মনস্তাত্ত্বিক রহস্যের গল্পে নিশো-তমার হ্যাটট্রিক
আফরান নিশো ও তমা মির্জা
এমদাদুল হক মিলটন
প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬ | ১৭:৫৫
চলচ্চিত্রে কিছু জুটি তৈরি হয় দর্শকের ভালো লাগা থেকে, আবার কিছু জুটি নিজেদের অভিনয় ও পর্দার রসায়ন দিয়ে সেই ভালো লাগাকে স্থায়ী করে তোলে। তারকা অভিনয়শিল্পী আফরান নিশো ও তমা মির্জা তেমনই এক জুটি। ‘সুড়ঙ্গ’ দিয়ে বড় পর্দায় যাত্রা শুরু, ‘দাগি’তে সেই রসায়নের দ্বিতীয় অধ্যায়, এবার ভিকি জাহেদের ‘খলনায়ক’ দিয়ে হ্যাটট্রিক। তবে এবারের গল্পে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন চঞ্চল চৌধুরী। মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার ঘরানার এই সিনেমায় নিশো, তমা ও চঞ্চলের একসঙ্গে উপস্থিতি দর্শকের আগ্রহ বাড়িয়ে দিয়েছে।
নিশো ও তমার জুটির শুরু ২০২৩ সালে মুক্তি পাওয়া রায়হান রাফীর ‘সুড়ঙ্গ’ সিনেমায়। বড় পর্দায় নিশোর অভিষেকের ছবিতে তাঁর বিপরীতে ছিলেন তমা মির্জা। সিনেমাটি ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি দুই অভিনয়শিল্পীর পর্দার রসায়ন নিয়েও আলোচনা তৈরি করে। বিশেষ করে নিশোর অভিনয়ের নতুন পরিচয় এবং তমার সাবলীল উপস্থিতি দর্শকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়। প্রথম ছবির সাফল্যের পর স্বাভাবিকভাবেই এই জুটিকে আবার দেখার প্রত্যাশা তৈরি হয়।
সেই প্রত্যাশার ধারাবাহিকতায় আসে শিহাব শাহীনের ‘দাগি’। ২০২৫ সালে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটির প্রথম গান ‘একটুখানি মন’ প্রকাশের পরই এর দৃশ্যায়নে নিশো-তমার রোমান্টিক রসায়ন নতুন করে আলোচনায় আসে। তবে ‘দাগি’ শুধু প্রেমের গল্প ছিল না; মুক্তি ও প্রায়শ্চিত্তের মতো বিষয়ও এর কাহিনিতে গুরুত্ব পেয়েছিল। ফলে দুই শিল্পীর জুটির সামনে অভিনয়ের ভিন্ন ক্ষেত্রও তৈরি হয়।
এবার তাদের তৃতীয় সিনেমা ‘খলনায়ক’। নির্মাতা ভিকি জাহেদের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র এটি। শুরুতে নিশো ও তমাকে নিয়ে নতুন সিনেমার গুঞ্জন শোনা গেলেও নির্মাতা সে খবর অস্বীকার করেছিলেন। পরে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান এসভিএফ আলফা-আই এন্টারটেইনমেন্ট আনুষ্ঠানিকভাবে সিনেমাটির ঘোষণা দেয়। এর মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়, নিশো ও তমার পাশাপাশি থাকছেন চঞ্চল চৌধুরী। সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার ঘরানার ছবিটির দৃশ্যধারণ বাংলাদেশ ও ভারত মিলিয়ে ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে।
সিনেমাটি নিয়ে আফরান নিশোর আগ্রহের জায়গাটিও মূলত গল্প ও নির্মাণশৈলী। তিনি বলেন, ‘ভিকি জাহেদের নির্মাণ, গল্প বলার ধরন অন্যদের থেকে ভিন্ন। খলনায়কের চিত্রনাট্য শোনার পরেই মনে হয়েছে এটি দারুণ মনস্তাত্ত্বিক ক্যানভাস। আশা করি দর্শকরা নতুন এক অভিজ্ঞতা পাবেন।’
নতুন সিনেমায় অভিনয় প্রসঙ্গে তমা মির্জা বলেন, ‘খলনায়ক’ সিনেমাটি নিয়ে আমি সত্যিই ভীষণ আশাবাদী। এর গল্প এবং চরিত্রটি ভীষণ সুন্দর, যা দর্শকদের একেবারে নতুন কিছু উপহার দেবে। দর্শকের ভালোবাসায় আমার প্রতিটি কাজই আমার জন্য বিশেষ, আর এই নতুন প্রজেক্টটি নিয়ে আমি দারুণ রোমাঞ্চিত। আশা করি, আমার পূর্বের কাজগুলোর মতো এটিও সবার ভালো লাগবে।’
সিনেমাটি নির্মাতা ভিকি জাহেদের বক্তব্যেও রয়েছে নতুনত্বের ইঙ্গিত। তাঁর ভাষায়, মানবচরিত্রের গভীর জটিলতা ও রহস্যময়তার এক নতুন চিত্রায়ণ এই সিনেমা। চিত্রনাট্য, কাস্টিং ও নির্মাণশৈলীতে দর্শক বৈচিত্র্য দেখতে পাবেন। নিশো ও চঞ্চলের মতো শক্তিশালী অভিনেতাদের একসঙ্গে পরিচালনা করাকে তিনি একই সঙ্গে রোমাঞ্চকর ও চ্যালেঞ্জিং বলে উল্লেখ করেছেন।
