খোলা আকাশের নিচে অনশনে এক পরিবার
রংপুর অফিস
প্রকাশ: ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯ | ০৭:১৪
৬ দিন ধরে ঘর ছাড়া ব্যবসায়ী মসিউর রহমান। তার অভিযোগ, প্রভাবশালীরা সপরিবারে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করেছে তাকে। উচ্ছেদের সময় লুট করেছে বাড়িতে থাকা আসবাবপত্র। তিনি জানান, আইনের আশ্রয় নিয়ে বাড়ি ফিরে পাবার আশায় এক রাত কাটিয়েছেন থানার গোল ঘরে। গত ৪ দিন ধরে রংপুর প্রেসক্লাব প্রাঙ্গনে স্ত্রী তাজনিন নাহার, ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ূয়া মেয়ে মার্জিয়া তাবাসসুম ও ছেলে প্লে-গ্রুপের ছাত্র তানবীর মাহাতাবকে নিয়ে আমরণ অনশন করছেন। খোলা আকাশের নিচে তীব্র শীতে রাত কাটছে তাদের। বাড়ি ফিরে না পাওয়া পর্যন্ত অনশন চালিয়ে যাবার ঘোষণাও দিয়েছেন তিনি।
জানা যায়, রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার নটারাম এলাকার বাসিন্দা গিয়াস উদ্দিন মিয়া নগরীর মুলাটোল পাকার মাথা এলাকায় ২০০৭ সালে তার প্রথম স্ত্রী সাহারা বানুর নামে ১২ শতক ও দ্বিতীয় স্ত্রী আয়শা আক্তারের নামে ১২ শতক জমি ক্রয় করেন। প্লটের পেছনের অংশ দেন সাহারা বানুকে ও রাস্তা সংলগ্ন জমিটি দেন আয়শা আক্তারকে। গিয়াস উদ্দিন মিয়ার ভাতিজা চশমা ব্যবসায়ী মসিউর রহমান পাওয়ার অব অ্যার্টনি নিয়ে সাহারা বানুর জমিতে তৈরি বাড়িতে থাকছিলেন। চলতি ডিসেম্বর মাসের ৮ তারিখে আয়শা আক্তার তার জমি ব্যবসায়ী আকিফুল ইসলামের কাছে বিক্রি করে দেন। পরের দিন আকিফুল জমিটি দখলে নিতে বখাটেদের দিয়ে মসিউরের পরিবারকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করে। ক্ষুব্ধ মসিউর বিস্ময়ের সঙ্গে বলেন, 'উনি (আকিফুল) জমি কিনলেন ১২ শতক, কীভাবে তিনি ২৪ শতক জমি দখল করতে পারেন।'
মসিউরের অভিযোগ, উচ্ছেদের পর কোতয়ালী থানায় গেলে আকিফুল নিজেকে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আত্মীয় পরিচয় দিয়ে তাদের মামলা না নিতে থানায় প্রভাব খাটায়। ৩ দিন পরে মামলা নিলেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি পুলিশ। জীবনের নিরাপত্তাসহ বাড়ি ফিরে পেতে মসিউর প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে গত বুধবার সপরিবারে প্রতীকী অনশন শুরু করেন। এতেও কোন কাজ না হলে আমরণ অনশন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে প্রেসক্লাবের সামনে অবস্থান নেন।
মসিউর রহমান বলেন, ৯ ডিসেম্বর সকাল ৯টায় আকিফুল ও তার সন্ত্রাসী বাহিনী অতর্কিতভাবে হামলা করে আমাকে এক সেকেন্ডও বাড়িতে থাকতে দেয়নি। আমার ঘরের মামলামালগুলো লুটপাট করে নিয়ে গেছে। আমার বাচ্চা, স্ত্রী ও শাশুড়ির গায়ে যে কাপড় ছিল ওই অবস্থায়ই আমাদের ঘর থেকে বের করে দিয়েছে। আকিফুলের সঙ্গে থাকা পাপ্পু টানা হেচড়া করে কিল, ঘুসি, লাথি মেরে আমার স্ত্রীকে বের করে দিয়েছে। বাচ্চাদের শীতের একটা কাপড়ও নিতে দেয়নি। আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আমার পরিবারকে প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে।
মসিউরের স্ত্রী তাজনিন নাহার বলেন, আমার স্বামীকে জিম্মি করে তারা আমাকে বলে স্বামীকে চান না জমি চান। এক দেড়শ' লোক এসে আমাদের সমস্ত কিছু নিয়ে যায়।
মেয়ে মার্জিয়া তাবাসসুম বলেন, স্কুল তেকে পরীক্ষা দিয়ে এসে দেখি বাড়িতে কোন আসবাবপত্র নেই। আমার সব বই খাতা নিয়ে গেছে। আমার আম্মু পা ধরেছিল, আম্মুকে বই-খাতা দেয়নি তারা। আমার অ্যাডমিট কার্ডও নিয়ে গেছে। পরীক্ষা দেওয়া আর হলো না।
ওদিকে প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে আয়শা বেগম ও আকিফুল ইসলাম জানান, মসিউর রহমানকে তারা উচ্ছেদ করেনি। তারা স্বেচ্ছায় বাড়ি থেকে বের হয়ে গিয়েছিল। পরে তারা (মসিউর ও তার পরিবার) প্রেসক্লাব ও থানায় এসে নাটক সাজিয়ে কথা বলছে এবং সমাজে তাদেরকে হেয় করেছে।
এদিকে ইতোমধ্যে শতাধিক মানবাধিকার কর্মী, বিভিন্ন পেশাজীবিসহ সচেতন মানুষ একটি স্বাক্ষর বইয়ে স্বাক্ষর করে মসিউরের পরিবারের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। শনিবার রংপুর প্রেসক্লাবের সামনে সচেতন নাগরিকের ব্যানারে মানববন্ধন ও সমাবেশে অবিলম্বে উচ্ছেদকারীদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনাসহ মসিউরকে তার বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করে দিতে প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
