সিলেটে প্রতিদিন ঢুকছে অবৈধ সিএনজিচালিত অটোরিকশা
ফয়সল আহমদ বাবলু, সিলেট
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৯:১১
| প্রিন্ট সংস্করণ
সিলেট নগরীর প্রবেশদ্বার কদমতলী পয়েন্ট কিংবা দক্ষিণ সুরমার সিলাম রোডে প্রায়ই দেখা যায় বড় ট্রাক থেকে নামানো হচ্ছে সিএনজিচালিত অটোরিকশা। প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন জেলা থেকে সিলেটে এসে নামছে মেয়াদোত্তীর্ণ ও নিবন্ধনহীন এসব অটোরিকশা। স্থানীয় চালক ও মালিকদের কাছে এসব বাহন ‘রোহিঙ্গা গাড়ি’ নামে পরিচিত।
কিছুদিন আগে বিশেষ ট্রাফিক সপ্তাহে ৩ হাজার ৭৫৮টি পরিবহনের বিরুদ্ধে মামলা ও প্রায় ২২ লাখ টাকা জরিমানা করা হলেও নগরীতে চলা রেজিস্ট্রেশনবিহীন অন-টেস্ট সিএনজিচালিত অটোরিকশা ট্রাফিক পুলিশের নজর এড়িয়ে গেছে।
বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, সিলেটে নিবন্ধিত সিএনজিচালিত অটোরিকশা ১৯ হাজার ২৩২টি। কিন্তু এই বৈধ সংখ্যার তিন গুণের বেশি নম্বরপ্লেটহীন ও অবৈধ অটোরিকশা এখন সিলেট নগরী ও আশপাশের বিভিন্ন উপজেলায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।
নিয়ম অনুযায়ী, ১৫ বছরের আয়ুষ্কাল পূর্ণ হলে রুট পারমিট নবায়ন না করে বিআরটিএ নির্ধারিত ডাম্পিং স্টেশনে এনে গাড়ি ভেঙে ফেলার কথা। এর বিপরীতে মালিকদের নতুন গাড়ি প্রতিস্থাপনের সুযোগ পাওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু অসাধু চক্র জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে অন্য জেলার মেয়াদোত্তীর্ণ ও চোরাই গাড়ি সিলেটে এনে অনায়াসে চালাচ্ছে।
নগরীতে সিলেট জেলা সিএনজি অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়ন (রেজি নং-৭০৭) এবং সিলেট জেলা অটোরিকশা চালক শ্রমিক জোট (রেজি নং-২০৯৭)– এ দুটি সংগঠনের আটটি শাখা রয়েছে। যাদের অধীনেই অন্তত ২০ হাজার রেজিস্ট্রেশনবিহীন সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল করছে।
অভিযোগ রয়েছে, মহানগর পুলিশের কিছু অসাধু সদস্যের সঙ্গে সমঝোতা করে এসব অবৈধ গাড়ি চলাচলের বন্দোবস্ত করা হয়। পুলিশের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয় বিশেষ ‘টোকেন’ বা ‘স্টিকার’। যাতায়াতের সুবিধার জন্য একেকটি অটোরিকশাকে তিনটি পর্যন্ত ভিন্ন ভিন্ন টোকেন দেওয়া হয়। ট্রাফিক পুলিশ গাড়ি আটকালে এই টোকেন দেখালেই আর কোনো ঝামেলা থাকে না। বিনিময়ে প্রতিটি স্ট্যান্ড থেকে মোটা অঙ্কের টাকা মাসোহারা তোলা হয়।
সিলেট নগরী ও আশপাশে ৫০টির বেশি স্থানে গড়ে উঠেছে অবৈধ ‘সিএনজি স্ট্যান্ড’। সূত্রমতে, দক্ষিণ সুরমার সিলেট-জকিগঞ্জ রোডের ওভারব্রিজের নিচের স্ট্যান্ডে শ্রমিক জোট শাখার অধীনে প্রায় ৮০০টি এবং একই রোডের বাইপাস এলাকায় ৫০০টির বেশি নম্বরবিহীন সিএনজিচালিত অটোরিকশা রয়েছে। এসব অন-টেস্ট গাড়ি থেকে টোকেনের বিনিময়ে মাসিক ১ হাজার ২০০ থেকে আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
একইভাবে দক্ষিণ সুরমার ভূঁইয়ার পাম্প থেকে বিশ্বনাথ, জগন্নাথপুর, গোয়ালাবাজার, তাজপুর, জালালপুর, গহরপুর, লালাবাজার ও বালাগঞ্জ রোডে চলে প্রায় দুই হাজার অবৈধ সিএনজিচালিত অটোরিকশা। শিবগঞ্জ-সাদিপুর ফিলিং স্টেশন শাখায় চলে তিনশর বেশি, বাবনা-কামালবাজার-বিশ্বনাথ রোডে ৭০০, মেন্দিবাগ-মুরাদপুর-বাঘা রোডে ৭০০, টিলাগড় শাখায় ৫০০ এবং মেজরটিলা ও পীরের বাজার ফিলিং স্টেশন স্ট্যান্ড থেকে চলে আরও ৪০০ অটোরিকশা। আম্বরখানা ও সালুটিকর শাখায় প্রায় ২ হাজার, আম্বরখানা-শিবেরবাজার সড়কেও কয়েকশ এবং কুমারগাঁও-টুকেরবাজার-লামাকাজী রোডে হাজারের বেশি রেজিস্ট্রেশনবিহীন সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল করছে।
দক্ষিণ সুরমার জালালপুর বাজারের সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক আহমদ হোসেন ও এয়ারপোর্ট সালুটিকর এলাকার আকমল উদ্দিন জানান, পুলিশ গাড়ি আটকালে স্ট্যান্ডের নাম ও শাখা নম্বর লেখা টোকেন দেখালেই ছেড়ে দেওয়া হয়। আহমদ হোসেন প্রতি মাসে গাড়ি বাবদ ১ হাজার ২০০ টাকা এবং আকমল উদ্দিন ২ হাজার টাকা মাসোহারা দেওয়ার কথা স্বীকার করেন।
সিলেট জেলা সিএনজিচালিত অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি জাকারিয়া আহমদ দাবি করেন, সরকার রেজিস্ট্রেশন না দেওয়ায় চালকরা প্রশাসনকে ম্যানেজ করে এগুলো চালাচ্ছেন।
মহানগর পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) সুদীপ্ত রায় বলেন, সিলেটের ডাম্পিং গ্রাউন্ডে শত শত গাড়ি আটকা আছে। আমরা যখনই এসব যান পাই, তখনই আটক করি। অবৈধ যান চলাচলে পুলিশের কিছু সদস্য জড়িত থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, আমি এসএমপিতে যোগ দেওয়ার আগে কিছু ঘটে থাকলে সেটি বলতে পারব না। তবে আমি যেদিন থেকে ডিসি ট্রাফিকের দায়িত্বে আছি, সেদিন থেকে এসএমপিতে এসব বন্ধ। যদি কারও বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ পাওয়া যায়, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
- বিষয় :
- সিএনজি অটোরিকশা