৯ মাস পর পর্যটকে মুখর সেন্টমার্টিন, প্রথম দিনেই গেলেন ৮৩৭ জন
ছবি-সমকাল
আব্দুর রহমান, টেকনাফ
প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬ | ১৭:০৪ | আপডেট: ০৫ নভেম্বর ২০২৬ | ১৭:০৮
দীর্ঘ নয় মাসের বিরতি শেষে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হওয়ায় আবারও প্রাণচাঞ্চল্য ফিরেছে দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনে। পর্যটন মৌসুমের প্রথম দিন বৃহস্পতিবার ৮৩৭ জন পর্যটক নিয়ে দ্বীপে পৌঁছেছে এমভি বার আউলিয়া। ছয় ঘণ্টার সমুদ্রযাত্রা শেষে দুপুর দেড়টার দিকে জাহাজটি সেন্টমার্টিন জেটিঘাটে ভেড়ে। দীর্ঘদিন পর পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে দ্বীপের পথঘাট, সৈকত ও পর্যটনকেন্দ্রগুলো। পর্যটকদের স্বাগত জানাতে ব্যানার ও ফেস্টুন নিয়ে ঘাটে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটন ব্যবসায়ীরা। তাঁদের আগমনে দ্বীপবাসীর মধ্যেও ফিরেছে স্বস্তি ও আনন্দ।
বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে সাতটার দিকে কক্সবাজার শহরের নুনিয়ারছড়ার বিআইডব্লিউটিএ ঘাট থেকে ৮৩৭ জন যাত্রী নিয়ে সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে এমভি বার আউলিয়া। প্রায় ছয় ঘণ্টার সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে জাহাজটি দ্বীপে পৌঁছায়। দীর্ঘ বিরতির পর পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হওয়ায় নতুন করে আশার আলো দেখছেন দ্বীপের বাসিন্দা ও পর্যটননির্ভর ব্যবসায়ীরা। অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পর্যটকদের মধ্যেও দেখা গেছে উচ্ছ্বাস।
সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, ৮০০ জনের বেশি পর্যটক নিয়ে এমভি বার আউলিয়া জাহাজটি ঘাটে ভিড়েছে। তাঁদের স্বাগত জানিয়ে বরণ করে নেওয়া হয়েছে। এ সময় দ্বীপে ওয়ানটাইম প্লাস্টিকের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা হয়। ঘাটে স্থানীয় কোস্টগার্ড, পুলিশ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
ঢাকা থেকে আসা পর্যটক মোহাম্মদ নাহিদ বলেন, প্রথমবার সেন্টমার্টিনে পা রেখে তিনি আবেগাপ্লুত। নৌযাত্রা ছিল দারুণ। দ্বীপে নামার পর তাঁর মনে হয়েছে, যেন স্বর্গে চলে এসেছেন। এত দিন অপেক্ষার পর আসতে পেরে তিনি আনন্দিত। দ্বীপে প্রবেশের সময় কিউআর কোড স্ক্যান ও তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থাও তাঁর ভালো লেগেছে। নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা দেখে তিনি অভিভূত হয়েছেন।
দীর্ঘদিন পর্যটন কার্যক্রম বন্ধ থাকায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছিলেন পর্যটননির্ভর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। তাঁদেরই একজন স্থানীয় বাসিন্দা হামিদ হোসেন। পর্যটক না থাকায় দীর্ঘদিন রেস্তোরাঁ চালাতে হিমশিম খেতে হয়েছে তাঁকে। পর্যটকদের আগমনে আবারও দোকান খুলেছেন তিনি। হামিদ হোসেন বলেন, দীর্ঘদিন ব্যবসা বন্ধ থাকায় সংসার চালাতে খুব কষ্ট হয়েছে। আজ আবার মানুষের আনাগোনা দেখে দোকান খুলেছেন। তাঁর মনে হচ্ছে, দ্বীপটি আবার বেঁচে উঠেছে। বিষয়টি তাঁদের কাছে ঈদের আনন্দের মতো।
