মুসলিম ভিটায় ধূপের ধোঁয়া, ঢাক বাজান নারীরা
উল্লাপাড়া (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬ | ২২:২১
এক পাশে ধর্মীয় সহমর্মিতা, অন্য পাশে সনাতনী প্রদীপের স্নিগ্ধ আলো। সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া পৌরসভার নয়নগঞ্জ গ্রামে এই দুইয়ের মেলবন্ধনে রচিত হয়েছে এক অনন্য সম্প্রীতির উপাখ্যান। সেখানে নেই কোনো হিংসার দেয়াল। এক মুসলিম পরিবারের জমিতেই পরম শ্রদ্ধায় ধূপ-দীপ জ্বেলে দেবী দুর্গার পূজা করা হয়। গত ১৪ বছর ধরে চলে আসছে এই চোখজুড়ানো সম্প্রীতির ধারা। আর এই আয়োজনের পুরো হাল ধরে আছেন গ্রামেরই সনাতনী নারীদের সংগঠন ‘একতা নারী অঙ্গন’।
নয়নগঞ্জ গ্রামে ৫৫টি সনাতন ধর্মাবলম্বী পরিবারের বাস থাকলেও ছিল না কোনো স্থায়ী মন্দির। একসময় সুভাষ শর্মা নামে এক ব্যক্তির জায়গায় তারা পূজা করতেন। ১৪ বছর আগে ওই ১৫ শতক জমি কিনে নেন স্থানীয় হাজি ছানোয়ার সরকার। জমি হস্তান্তরিত হলেও মন বদলায়নি তাঁর। উদার হৃদয়ের এই মানুষটি সানন্দে হিন্দুদের দুর্গাপূজা করার অনুমতি দেন। পাঁচ মাস আগে হাজি ছানোয়ার মারা গেলেও তাঁর এই মহান ব্রত লালন করছেন পুত্র আল আমিন সরকার।
আল আমিন সরকার বলেন, ‘বাবা জীবিত থাকতে যেভাবে ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন, আমিও সেই আদর্শ ধরে রেখেছি। আমাদের জমিতে তারা নির্দ্বিধায় পূজা করবেন। আমরা তাদের নিরাপত্তা ও আনন্দে পাশে আছি।
এই আয়োজনের আরেক অসাধারণ দিক হলো, প্রতিমা তৈরি থেকে শুরু করে আলোকসজ্জা, ঢাক বাজানো– সব কাজ নিপুণ হাতে করেন গ্রামের নারীরা। কেবল মন্ত্রোচ্চারণের দায়িত্বে থাকেন পুরুষ পুরোহিত।
সংগঠনের সভানেত্রী মাধবী রায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, ‘প্রয়াত হাজি ছানোয়ার হোসেন ছিলেন বিরল উদারতার মানুষ। তাঁর ছেলে আল আমিন ভাইও ঠিক বাবার মতো আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এই নয়নগঞ্জ গ্রাম অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের এক অনন্য নিদর্শন।’
উল্লাপাড়া উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি সুজিত কুমার ঘোষ বলেন, ‘নয়নগঞ্জ গ্রামে এক মুসলিম পরিবারের ছেড়ে দেওয়া জমিতে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে স্বতঃস্ফূর্তভাবে দুর্গাপূজা উদযাপন করে আসছেন। শুধু জমি দেওয়া নয়, ওই পরিবারটি পূজার্থীদের সব ধরনের সহযোগিতা, নিরাপত্তাও দিয়ে থাকে। ‘একতা নারী অঙ্গন’ আয়োজিত এই দুর্গোৎসব মূলত বাংলাদেশে হিন্দু-মুসলিম সৌহার্দ্য ও অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।’
এই মেলবন্ধনকে সাধুবাদ জানিয়ে উল্লাপাড়া পৌরসভার পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আশরাফুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, ‘নয়নগঞ্জ গ্রামটি সম্প্রীতির এক অটুট বন্ধন। ১৪ বছর ধরে স্বতঃস্ফূর্তভাবে মুসলিমদের জমিতে পূজা করে আসছে ‘একতা নারী অঙ্গন’। এই গুণী নারীদের সংগঠন এবং উদার হৃদয়ের জমির মালিক পরিবারকে জানাই আন্তরিক অভিবাদন।’
- বিষয় :
- সিরাজগঞ্জ
- দুর্গাপূজা