ঢাকা শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

‘মিনি সুন্দরবনে’ অবাধে কাটা হচ্ছে গাছ

‘মিনি সুন্দরবনে’ অবাধে কাটা হচ্ছে গাছ
×
×

 সনি আজাদ, চারঘাট (রাজশাহী)

প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৯:১৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

রাতের আঁধারে চেইন স দিয়ে মিনিটেই কাটা পড়ছে ‘মিনি সুন্দরবনে’র বড় বড় গাছ। এরপর মিনি ট্রাক কিংবা ভ্যানে করে সেসব গাছ পৌঁছে যাচ্ছে  করাতকলে। পড়ে থাকছে গুঁড়ি। এভাবে রাজশাহীর চারঘাটে গ্রামীণ সড়কের পাশের গাছের পর এবার পদ্মা-বড়াল নদীর তীররক্ষা বাঁধের গাছও উধাও হচ্ছে।

পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর অভিযোগ, গত দুই বছরে উপজেলাটিতে অন্তত পাঁচ হাজার গাছ কেটে নেওয়া হয়েছে। অথচ এসব ঘটনায় এখন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট দপ্তর থানায় অভিযোগ করেনি। বন বিভাগ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ও বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) মধ্যে চলছে দায় এড়ানোর চেষ্টা। এর মধ্যেই বন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলারও অভিযোগ উঠেছে।
উপজেলা বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চারঘাটের বিভিন্ন সড়ক ও নদীর তীরের প্রায় ১০০ কিলোমিটার এলাকায় সামাজিক বনায়নের প্রায় এক লাখ গাছ রয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন সড়কে এলজিইডি ও বিএমডিএর লাগানো গাছ রয়েছে প্রায় ২০ হাজার। এসব গাছের বয়স পাঁচ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে।

২০০৯ সালে বড়াল নদীর উৎসমুখ খনন করা হয়। পরের বছর খননকাজ শেষ হলে পদ্মা ও বড়াল নদীর মোহনায় খয়ের, মেহগনি, কড়ইসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাঁচ হাজারের বেশি গাছ লাগানো হয়। নদীর তীরবর্তী বিজিবি ক্যাম্প, চারঘাট থানা, উপজেলা পরিষদ ও আশপাশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ভাঙনের ঝুঁকি থেকে রক্ষা এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখাই ছিল এ বনায়নের উদ্দেশ্য।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ১৫ বছরের বেশি বয়সী এসব গাছের কয়েকটি নদীভাঙনের অজুহাতে কেটে নেওয়া হয়। এখন রাতের আঁধারে একের পর এক বড় গাছ কেটে নিয়ে যাচ্ছে একটি চক্র।
সরেজমিন পদ্মা-বড়াল নদীর মোহনায় গিয়ে গাছের গুঁড়ি পড়ে থাকতে দেখা গেছে। দেখা গেছে, গাছ পরিবহনের যানবাহন চলাচলের চিহ্নও। স্থানীয় কৃষক মোক্তার হোসেন বলেন, ‘রাত হলেই একটি চক্র এসে বড় বড় গাছ কেটে নিয়ে যায়। সেখানে সামাজিক বনায়ন সমিতি থাকলেও কেউ প্রতিবাদ করছে না। বন বিভাগের লোকজনও দেখতে আসেন না।’
সামাজিক বনায়ন সমিতির সদস্য আব্দুল মান্নান বলেন, ‘রাতের আঁধারে যারা গাছ কাটতে আসে, তাদের কাছে দেশীয় অস্ত্র থাকে। ভয়ে কেউ কাছে যাওয়ার সাহস পায় না। তবে এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নিতে বন বিভাগকে অবহিত করা হয়েছে।’

স্থানীয় একাধিক ব্যক্তির ভাষ্য, গাছ কাটার চক্রটি সাধারণত রাত ১টা থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত সক্রিয় থাকে। আগে থেকেই গাছ চিহ্নিত করে কয়েকজন মিলে চেইনসো দিয়ে পাঁচ থেকে সাত মিনিটের মধ্যে একটি গাছ কেটে ফেলে তারা। পরে ছোট ট্রাক বা ভ্যানে করে গাছ নিয়ে যাওয়া হয় আশপাশের করাতকলে। সেখানে দ্রুত গাছ টুকরো করা হয়। ফলে পরে গাছের উৎস শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
শুধু নদীর তীর নয়, চারঘাটের বিভিন্ন গ্রামীণ সড়কের পাশের সরকারি গাছও কেটে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির সুযোগে এক পর্যায়ে কিছু ব্যক্তি সড়কের পাশের সরকারি গাছ নিজেদের লাগানো দাবি করে কাটা শুরু করেন। এভাবে ভায়ালক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের বাঁকড়া বাজার-রায়পুর প্রধান সড়কের পাশে লাখ টাকা মূল্যের বড় বড় মেহগনি গাছ কেটে নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে হাবিবপুর থেকে মৌলভাগ হয়ে বাসুদেবপুর পর্যন্ত নবনির্মিত সড়ক প্রশস্ত করার কাজ শুরুর সময় দরপত্র ছাড়াই প্রায় ৩০০ গাছ কেটে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় প্রভাবশালী একটি চক্রের বিরুদ্ধে।

