ঢাকা শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

সিলেটে ফাঁড়িতে হত্যা

এসআইর মৃত্যুদণ্ড দুই পুলিশ সদস্যের যাবজ্জীবন

এসআইর মৃত্যুদণ্ড  দুই পুলিশ সদস্যের  যাবজ্জীবন
×
×

রায়হান আহমদ

 সিলেট ব্যুরো

প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৯:৪২ | আপডেট: ৩০ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:৪৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

সিলেটে পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনে রায়হান আহমদ হত্যা মামলার প্রধান আসামি বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়াকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে। ফাঁড়ির তৎকালীন দুই কনস্টেবলকে যাবজ্জীবন এবং অন্য তিন আসামিকে সাত বছরের সাজা দেওয়া হয়।

গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে ঘটনার ছয় বছর পর সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক আব্দুল মজিদ মুন্সী এ রায় ঘোষণা করেন।
আকবর হোসেন ভূঁইয়াকে মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। যাবজ্জীবন সাজা পাওয়া দুজন হলেন একই ফাঁড়ির তৎকালীন কনস্টেবল টিটু চন্দ্র দাস ও হারুন অর রশীদ। তাদের এক লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। 

সাত বছরের সাজা পাওয়া তিনজন হলেন তৎকালীন এএসআই আশেক এলাহী, এসআই হাসান উদ্দিন এবং সংবাদকর্মী আব্দুল্লাহ আল নোমান। তিনজনের প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। 

আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) মোহাম্মদ মুমিনুল ইসলাম মোমিন রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন। নিহত রায়হানের মা সালমা বেগমও সন্তোষ জানিয়েছেন।
রায় ঘোষণার সময় ছয় আসামির মধ্যে শুধু আশেক এলাহী আদালতে উপস্থিত ছিলেন। বাকি পাঁচজন পলাতক। দুপুরে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে কারাগারে থাকা আশেক এলাহীকে আদালতে হাজির করা হয়। দুপুর আড়াইটার দিকে বিচারক রায় পড়া শুরু করেন। ১৫৭ পৃষ্ঠার রায় পড়া শেষ হয় বিকেল ৩টা ২০ মিনিটে।

যা ঘটেছিল সেদিন
মামলার নথি থেকে জানা যায়, ২০২০ সালের ১০ অক্টোবর রাত ১০টার দিকে নগরীর কাষ্টগড় এলাকায় যান সিলেট মহানগর পুলিশের বন্দরবাজার ফাঁড়ির কয়েকজন সদস্য। সেখান থেকে তারা নগরীর আখালিয়া নেহারিপাড়ার বাসিন্দা রায়হান আহমদকে ধরে নিয়ে যান। ফাঁড়িতে আটকে রেখে তাঁকে নির্যাতন করা হয়। পায়ের নখ উপড়ে ফেলা হয়। ভোররাতে রায়হানের পরিবারের কাছে তাঁকে ছাড়িয়ে নিতে টাকা দাবি করে ফোন করা হয়। ভোরে পরিবারের সদস্যরা ফাঁড়িতে গেলে জানতে পারেন, রায়হানকে ওসমানী হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। সেখানে তাঁর মৃত্যু হয়।
ঘটনার পর পুলিশ প্রথমে দাবি করে, ছিনতাইয়ের সময় গণপিটুনিতে রায়হানের মৃত্যু হয়েছে। তবে তাঁর মা ও স্বজনরা এ বক্তব্যের প্রতিবাদ করেন। তাদের অভিযোগের পর নির্যাতনের বিষয়টি সামনে আসে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে রায়হানের শরীরে ১১১টি আঘাতের চিহ্নের কথা উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে ৯৭টি ফোলা জখম এবং ১৪টি গুরুতর আঘাতের চিহ্ন ছিল। দুটি নখ উপড়ে ফেলার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

মামলা ও বরখাস্ত
রায়হানের মৃত্যুর দুদিন পর তাঁর স্ত্রী তাহমিনা আক্তার তান্নি বাদী হয়ে পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন। মামলার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর ১২ অক্টোবর এসআই আকবরসহ চারজনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এবং তিনজনকে প্রত্যাহার করা হয়। পরে থানার পরিদর্শকসহ আরও দুই কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হয়।
এ ঘটনায় রায়হানের লাশ কবর থেকে তুলে পুনরায় ময়নাতদন্ত করা হয়। বিভিন্ন পেশার মানুষ প্রতিবাদ ও আন্দোলন শুরু করেন। পরে মামলাটির তদন্তভার পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কাছে হস্তান্তর করা হয়। পর্যায়ক্রমে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই। সর্বশেষ ঘটনার পর পালিয়ে যাওয়া আকবরকে ওই বছরের ৯ নভেম্বর কানাইঘাট সীমান্ত থেকে গ্রেপ্তার করে জেলা পুলিশ।

অভিযোগপত্র ও বিচার
পিবিআইর একাধিক তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তনের পর সর্বশেষ তদন্ত কর্মকর্তা ২০২১ সালের ৫ মে ছয়জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। আসামিরা হলেন আকবর হোসেন ভূঁইয়া, আশেক এলাহী, হারুন অর রশীদ, টিটু চন্দ্র দাস, হাসান উদ্দিন ও আব্দুল্লাহ আল নোমান। তাদের বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যায় সহায়তা ও আলামত নষ্টের অভিযোগ আনা হয়।
২০২১ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর মামলার বিচার শুরু হয়। ৫৯ সাক্ষীর মধ্যে ৫৬ জন আদালতে সাক্ষ্য দেন।

পাঁচ আসামি পলাতক
মামলা চলাকালে কয়েকজন আসামি উচ্চ আদালত থেকে জামিন পান। তাদের মধ্যে প্রধান আসামি আকবর গত বছরের ৪ আগস্ট জামিন নিয়ে পালিয়ে যান। ১০ আগস্ট উচ্চ আদালত তাঁর জামিন বাতিল করলেও তিনি আত্মসমর্পণ করেননি।
মামলার শুরু থেকে পলাতক সংবাদকর্মী আব্দুল্লাহ আল নোমান। এসআই আকবরও বিদেশে পালিয়ে গেছেন বলে গুঞ্জন রয়েছে। পলাতক অন্য আসামিরা কোথায় রয়েছেন, তা নিশ্চিত করে কেউ জানাতে পারেননি।

রায়ে সন্তুষ্ট রায়হানের মা
রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে রায়হানের মা সালমা বেগম বলেন, দীর্ঘ ছয় বছর পর এ মামলার রায় ঘোষণা করা হলো। তাঁর ছেলেকে নির্যাতন করে যারা হত্যা করেছে, তারা পালিয়ে গেছে। তিনি পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার করে সাজা নিশ্চিত করার আশা প্রকাশ করেন।

রায়ের আগে সালমা বেগম বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে কোনো আসামি জামিন পাননি। কিন্তু ২০২৫ সালে মামলার যুক্তিতর্ক শেষ হওয়ার পর প্রথম তিন আসামি কীভাবে জামিন পেলেন, সেই প্রশ্ন রয়েছে তাঁর।
মামলার পেছনে ছয় বছর ধরে নিজের ও পরিবারের ভোগান্তির কথা উল্লেখ করলেও এ সময়ে তাদের পাশে দাঁড়ানো বিভিন্ন পেশার মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি। রায়ে দেওয়া সাজা নিয়ে আইনজীবী ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে আপিল করবেন কিনা, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন বলেও জানান সালমা বেগম।

 

আরও পড়ুন

×