ঢাকা রোববার, ২১ জুন ২০২৬

লাখো নিচতলার দুঃখ

লাখো নিচতলার দুঃখ
×

সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ২৫ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১৩:২৪

আগ্রাবাদ অ্যাক্সেস রোড ধরে বেপারীপাড়া গেলেই গুলবাগ আবাসিক এলাকা। সেখানকার ৩৩৪/বি বাসাটির নাম আনোয়ারা ম্যানশন। জোয়ার ও বৃষ্টি হলেই জমা হয় হাঁটুপানি। তাই এ ভবনের নিচতলার মালিক যাতায়াতের জন্য দিয়েছেন বাঁশের সাঁকো। দ্বিতীয় তলার বাসিন্দারা যাতায়াত করছেন মই দিয়ে। আনোয়ারা ম্যানশনের পাশেই থাকেন জুলফিকার আলম ও জাহাঙ্গীর আলম নামে দুই ভাই। পৈতৃকসূত্রে মালিক হওয়ায় বড় ভাই জুলফিকার আলম দ্বিতীয়তলা ও ছোট ভাই জাহাঙ্গীর আলম পেয়েছেন নিচতলা। তবে বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে একাকার হওয়ায় নিচতলা এখন আর ব্যবহার করতে পারছেন না জাহাঙ্গীর আলম। পৈতৃকসূত্রে পাওয়া ভবনটি ছেড়ে তার ঠিকানা হয়েছে এখন ভাড়া বাসা। শুধু জাহাঙ্গীর আলমের বাসা নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে চট্টগ্রামে এখন অকেজো হয়ে আছে এমন লাখো ভবনের নিচতলা। বছরের অধিকাংশ সময় পানিবন্দি থাকছেন বাসিন্দারা। বৃষ্টি ও জোয়ারের পানি ওঠায় নষ্ট হচ্ছে ভবনগুলোর গুণগত মান। দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে এর স্থায়িত্বকাল। আবহাওয়া ক্রমে পরিবর্তন হওয়ায় বাসিন্দাদের দুঃখগাথাও দীর্ঘায়িত হচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের সাবেক সভাপতি ড. মোহাম্মদ ইদ্রিস আলম বলেন, 'ঘন ঘন ভূমিকম্প ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে আর ভূপৃষ্ঠের উচ্চতা কমছে। এটির সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে চট্টগ্রামে উঁচু করতে হচ্ছে প্রধান সব সড়ক। জলাবদ্ধতার কবল থেকে বাঁচতে গিয়ে সড়ক যত উঁচু হচ্ছে, তত নিচে নামছে বহুতল ভবন। ভবন অনুমোদনের সময় জলবায়ুর প্রভাব বিবেচনায় আনছেন না দায়িত্বশীলরা। ড্রেনেজ ম্যানেজমেন্টও হচ্ছে না পরিকল্পনামাফিক। এতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছে পুরো দেশ।'

জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাকলিয়া, ষোলশহর, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, হালিশহর, আগ্রাবাদ, কাট্টলী, চকবাজারসহ চট্টগ্রামের নিচু এলাকার বাসিন্দারা। সামান্য বৃষ্টিতেই এসব এলাকার অন্তত ৪০টি আবাসিক এলাকায় জমে হাঁটুপানি। তাই এসব এলাকায় এখন যেসব সড়ক সংস্কার করা হচ্ছে, তা স্বাভাবিকের তুলনায় চার থেকে পাঁচ ফুট উঁচু করে তৈরি করছে সিটি করপোরেশন। চট্টগ্রামে সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় চার ফুট উঁচু করে তৈরি করা এমন দুটি সড়কের নাম আগ্রাবাদ অ্যাক্সেস রোড ও পোর্ট কানেকটিং (পিসি) রোড। স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক উঁচুতে হচ্ছে আরাকান সড়কও। পাকা ও সেমিপাকাসহ এসব সড়কের পাশে আছে লক্ষাধিক বসতঘর।

আগ্রাবাদ অ্যাক্সেস রোডের পাশে টিঅ্যান্ডটি কলোনি, হাজীপাড়া আবাসিক এলাকা, বেপারীপাড়া, গুলবাগ আবাসিক, রহমানবাগ, মুহুরীপাড়া আবাসিক, উত্তরা আবাসিক, শান্তিবাগসহ অন্তত দুই ডজন আবাসিক এলাকা।

কে-এল ব্লক আবাসিক এলাকার সমাজকল্যাণ সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক রকিবুল আমীন বলেন, ১০ বছর পরে রাস্তা কতটুকু উঁচু হবে- এমন ধারণা আগে পেলে আমাদের আবাসিকে থাকা ৪০০ ভবনের নিচতলা এভাবে পরিত্যক্ত হতো না।

শান্তিবাগ আবাসিক এলাকার বাসিন্দা অ্যাডভোকেট মাঈনুল আমীন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের নির্মম শিকার হয়েছি আমরা। সড়কের তুলনায় দোকান ও ভবন নিচু হয়ে পড়ায় অনেকে এসব ভেঙে নতুন করে নির্মাণ করার পরিকল্পনা করছেন। নিচতলায় এখন আর ভাড়াটিয়াও পাচ্ছে না অনেক ভবন মালিক।