নিশো-তমার হ্যাটট্রিকের পাশাপাশি ‘খলনায়ক’-এর আরেকটি বড় আকর্ষণ দুই অভিনয়শিল্পীর সঙ্গে চঞ্চল চৌধুরীর উপস্থিতি। গত রোজার ঈদে মুক্তি পাওয়া ‘দম’ সিনেমায় প্রথমবার বড় পর্দায় একসঙ্গে অভিনয় করেছিলেন চঞ্চল ও নিশো। বছর না ঘুরতেই আবার তাদের একসঙ্গে দেখা যাবে। তবে এবার গল্পের ধরন আলাদা। মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলারে মানুষের অন্তর্গত দ্বন্দ্ব, গোপন প্রবণতা ও রহস্যময়তার জায়গাগুলো কীভাবে উঠে আসে, সেটিই হবে নির্মাতার জন্য বড় পরীক্ষা। একই সঙ্গে তমা মির্জার চরিত্রও কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তা নিয়ে কৌতূহল রয়েছে। কারণ আগের দুই সিনেমায় নিশোর বিপরীতে পরিচিতি পাওয়া এই অভিনেত্রী এবার আরও বড় তারকাসমৃদ্ধ অভিনয়-পরিসরে নিজের অবস্থান তৈরি করার সুযোগ পাচ্ছেন।
নিশো-তমার এই পর্দার যাত্রার বাইরে তাদের ব্যক্তিজীবন ও পেশাগত ব্যস্ততাও আলাদা করে আলোচনায় রয়েছে। সম্প্রতি নিউইয়র্ক ভ্রমণে গিয়েছিলেন তমা। সামাজিক মাধ্যমে শহরটির বিভিন্ন জায়গা থেকে ছবি ও অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিয়েছেন তিনি। নিউইয়র্ককে ঘিরে তাঁর পোস্টে ছিল ব্যক্তিগত আনন্দ, নতুন জায়গা দেখার উচ্ছ্বাস এবং স্মৃতি জমিয়ে রাখার অনুভূতি।
ব্রুকলিন ব্রিজে প্রথমবার যাওয়ার অভিজ্ঞতা জানিয়ে তিনি লিখেছেন, জায়গাটির সৌন্দর্য ও পরিবেশ তাঁর মনে বিস্ময় তৈরি করেছে। আরেক পোস্টে নিউইয়র্ককে নিজের প্রিয় শহরগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করে দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর এই ভ্রমণকে উপভোগ করার কথা জানিয়েছেন। তাঁর এই সফর অভিনয়জীবনের ব্যস্ততার বাইরে নিজেকে সময় দেওয়ারও একটি উপলক্ষ হয়ে উঠেছে। অভিনয়ের বাইরে তমার জীবনে যুক্ত হয়েছে নতুন পেশাগত পরিচয়ও। সম্প্রতি তিনি দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি একটি ব্যাংকের ব্র্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগে যোগ দিয়েছেন।
নতুন দায়িত্ব প্রসঙ্গে তমা বলেন ‘অভিনয় জীবনের বাইরে একটি নতুন পরিচয় সম্প্রতি যোগ হয়েছে আমার জীবনে। আর তা হলো দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি ব্যাংকের ব্র্যান্ড কমিউনিকেশন ডিপার্টমেন্টে যোগদান করেছি। এখন থেকে অভিনয়ের পাশাপাশি নতুন এই পেশাতেও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনে চেষ্টা করে যাব।’ অর্থাৎ অভিনয় থেকে সরে দাঁড়ানো নয়, বরং নিজের কর্মজীবনে আরেকটি ক্ষেত্র যুক্ত করলেন তিনি।
অন্যদিকে আফরান নিশোও নিজের অভিনয়জীবনে ধারাবাহিকভাবে বৈচিত্র্য খুঁজছেন। টেলিভিশন নাটক ও ওয়েব কনটেন্টে দীর্ঘদিনের জনপ্রিয়তার পর ‘সুড়ঙ্গ’ দিয়ে চলচ্চিত্রে অভিষেক তাঁর ক্যারিয়ারে নতুন অধ্যায় তৈরি করে। এরপর ‘দাগি’তে ভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয় এবং ‘দম’-এ চঞ্চল চৌধুরীর সঙ্গে কাজ তাঁর চলচ্চিত্রযাত্রাকে আরও বিস্তৃত করেছে। অভিনয়ের ক্ষেত্রে চরিত্রের মনস্তত্ত্ব, গল্পের অভিনবত্ব এবং নির্মাতার নিজস্ব ভাষাকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা তাঁর কাজের মধ্যে লক্ষ করা যায়। ‘খলনায়ক’-এও সেই অনুসন্ধানের নতুন পরীক্ষা দিতে যাচ্ছেন তিনি।
সব মিলিয়ে ‘খলনায়ক’ নিশো ও তমার জুটির তৃতীয় অধ্যায় হলেও এটি কেবল পুনরাবৃত্তির গল্প নয়। সঙ্গে চঞ্চল চৌধুরীর উপস্থিতি, ভিকি জাহেদের প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাণ এবং মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলারের আবহ সিনেমাটিকে দিয়েছে আলাদা গুরুত্ব। অন্যদিকে তমার জীবনে নতুন পেশা ও নিউইয়র্ক ভ্রমণ, নিশোর চলচ্চিত্রে নিজেকে নতুনভাবে মেলে ধরার চেষ্টা– সব মিলিয়ে দুই তারকার সময়টাও বেশ ঘটনাবহুল।
- বিষয় :
- তমা মির্জা
- আফরান নিশো