জেলের মাথায় ঋণের বোঝা, মনে দস্যুর ভয়
সুন্দরবনে শীতকালীন মাছ আহরণ ও শুঁটকি তৈরির মৌসুমে সাগরে রওনার আগে বহর নিয়ে অপেক্ষায় জেলেরা। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে মোংলা নদীর লেবার জেটি এলাকায় সমকাল
মনিরুল হায়দার ইকবাল, মোংলা (বাগেরহাট)
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৪৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে দাদন নিয়ে গত মৌসুমে মাছ আহরণ ও শুঁটকি তৈরির জন্য দুবলার চরে যান রুহুল গাজী ও আমজাদ। এই দুজনের বাড়িই বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার পেড়িখালী গ্রামে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে পর্যাপ্ত মাছ পাননি কেউই। যে কারণে বিপুল অঙ্কের টাকার লোকসান গুনতে হয়। দাদনের টাকাও শোধ করতে পারেননি। সেই বোঝা মাথায় নিয়েই এবার নতুন করে দাদন নিয়ে সাগরে রওনা হচ্ছেন তারা।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে রুহুল ও আমজাদকে পাওয়া যায় মোংলা নদীর ফেরিঘাটে। বহরের অন্য জেলেদের সঙ্গে সাগরে যাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন তারা। আজ শুক্রবার থেকে শুরু হচ্ছে সুন্দরবনের দুবলার চরের শুঁটকি মৌসুম। চলবে আগামী বছরের মার্চের শেষ পর্যন্ত। এ উপলক্ষে মোংলার উপকূলীয় নদনদীতে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত জড়ো হয়েছেন রুহুল-আমজাদের মতো কয়েক হাজার জেলে। গতকাল রাতে এদের কেউ যাত্রা শুরু করেছেন। অনেকের আজ শুক্রবার ভোরে সাগরে রওনা হওয়ার কথা। জাল, বরফ, খাবার, জ্বালানি ও মাছ ধরার অন্যান্য সরঞ্জাম কিনে ট্রলার প্রস্তুত করতে সবাইকেই হাত পাততে হয়েছে মহাজনের কাছে।
আমজাদদের নৌবহরে আছেন মোংলার সোনাইলতলা গ্রামের জেলে রামকৃষ্ণ (৪৮)। তিনি বলেন, বাপ-দাদার পেশা মাছ ধরা ও শুঁটকি তৈরির সঙ্গে ছোটবেলা থেকেই যুক্ত তিনি। গত মৌসুমের শেষ দিকে বনদস্যুদের ব্যাপক উৎপাতের কারণে তারা মাছ ধরা বন্ধ রাখতে বাধ্য হন। এবার মৌসুম শুরুর আগেই বন ও সাগরে দস্যুদের তৎপরতার খবরে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। তারপরও জীবিকার তাগিদে দস্যু-আতঙ্ক নিয়েই সাগরে যেতে হচ্ছে তাদের সবাইকে।
পাঁচ মাসের মৌসুমে জেলেদের ভরসা সাগরের মাছ। মাছ ধরা পড়লেও দস্যুদের চাঁদা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি পুষিয়ে ঋণ পরিশোধ করা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তারা। সঙ্গে সাগরে মাছ না পাওয়ার অনিশ্চয়তা আর ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকির মতো বহুমুখী সংকট মাথায় নিয়েই দুবলার চরে শুঁটকি উৎপাদনে যাচ্ছেন হাজারো জেলে।
মোংলার চিলা গ্রামের জগদীশ মণ্ডল (৩৮) ২০ জন জেলের পাঁচটি নৌকার বহর নিয়ে সাগরে যাচ্ছেন। তাদের দলের কেউ কেউ মহাজনের কাছ থেকে পাঁচ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিয়ে মাছ ধরার প্রস্তুতি নিয়েছেন। কিন্তু সাগরে দস্যুর হানা নিয়ে তারাও চিন্তিত। মাছ আহরণে গিয়ে তাদের কবলে পড়লে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি নিরাপত্তা নিয়েও বড় ঝুঁকিতে পড়তে হবে তাদের।
