল, নীল, হলুদ ও সবুজ রঙের ছোঁয়া দিচ্ছেন। রাজারহাটের পাশাপাশি কুড়িগ্রাম সদর, উলিপুর ও চিলমারীর বিভিন্ন পালপাড়াতেও এখন একই ব্যস্ততা।
কুড়িগ্রাম সদরের কাঁঠালবাড়ি ইউনিয়নের কুমারপাড়া গ্রামেও দিন-রাত চলছে মৃৎশিল্পীদের কর্মযজ্ঞ। তবে উৎসবের এই ব্যস্ততার মধ্যেও রয়েছে দুশ্চিন্তা। মাটি, লাকড়ি ও রঙের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে। অথচ মেলায় মাটির পণ্যের ন্যায্য দাম পাওয়া কঠিন। তার ওপর প্লাস্টিক পণ্যের দাপট তো আছেই। তবু ঐতিহ্যের এই পেশা আঁকড়ে ধরে আছেন কনিকা রানীরা। তাদের নিপুণ হাতে তৈরি মাটির সামগ্রী পূজার মেলায় ফিরিয়ে আনছে বাংলার লোকজ জীবনের চেনা রং।
কনিকা রানী পালের শ্বশুর খগেন্দ্রনাথ পাল বলেন, সারাবছর কমবেশি মাটির কাজ হলেও দুর্গাপূজার এই সময়ের জন্য আমরা অপেক্ষায় থাকি। এ সময় মাটির পণ্যের চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। দোকানিরা আগে যোগাযোগ করে চাহিদা অনুযায়ী অর্ডার দেন। আমাদেরও অল্প সময়ের মধ্যে সেই কাজ তুলতে হয়।
কনিকা রানী পাল বলেন, আমার বাবার বাড়িতেও মৃৎশিল্পের কাজ করতাম। বিয়ে হওয়ার পর স্বামীর বাড়িতেও করি। পূজার মৌসুমের আয় দিয়ে বছরের সংসার খরচের বড় একটি অংশ মেটাতে হয়।
স্থানীয় মৃৎশিল্পের প্রবীণ কারিগর ব্রজেন্দ্র নাথ পাল বলেন, প্লাস্টিকের জিনিস যদি বন্ধ হয়ে যায় আবার এই মাটির কাজ ভালোভাবে চলবে। আমরা ভালোভাবে চলতে পারব।
বিসিক জেলা কার্যালয়ের উপব্যবস্থাপক শাহ মোহাম্মদ জোনায়েদ বলেন, কনিকা রানী পাল আবেদন করলে আমরা বিসিক থেকে আমরা তাঁকে সহযোগিতা করব।
- বিষয় :
- উৎসব মণ্ডল