ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে আজ রাতে নদীতে নামছেন চাঁদপুরের জেলেরা

২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে আজ রাতে নদীতে নামছেন চাঁদপুরের জেলেরা
×
×

নদীতে মাছ ধরা শুরু করতে শেষ মুহুর্তের প্রস্তুতি নিচ্ছেন জেলেরা। আজ বৃহস্পতিবার তোলা ছবি: সমকাল

চাঁদপুর প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ | ২০:৫৯ | আপডেট: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ | ২১:০০

ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধি ও মা ইলিশ সংরক্ষণে চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনা ৭০ কিলোমিটার অঞ্চলসহ দেশের ছয়টি অভয়াশ্রমে ২২ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা শেষ হচ্ছে আজ বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে। এ সময় নদীগুলোর ইলিশ এবং অন্যান্য সব ধরনের মাছ শিকার বন্ধ থাকায় জেলেরা মাছ ধরা থেকে বিরত ছিলেন। আগামীকাল শুক্রবার থেকে নতুন আশায় বুক বাঁধছেন জেলেরা। দীর্ঘ বিরতির পর আবারও নৌকা, জাল আর ইলিশ ধরার স্বপ্ন নিয়ে নদীতে নামার প্রস্তুতি নিয়েছেন তারা। গত ৮ অক্টোবর থেকে এ নিষেধাজ্ঞা শুরু হয়।  

প্রতিবছরের ন্যায় এবারও প্রত্যাশা, নদীতে মিলবে কাঙ্ক্ষিত মাছ। তাই, গত তিন চারদিন ধরে পদ্মা-মেঘনার তীরে নৌকা আর জাল নিয়ে অপেক্ষায় চাঁদপুরের অর্ধলক্ষাধিক জেলে। কেউবা নদীতে নৌকা ভাসানোর ব্যস্ততায়, আবার কেউ ছেড়া জালটা ঠিক করার কাজে। কেউবা নতুন জাল নিয়ে নাড়াচাড়া করছে। 

গত ২২ দিন মা ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে সরকারের দেওয়া নিষেধাজ্ঞা মেনে নদী থেকে দূরে থাকতে হয়েছে জেলেদের। অবশেষে শেষ হচ্ছে সেই অপেক্ষার প্রহর। তাদের আশা, এবার নদীতে ধরা পড়বে প্রচুর ইলিশ, আর তাতেই ঘুচবে বিগত দিনের আর্থিক সংকট।

চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনা নদীর প্রায় ৭০ কিলোমিটার এলাকায় নিষেধাজ্ঞা চলাকালে মাছ ধরা, পরিবহন, মজুত, বাজারজাত, ক্রয়-বিক্রয়সহ ইলিশ আহরণে সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ ছিল। আইন অমান্য করে কেউ যাতে নদীতে মাছ ধরতে না পারে, সে জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর তৎপরতাও ছিল। এ সময় নৌ-পুলিশ, কোস্টগার্ড, মৎস্য বিভাগ নদীতে অভিযান চালিয়ে ৫ শতাধিক জেলেকে আটক করেছে। বিপুল পরিমাণ মা ইলিশ, মাছ ধরার নৌকা ও অবৈধ জাল জব্দ করেছে। শুধুমাত্র নৌপুলিশ ১০৫টি মৎস্য মামলা দায়ের, ১৩০০ কেজি মা ইলিশ জব্দ এবং শতাধিক জেলে নৌকাসহ বিপুল পরিমাণ কারেন্ট জাল জব্দ করেছে।

বেশ কয়েকজন জেলের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিষেধাজ্ঞার এই সময়টা তাদের জন্য ছিল বেশ কঠিন। নদীতে মাছ ধরা বন্ধ থাকায় অনেক পরিবারকে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়েছে। সরকারি সহায়তা পেলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয় বলে অভিযোগ অনেক জেলের। পাশাপাশি অভিযান নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন জেলেরা। প্রতি নৌকা, জাল মেরামতসহ বিভিন্ন সরঞ্জামে খরচা দেড় থেকে ২ লাখ টাকা। প্রত্যাশানুযায়ী ইলিশ না মিললে লোকসানে পড়তে হবে তাদের। অনেকে এনজিও থেকে ঋণ করেছে সংসার চালাতে এবং জাল নৌকা কেনার জন্য। কেউবা দাদনদারের কাছ থেকে নিয়েছেন টাকা।