জেলে বরাম সরদার (৪২) বলেন, গত মৌসুমে সাগরে তেমন মাছ পাননি। দস্যুদের উৎপাত ও ভারতীয় জেলেদের উপস্থিতির কারণে গভীর সমুদ্রেও যেতে পারেননি। এবারও পর্যাপ্ত মাছ পাওয়া যাবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
খুলনার দাকোপ উপজেলার ঢাংমারী গ্রামের জেলে সিদিব বালা (৩০) বলেন, গত মৌসুমে কয়েক দফা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সাগরে পর্যাপ্ত মাছ পাওয়া যায়নি। এবার দুর্যোগ না হলে ভালো মাছ পাওয়ার আশা করছেন তিনি।
বন বিভাগ সূত্র জানায়, মৌসুম ঘিরে এবার দুবলার চরের আলোরকোল, অফিসকেল্লা, নারকেলবাড়িয়া ও শেলার চরে প্রায় ১০ হাজার জেলে ও মহাজনের সমাগম হতে পারে। তাদের থাকার জন্য ৯০০টি অস্থায়ী ঘর, মাছ বেচাকেনার জন্য ১০০টি ডিপো এবং মুদি, তেল, ওষুধ, সেলুন ও খাবারের দোকানসহ বিভিন্ন পণ্যের ১০০টি দোকানের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। শুঁটকি উৎপাদন, মাছ আহরণ, পরিবহন ও বেচাকেনাসহ সংশ্লিষ্ট কাজে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মৌসুমে প্রায় ২০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়।
দুবলার চর ফিশারম্যান গ্রুপের সভাপতি মো. কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, দস্যুদের তৎপরতায় শুঁটকি ব্যবসা অনেকটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। গত মৌসুমে ব্যবসায়ীদের দস্যু বাহিনীগুলোকে লাখ লাখ টাকা চাঁদা দিতে হয়েছে।
এদিকে জেলেদের নিরাপত্তায় বন বিভাগ সতর্কতামূলক নির্দেশনা দিয়েছে। গভীর সমুদ্রে একা না যাওয়া, রাতে ১৫ থেকে ২০টি নৌকা একসঙ্গে অবস্থান করা ও সুন্দরবনের গহিনে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সুন্দরবনের বিভিন্ন পয়েন্টে বনরক্ষী মোতায়েনের পাশাপাশি স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) ও কোস্টগার্ড বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে। এসআরবি ৬-এর অধিনায়ক নিস্তার আহমেদ বলেন, ইতোমধ্যে ছয়টি বনদস্যু বাহিনীর ৭৪ জন সদস্য আত্মসমর্পণ করেছেন। দুবলার চরে এসআরবির অস্থায়ী ক্যাম্প রয়েছে।
কোস্টগার্ড সদর দপ্তরের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন বলেন, আসন্ন শুঁটকি আহরণ মৌসুমে মৎস্যজীবীদের সার্বিক সুরক্ষা নিশ্চিতে কোস্টগার্ড পশ্চিম জোন বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে।
গত শুঁটকি মৌসুমে বন বিভাগের রাজস্ব আয় হয়েছিল সাড়ে সাত কোটি টাকা। এ তথ্য জানিয়ে পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, এবার তাদের আট কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে দস্যুদের কারণে জেলে ও মহাজনদের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি রাজস্ব আদায়েও
প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কোস্টগার্ডকে রাতের টহল জোরদারে তারা অনুরোধ করেছেন।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, জেলেদের চিকিৎসার কথা বিবেচনা করেই এবার প্রথমবারের মতো ফ্রেন্ডশিপের ভাসমান হাসপাতালের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাঁচ মাস ধরে সেখানে চিকিৎসা দেওয়া হবে। সুন্দরবনে দস্যুতা নির্মূলে কোস্টগার্ডের নেতৃত্বে দুটি অভিযান চলছে। এ কারণে দস্যুতা আগের তুলনায় অনেকাংশে কমেছে।
- বিষয় :
- মাছ ধরা