স্থানীয় তরুণ আব্দুর রহমান বলেন, লেখাপড়ার পাশাপাশি তিনি পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। পরিবারের হাল ধরতে এ পেশায় এসেছেন। দীর্ঘদিন পর্যটন কার্যক্রম বন্ধ থাকায় সংসারে টানাপোড়েন চলছিল। বৃহস্পতিবার থেকে আবার পর্যটকদের আনাগোনা শুরু হওয়ায় কর্মব্যস্ততা বেড়েছে। পাশাপাশি জীবিকার চাকাও ঘুরতে শুরু করবে বলে আশা করছেন তিনি। তবে পরিবেশ রক্ষায় নির্ধারিত নিয়মকানুন কেউ যাতে লঙ্ঘন না করেন, সেদিকে তাঁরা খেয়াল রাখছেন।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এসএম অনীক চৌধুরী বলেন, দুপুর দেড়টার দিকে সেন্টমার্টিন জেটিঘাটে জাহাজ থেকে পর্যটকদের নামানো শুরু হয়। তাঁদের বরণ এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য আগে থেকেই সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। পর্যটকেরা যাতে নির্ধারিত নিয়মকানুন মেনে চলেন, সে জন্য মাইকিং করা হচ্ছে। পাশাপাশি কেউ যাতে হয়রানির শিকার না হন, সেদিকেও নজর রাখা হচ্ছে।
সেন্টমার্টিনগামী জাহাজ মালিকদের সংগঠন সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (স্কোয়াব) সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর বলেন, নিরাপদে জাহাজটি সেন্টমার্টিনে পৌঁছেছে। এতে দ্বীপবাসীসহ পর্যটন ব্যবসায়ীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে।
স্কোয়াব সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে সেন্টমার্টিন রুটে চলাচলের অনুমতি পেয়েছে তিনটি জাহাজ। এগুলো হলো এমভি বার আউলিয়া, এমভি কর্ণফুলি ও এমভি টেকনাফ। তিনটি জাহাজের মোট যাত্রী ধারণক্ষমতা ২ হাজার ২৯৮ জন। এর মধ্যে এমভি বার আউলিয়ার ধারণক্ষমতা ৮৫০, এমভি কর্ণফুলির ৭৩২ এবং এমভি টেকনাফের ৭১৬ জন।
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গত ১ নভেম্বর থেকে আগামী ১৫ মার্চ পর্যন্ত সেন্টমার্টিন পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। এ সময়ে দ্বীপে ভ্রমণের পাশাপাশি সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫০০ পর্যটকের রাতযাপনের সুযোগ রয়েছে। দ্বীপে প্রবেশের জন্য প্রত্যেক পর্যটককে ১০০ টাকা পরিবেশ সংরক্ষণ ফি দিতে হবে। এ ছাড়া ট্রাভেল পাস ও কিউআর কোডযুক্ত টিকিট বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। প্রতিদিন সর্বোচ্চ সাড়ে ৩ হাজার পর্যটক দ্বীপে যাওয়ার সুযোগ পাবেন।
পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে দ্বীপে বেশ কিছু বিধিনিষেধও বহাল রয়েছে। রাতে সৈকত ও আশপাশের এলাকায় আলো জ্বালানো, উচ্চ শব্দ সৃষ্টি এবং বারবিকিউ পার্টির আয়োজন নিষিদ্ধ। একই সঙ্গে কেয়াবনে প্রবেশ, কেয়া ফল সংগ্রহ ও কেনাবেচা এবং সামুদ্রিক কাছিম, পাখি, প্রবাল, শামুক, ঝিনুক, তারামাছ, রাজকাঁকড়া, সামুদ্রিক ঘাস ও শৈবালসহ দ্বীপের জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হয়, এমন কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
দীর্ঘ অনিশ্চয়তা ও কর্মহীনতা কাটিয়ে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হওয়ায় সেন্টমার্টিনে পর্যটন মৌসুম ঘিরে নতুন করে কর্মচাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণের নিয়ম মেনে পর্যটন কার্যক্রম পরিচালিত হলে দ্বীপের বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের জীবিকায় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
- বিষয় :
- টেকনাফ
- সেন্টমার্টিন