জেলেদের অভিযোগ, অভিযানের সময়ে জেলে প্রতি ২৫ কেজি করে যে চাল দেওয়া হয় তা দিয়ে সংসার চালানো কষ্টকর। কার্ডধারী অনেক জেলের অভিযোগ, অভিযানে অংশ নেওয়া নৌ-পুলিশ রাতে টাকা নিয়ে কিছু অসাধু জেলেদের নদীতে নামার সুযোগ করে দিয়েছে। এতে করে এ অভিযান যতোটা হওয়ার কথা, তা হয়নি।

চাঁদপুর নৌ-থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আজমগীর হোসাইন বলেন, যারা মাছ শিকারে ব্যর্থ হয়ে বারবার নদীতে নামার চেষ্টা করে, নিয়ম মানে না, তারাই মূলত অপপ্রচার ও গুজব ছড়াচ্ছে। নৌ-পুলিশের দাবি, অভিযান সফল হয়েছে।

চাঁদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম এবারের অভিযান সফল হয়েছে বলে দাবি করে বলেন, এত সুবিশাল নদী অঞ্চলে আমাদের অভিযান সফল হয় নাইনি। সেটা যারা বলছে ভুল বলছে। তিনি আরও বলেন, জেলা টাস্কফোর্স থেকে বেশ ভূমিকা নেওয়া হয়েছে। অভিযানে যানবাহন সংকট, দীর্ঘ এ নদীর অভয়াশ্রমে অভিযানে আছে লোকবল সংকটও। এমন সংকট থাকা সত্ত্বেও আমাদের অভিযান ছিলো কঠোর।  

তিনি জানান, মা ইলিশ রক্ষায় গঠিত জেলা ট্রাস্কফোর্স, নৌ-বাহিনী, কোস্টগার্ড, নৌ-পুলিশ ও মৎস্য বিভাগ যৌথভাবে এই অভিযানে অংশ নেয়। এই ২২ দিনের অভিযানে ৫ শতাধিক জেলেকে আটক করা হয়েছে এবং তাদের বিভিন্ন মেয়াদে জেল ও জরিমানা করা হয়। এ ছাড়াও কয়েক লাখ মিটার কারেন্ট জাল ও মাছ ধরার নৌকা জব্দ করা হয়েছে। মামলা হয়েছে। এবারের এই অভিযানে একাধিক দিনই অভিযান কর্মসূচিতে ছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক। 

স্থানীয় জেলে, মৎস্য ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু নিষেধাজ্ঞা দিলেই হবে না, ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে সারাবছরই অবৈধ জাল ব্যবহার বন্ধ। জাটকা নিধন প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া মা ইলিশের এই নিষেধাজ্ঞা এবং জাটকা ইলিশ মওসুমে প্রকৃত জেলেদের জন্য সরকারি সহায়তা আরও কার্যকর এবং বৃদ্ধি করার দাবি দাবি উঠেছে। শুধু দুই নিষেধাজ্ঞার সময় ২৫ এবং ৪০ কেজি চালের জেল সহায়তা থাকলে চলবে না, তাদের এ প্রণোদনা সহায়তা বাড়াতে হবে। এছাড়া সহায়তা চালের মধ্যে রাখলে চলবে না, এরসঙ্গে আরও কিছু নিত্যসামগ্রী এবং নগদ অর্থ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া জেলেদের মাছ ধরা প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ, এখন অনেক প্রযুক্তি এসেছে। মান্ধাতার আমলের মাছ ধরার কৌশল থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। 

আরও পড়ুন

×