উদ্যোগ
এগিয়ে চলেছে 'বিদ্যানীড়'
সাইফুল হক মোল্লা দুলু কিশোরগঞ্জ
প্রকাশ: ২৬ নভেম্বর ২০১৯ | ১৩:০৬
নরসুন্দা নদী ঘেঁষে হেঁটে যেতেই কানে আসবে পড়ার শব্দ। দক্ষিণ দিকে কতগুলো
তরুণ-তরুণী, একদল শিশুকে পড়াচ্ছে তারা মেঝেতে চট বিছিয়ে। চারপাশ ঘিরে
বিভিন্ন বই-খাতার ছড়াছড়ি। এই শিক্ষার্থীদের কেউ কাজ করে ফুচকার দোকানে, কেউ
হোটেলে, আবার কেউ করে চা-পিঠা বিক্রি। তাদের অনেকের বাবা বেঁচে নেই, মা
বেঁচে নেই। কারও মা মেসে রান্না করেন, কারও মা হোটেলে। কেউ ফেরি করে
তৈজসপত্র বিক্রি করেন। অধিকাংশ বাবাই একেবারে হতদরিদ্র। ছেলেমেয়েদের
পড়াশোনা করানোর কথা চিন্তাও করতেন না কোনোদিন।
সুবিধাবঞ্চিত এসব শিশুর দু'চোখে এখন স্বপ্ন। তারা কেউ চিকিৎসক, কেউ পুলিশ
অফিসার, কেউ শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদ
সংলগ্ন নদীঘেঁষা এ বিদ্যালয়টির নাম 'বিদ্যানীড়'। মৌসুমী রিতু নামে এক
তরুণীর উদ্যোগ আর ভালোবাসায় গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানটি আলো ছড়াচ্ছে, পাঠ নিচ্ছে
১৭০ সুবিধাবঞ্চিত শিশু। অনার্স পড়ূয়া শিক্ষার্থীরা ব্যস্ত তাদের নিয়ে। নতুন
ব্যাগ, বই-খাতা, কলম, পেন্সিল- সবকিছুই দেওয়া হচ্ছে তাদের। আদর-স্নেহ আর
পরম মমতায় শেখানো হচ্ছে পড়া। তারাও পড়াশোনা করছে অপার আনন্দ আর গভীর
মনোযোগে। সকাল সাড়ে ৮টা থেকে সাড়ে ১০টা এবং বিকেল ৩টা থেকে ৫টা- দুই ব্যাচে
পড়ানো হয় শিশু শ্রেণি থেকে চতুর্থ শ্রেণির এই শিক্ষার্থীদের।
মোছা. তাকিয়া এবার শিশু শ্রেণিতে পড়ছে। তার স্বপ্ন বড় হয়ে সে চিকিৎসক হবে
এবং বিনামূল্যে চিকিৎসা দেবে সবাইকে। এরকম হাজারো স্বপ্ন উঁকি দিচ্ছে
সুবিধাবঞ্চিত এসব শিশুর মাঝে। বিদ্যালয়টি বর্তমানে একটি স্থায়ী কাঠামো
পেলেও এর শুরুটা হয়েছিল একেবারেই খোলা আকাশের নিচে। তিন বছর আগের শুরুর সেই
গল্প বলছিলেন 'বিদ্যানীড়'-এর প্রতিষ্ঠাতা মৌসুমী রিতু।
রিতু তখন গুরুদয়াল সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের
শিক্ষার্থী। কলেজের সামনের মাঠে আর নরসুন্দার লেকসিটির অবয়বে হাঁটতে গিয়ে
দেখেন- সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের কেউ মানুষের কাছে হাত পাতছে, আবার কেউ অস্থায়ী
ফুচকা-ঝালমুড়ির দোকানে শ্রম দিচ্ছে, কেউবা ক্ষুধার্ত চোখে অন্যের খাবারের
দিকে তাকিয়ে আছে। ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে তার। সঙ্গে সঙ্গে ভাবনায় ঠাঁই নেয়
সুবিধাবঞ্চিত এসব শিশুর জন্য কিছু করার, তাদের সুন্দর একটি আগামীর।
ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে ২০১৬ সালের ৭ নভেম্বর গুরুদয়াল কলেজ মাঠে খাদিজা
নামের একটি শিশুকে নিয়ে সবুজ ঘাসে বসে পড়েন রিতু। পড়ানো শুরু করেন কোনো
ধরনের আয়োজন ছাড়াই। দু-তিন দিনের মধ্যে আরও কয়েকটি শিশু যোগ দেয় রিতুর খোলা
মাঠের পাঠশালায়। পাশে দাঁড়ান সহপাঠী বান্ধবী সাকিলা ইশরাত। দুই বান্ধবী
নেমে পড়েন শিক্ষার্থী সংগ্রহের কাজে। শহরের হারুয়া এলাকার
সজিব বেকারির গলিতে শিক্ষার্থী সংগ্রহের কাজ করতে গিয়ে মুখোমুখি হন নিদারুণ
