শরীয়তপুরে যৌতুকের জন্য গৃহবধূকে হত্যার অভিযোগ
সুমাইয়া আক্তার
শরীয়তপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২০ নভেম্বর ২০১৯ | ১০:৪০
শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলায় যৌতুকের জন্য সুমাইয়া আক্তার (১৯) নামে এক গৃহবধূকে হত্যার অভিযোগ উঠেছে।
এ অভিযোগে সুমাইয়ার স্বজনরা মঙ্গলবার শরীয়তপুর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে একটি মামলা করেছেন।
সুমাইয়া আক্তার নড়িয়া উপজেলার কেদারপুর ইউনিয়নের পাঁচগাও গ্রামের পাঁচগাও গ্রামের আব্দুর রব শেখের মেয়ে এবং ইতালি প্রবাসী জুলহাস মাদবরের স্ত্রী।
মামলা ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালের ২ এপ্রিল পাঁচগাও গ্রামের আব্দুর রব শেখের মেয়ে সুমাইয়া আক্তারের সঙ্গে একই গ্রামের দুলাল মাদবরের ছেলে জুলহাস মাদবরের বিয়ে হয়। বিয়ের কয়েক মাস পর জুলহাস ঢাকায় বাড়ি কিনবে বলে সুমাইয়াকে বাবার বাড়ি থেকে ১০ লাখ টাকা এনে দিতে বলে। টাকা দিতে অস্বীকার করলে স্বামীসহ শ্বশুরবাড়ির লোকজন সুমাইয়ার ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালাতে শুরু করে। এরই ধারবাহিকতায় শুক্রবার রাতে সুমাইয়াকে তার শ্বশুরবাড়ির লোকজন মারধর করে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে হত্যার চেষ্টা করে। তখন সুমাইয়ার চিৎকারে আশেপাশের লোকজন এগিয়ে আসে এবং রাত ১১টার দিকে তাকে নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে কর্তব্যরত চিকিৎসক সুমাইয়াকে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে পাঠান। তবে সুমাইয়ার শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাকে সদর হাসপাতলে না নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শনিবার সকাল ১০টার দিকে তার মৃত্যু হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজে ময়নাতদন্ত শেষে সুমাইয়ার মরদেহ রোববার সকালে তার স্বামীর বাড়িতে এনে জানাজা শেষে চন্ডিপুর গণ কবরস্থানে দাফন করা হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন জানান, সুমাইয়ার ননদ আলো বেগম, চাচা শ্বশুর মোহর চান মাদবর, তার মেয়ে প্রিয়াঙ্কা আক্তার, আছিয়া আক্তার, ছেলে মতিউর রহমান মাদবর মিলে শুক্রবার রাতে জুলহাসের বাসায় সাউন্ড বক্সে উচ্চ শব্দে গান ছেড়ে সুমাইয়াকে মারধর করে। পরে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে ঘরের আড়ার সঙ্গে বেঁধে তাকে হত্যার চেষ্টা চালায়।
সুমাইয়ার মা মাফিয়া বেগম বিলাপ করতে করতে বলেন, 'আমার একটাই মেয়ে। মেয়েটা সুখে থাকবে বলে বিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু জুলহাসরা এতো খারাপ জানতাম না। ১০ লাখ টাকার জন্য ওরা আমার মেয়েকে মারধর করে কষ্ট দিয়ে মেরেছে। মেয়েকে হত্যা করে তারা বলছে- আমার মেয়ে নাকি গলায় দড়ি দিছে। আমি আমার মেয়ের হত্যাকারীদের ফাঁসি চাই।'
তিনি বলেন, 'সুমাইয়াকে মারধর করে নড়িয়া হাসপাতালে ভর্তি করে এবং পরে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে ভর্তি করে, কিন্তু আমাকে কিছুই জানায়নি । যখন আমার মেয়ে মারা যায়, তখন আমাকে জানায়- আপনার মেয়ে গলায় দড়ি দিয়ে মারা গেছে।'
মেয়ের বিচার চেয়ে নড়িয়া থানায় মামলা করতে গেলেও পুলিশ মামলা নেয়নি- এমন অভিযোগ করে সুমাইয়ার মা জানান, পরে তারা শরীয়তপুর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল মামলা করেন।
তবে সুমাইয়াকে নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগ অস্বীকার করে তার ননদ আলো বেগম বলেন, 'আমরা ভাবিকে হত্যা করবো কেন? সে নিজেই গলায় ওড়না পেঁচিয়ে মরতে চেয়েছে। আমরা বাঁচানোর চেষ্টা করেছি।'
নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. এসএম তৌহিদুল বাসার বলেন, 'সুমাইয়াকে যখন হাসপাতালে আনা হয় তখন রাত ১১টা। তার খুব শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল এবং সে অনেকটা অচেতনের মত ছিল। গলা দিয়ে ঘড়ঘড় শব্দ হচ্ছিল। গলায় হালকা দাগ ছিল। তখন অক্সিজেন দিয়ে চিকিৎসা দিচ্ছিলাম। তার সঙ্গে আসা লোকজনদের জিজ্ঞাসা করেছিলাম- রোগীর আপন লোক কে? কিন্তু দেখলাম কেউ আপন না, সবাই দূর সম্পর্কের লোকজন। তারা চারদিকে তাকাচ্ছিল। আমার সঙ্গে কোনো কথা বলেনি। রোগীর অবস্থা খারাপ দেখে অ্যাম্বুলেন্স ডেকে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে রেফার্ড করি।'
এদিকে এ ঘটনায় মামলা করার জন্য কেউ নড়িয়া থানায় যায়নি বলে দাবি করেছেন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ হাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, 'এ ঘটনায় কেউ মামলা বা অভিযোগ করতে থানায় আসেন নাই। স্থানীয় কিছু লোকজন আমাদের ইনফরমেশন দিয়েছিল যে, সুমাইয়া আত্মহত্যা করেছে। তবুও ঢাকার শাহবাগ থানায় যোগাযোগ করেছিলাম। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পেলে এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।'