শিক্ষক সেলিম রেজা বলেন, ‘সড়ক প্রশস্ত করার নামে চোখের সামনে শত শত গাছ কেটে নেওয়া হয়েছে। অথচ কেউ বাধা দেয়নি। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর অবহেলায় গাছগুলো ধ্বংস হয়েছে।’
চারঘাটে ৩৮টি করাতকল রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি অনুমোদন রয়েছে মাত্র ১৩টির। বাকি ২৫টি করাতকল অনুমোদন ছাড়াই চলছে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব করাতকলের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় চোরাই গাছের বেচাকেনা সহজ হচ্ছে। বন বিভাগের কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও করেছেন তারা।
নিমপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেন, ‘রাস্তার পাশের পুরোনো সরকারি গাছগুলো নিয়ম মেনে দরপত্রের মাধ্যমে বিক্রি করে সেখানে নতুন গাছ লাগানো উচিত। এতে সরকার রাজস্ব পাবে। অন্যথায় প্রতিদিন দু-চারটি করে গাছ কাটতে থাকলে এক সময় রাস্তার দুই পাশ ফাঁকা হয়ে যাবে। অথচ কোনো দপ্তরই আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছে না।’

স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, বন কর্মকর্তা মাহাবুবুর রহমান পাঁচ বছর ধরে নিজ উপজেলায় কর্মরত। তাঁর বাড়ি চারঘাটের টাঙ্গন এলাকায়। নিজ এলাকা হওয়ায়  গাছ কাটা ও অবৈধ করাতকলের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে তিনি ব্যবস্থা নিতে অনীহা দেখাচ্ছেন। তাদের দাবি, অভিযুক্তদের অনেকে বন কর্মকর্তার পরিচিত।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, বন কর্মকর্তা প্রায়ই কার্যালয়ে থাকেন না। এ সুযোগে বন বিভাগের কার্যালয়ের নবনির্মিত প্রাচীরের লোহার গ্রিলও চুরি গেছে। এ ঘটনায়ও থানায় লিখিত অভিযোগ বা মামলা করেননি ওই কর্মকর্তা। গাছ রক্ষার চেয়ে বন বিভাগের কার্যালয়ে চারা উৎপাদন ও বিক্রি করে আয় করার বিষয়ে তাঁর বেশি মনোযোগ রয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তারা।
পরিবেশবাদী সংগঠন গ্রিন ভয়েসের চারঘাট উপজেলা শাখার আহ্বায়ক শাহাদাতুজ্জামান রিমন বলেন, “পদ্মা-বড়াল মোহনার বনায়ন স্থানীয় মানুষের কাছে ‘মিনি সুন্দরবন’ নামে পরিচিত। সেখানকার গাছ কেটে ফেলায় সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে। পাশাপাশি নদীর তীর ভাঙনের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। গাছ রক্ষায় বন বিভাগের দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।”

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) উপজেলা শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সজীব ইসলাম বলেন, ‘এসব গাছ কাটার ফলে জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে।’ তাঁর অভিযোগ, বন কর্মকর্তা মাহাবুবুর রহমানের স্বজনপ্রীতির কারণে হাজারো গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গাছ রক্ষায় আইনগত ব্যবস্থার বদলে চারা বিক্রিতে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন এই কর্মকর্তা।
অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী ফারুক হোসেন বলেন, ‘সড়কের পাশে অধিকাংশ গাছ বন বিভাগের। এলজিইডিরও কিছু গাছ রয়েছে। সেগুলোর বিষয়ে আমরা নিয়মিত খোঁজখবর রাখছি।’
উপজেলা বন কর্মকর্তা মাহাবুবুর রহমান বলেন, ‘গাছ কাটার বিষয়টি আমি অবগত হয়েছি। সপ্তাহখানেকের মধ্যে এ ঘটনায় মামলা করা হবে। নিজ উপজেলায় চাকরি করি বলে কাউকে ছাড় দেওয়ার অভিযোগ সঠিক নয়। অফিসে না থাকলেও বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজে বাইরে থাকতে হয়।’
 

আরও পড়ুন

×