পোর্ট কানেকটিং রোডের আশপাশে পোর্ট কলোনি, 'কে' ব্লক আবাসিক, বসুন্ধরা আবাসিক, সোনালী আবাসিক, 'এইচ' ব্লক আবাসিক, 'জি' ব্লক, 'বি' ব্লক, 'এ' ব্লক আবাসিক, 'আই' ব্লক, গ্রিন ভিউ, আনন্দীপুর, রামপুরা, সরাইপাড়া, শ্যামলী আবাসিক, পাহাড়তলী, বিশ্ব কলোনি, উত্তর কাট্টলীসহ অন্তত ৩০টি আবাসিক এলাকা রয়েছে।

হালিশহর 'আই' ব্লক আবাসিক এলাকার সাধারণ সম্পাদক ফারুক উল ইসলাম বলেন, জোয়ার ও বৃষ্টির পানি থেকে বাঁচতে আবাসিক এলাকার সড়ক এখন স্বাভাবিকের তুলনায় তিন থেকে চার ফুট উঁচুতে। এতে অনেক ভবনের নিচতলা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

সিডিএ আবাসিক এলাকার বাসিন্দা খায়রুল আলম সুজন বলেন, ভাড়াটিয়া না পাওয়ায় অনেক ভবনের নিচতলা পরিত্যক্ত। অনেক মালিক নিজ ভবন ছেড়ে ভাড়াটিয়া হিসেবে থাকছেন অন্য এলাকায়।

সিটি করপোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ক্রমে বাড়ছে। বাধ্য হয়ে স্বাভাবিকের চেয়ে চার থেকে পাঁচ ফুট উঁচু করতে হচ্ছে সড়ক। আর সড়ক যত উঁচু হচ্ছে, ততই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বিভিন্ন ভবনের নিচতলা।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান জহিরুল আলম দোভাষ বলেন, আগে যারা ভবন নির্মাণ করেছেন, তাদের ভবনের নিচতলা এখন ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছে বেশি। এখনকার ভবনগুলো তিন থেকে চার ফুট উঁচুতে নির্মাণ করছেন সবাই। চট্টগ্রাম নগরীতে সিডিএ অনুমোদিত ভবন প্রায় দুই লাখ। তবে অনুমোদনের বাইরে থাকা সেমিপাকা ও একতলা ভবনের সংখ্যা হিসাবে আনলে এ সংখ্যা হবে প্রায় চার লাখ।

শুধু আবাসিক ভবন নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দোকানও। নগরীর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সহস্রাধিক দোকান এখন অকেজো পড়ে আছে। দোকানের তুলনায় সড়ক উঁচু হয়ে যাওয়ায় অনেক দোকানে কমে গেছে বিক্রিও। ফলে অনেকে নিচতলা ভেঙে ভবন উঁচু করছেন। যাদের এ সুযোগ নেই, তাদের দোকান পরিত্যক্ত। আগ্রাবাদ অ্যাক্সেস রোড ও পোর্ট কানেকটিং রোডের দু'পাশে আছে অন্তত ১০ হাজার দোকান। এসব দোকানের ৯০ শতাংশই এখন মূল সড়কের নিচে চলে গেছে।

১১ নম্বর দক্ষিণ কাট্টলী ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মোরশেদ আকতার চৌধুরী বলেন, আবহাওয়া ক্রমশ পরিবর্তিত হচ্ছে। এ জন্য আবাসিক এলাকার ভেতর যেসব সড়ক হচ্ছে, সেগুলো অনেক উঁচু রাখা হচ্ছে। হালিশহরে থাকা পুরোনো ভবনগুলোর ৮০ শতাংশই এখন নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। স্থায়িত্বকালও কমে আসছে এসব ভবনের।

আগ্রাবাদ অ্যাক্সেস রোডে আয়েশা ফার্নিশার্স, লাক্সারি ফার্নিচারস, লিগ্যাসি ফার্নিচার, ভিআইপি ফার্নিচারসহ বড় সবক'টি ফার্নিচারের শোরুমই রাস্তা থেকে চার-পাঁচ ফুট নিচে পড়ে গেছে। ফলে রাস্তা থেকে ফার্নিচার ঠিকমতো দেখতে পারছেন না ক্রেতারা।

ব্যবসায়ী আবুল হাশেম বলেন, ১০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে ফার্নিচারের দোকান দিয়েছিলাম। সড়ক অনেক বেশি উঁচু হয়ে যাওয়ায় শোরুমে রাখা কোনো জিনিস আর রাস্তা থেকে দেখতে পাচ্ছেন না ক্রেতারা। এখান থেকে শোরুম সরিয়ে নেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। তিনি আরও বলেন, সড়ক এত উঁচু হওয়ার তথ্য আগে জানা থাকলে ভবনটা আরও উঁচু করে দোকানে বিনিয়োগ করতাম।

আরও পড়ুন

×