বাস্তবতার। বিনাখরচে শিশুদের পড়ানোর কথা শুনেই ছেলেধরা সন্দেহে তাদের
এড়িয়ে চলতে শুরু করেন অভিভাবকরা। ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ, টিপ্পনীও কাটেন অনেকে।
কিন্তু কোনো কিছুতেই দমে যাননি তারা। বৃষ্টি নামের একটি শিশুকে দিয়ে সজিব
বেকারির গলির এক চিলতে জায়গায় বিদ্যানীড় সাজান রিতু-সাকিলা। একে একে ১৭টি
শিশু ভরিয়ে দেয় বিদ্যানীড়কে। স্বেচ্ছাশ্রমে শিশুদের পড়িয়ে গেলেও
সুবিধাবঞ্চিত এসব শিশুর বই-খাতা আর প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ সংগ্রহ নিয়ে
বিপাকে পড়েন এ দুই তরুণী। ফেসবুকে এ ব্যাপারে পোস্ট দিলে এগিয়ে আসেন তন্ময়
শেখ রাজ নামের এক তরুণ। দুই মাসের মধ্যে বিদ্যানীড়ে নাম লেখায় ৬৫ শিশু। এত
বিপুল সংখ্যক শিশুকে পাঠদান নিয়ে বিপাকে পড়েন রিতু। বিদ্যানীড়ের
শিক্ষার্থীদের সমস্যার বিষয়টি জেনে এগিয়ে আসেন কিশোরগঞ্জ পৌরসভার মেয়র
মাহমুদ পারভেজ। তিনি পৌরসভা প্রাঙ্গণে নবনির্মিত নগর মাতৃসদনের নিচ তলাটি
বিদ্যানীড়ের শিশুদের ব্যবহার করতে দেন। এক পর্যায়ে নগর মাতৃসদনের পূর্ণাঙ্গ
কার্যক্রম শুরু হলে আবারও খোলা আকাশের নিচে ঠাঁই হয় শিক্ষার্থীদের। তবে
সহসাই কালো মেঘ অপসারিত হয়। এবার বিদ্যানীড়ের পাশে দাঁড়ান কিশোরগঞ্জ জেলা
ছাত্রলীগের সভাপতি শফিকুল গণি ঢালী লিমন। তিনি উদ্যোগ নিয়ে পাগলা মসজিদের
সামনে নরসুন্দা পাড়ে বিদ্যানীড়ের শিক্ষার্থীদের জায়গা করে দেন। সেখানেই
নির্মাণকাজ চলছে বিদ্যানীড়ের নতুন ঠিকানার।
কোনোরকম প্রত্যাশা ছাড়া কিসের টানে ছুটে এসে সুবিধাবঞ্চিত এসব শিশুর পাশে
দাঁড়িয়েছেন? এমন প্রশ্নে মৌসুমী রিতু বলেন, 'নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ বিশেষ
করে একজন মানুষ হিসেবে সমাজের জন্য কিছু করার দায়বদ্ধতা থেকেই ওদের পাশে
থাকা। যখন সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নানা বঞ্চনার চিত্র দেখতাম, খুব খারাপ
লাগত। যখন দেখতাম ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা ভিক্ষা করছে, রাস্তার পাশে কারও
খাবারের দিকে চেয়ে আছে। ক্ষুধার্ত, কিন্তু খেতে পারছে না। খুব কষ্ট হতো।
২০১৬ সালে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময় বিষয়গুলো সবসময় খুব ভাবাত। নিজেকে
একজন সুবিধা শ্রেণির মানুষ মনে করে তখন ওদের নিয়ে কাজ করার ইচ্ছাটা
গভীরভাবে জাগে। মনের তাগিদ আর ভালোবাসা থেকে জড়িয়ে যাই তাদের সঙ্গে।'
তিন বছর আগে শুরুর সময় থেকে মৌসুমী রিতুর যোগ্য সহযাত্রী হিসেবে এই শিশুদের
সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন সাকিলা ইশরাত। তিনি বলেন, 'মানবিক ও নৈতিক
দায়বদ্ধতা, পাশাপাশি মনের আনন্দ আর ভালোবাসা থেকে তাদের জন্য কাজ করছি। দূর
থেকে ছুটে এসে শিশুরা যখন জড়িয়ে ধরে, তখন অন্যরকম ভালো লাগে। এ অনুভূতি
প্রকাশ করার মতো নয়। শুধু পড়াশোনা নয়, শিশুদের মানসিক বিকাশের জন্য তাদের
সাংস্কৃতিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডেরও পাঠ দিচ্ছি আমরা। সব মিলিয়ে সুবিধাবঞ্চিত
এসব শিশুর জন্য কিছু করতে পেরে সবসময় ভীষণ আনন্দ ও পুলক বোধ করি।'
- বিষয় :
- উদ্যোগ