ঢাকা রোববার, ২১ জুন ২০২৬

উত্তরাঞ্চলে একের পর এক ঘটছে দুর্ঘটনা

আগুন পোহাতে গিয়ে নিভছে জীবনপ্রদীপ

আগুন পোহাতে গিয়ে নিভছে জীবনপ্রদীপ
×

মেরিনা লাভলী, রংপুর

প্রকাশ: ২৭ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১৩:১৪

'শীতোত গরম পাবার জন্যে খ্যাড় দিয়া আগুন তাপাইতেছিনু, কোন বেলা যে কাপড়োত আগুন ধরি গেইল, মুই কবার পাও না। আগুন দিয়া মোর কাপড়-গাও জ্বলি গেইল। মুই চিল্লায় জ্ঞান হারি ফেলাছনু। জ্ঞান ফিরি দেখোও মেডিকেলোত। ডাক্তার মোর গাত গজগুলা দিয়া পল্টাইল। এই কষ্ট মোর আর সহ্য হয় না।'

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের বেডে শুয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে এসব কথা বলছিলেন সারা শরীরে গজব্যান্ডেজ মোড়ানো আনজুমা বেগম (৩৫)। লালমনিরহাট জেলার আদিতমারী উপজেলার দিনমজুর মোশাররফের স্ত্রী আনজুমার শরীরের ৬০ ভাগ পুড়ে গেছে। ২৪ ডিসেম্বর সকালবেলা খড়কুটো জ্বালিয়ে আগুন পোহাতে গিয়ে অগ্নিদগ্ধ হয়েছেন আনজুমা। হাসপাতালের বেডে তিনি এখন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। আগুন পোহাতে গিয়েই অগ্নিদগ্ধ হয়ে বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন রংপুরের আরেক নারী বেগম রোকেয়া (৫৫)। তার মেয়ে রোকসানা জাকারিয়া জানান, ১৯ ডিসেম্বর মা খড়কুটো জ্বালিয়ে আগুন পোহাচ্ছিলেন। কখন গায়ে আগুন ধরেছে টের পাননি। এখন চিকিৎসা চলছে। কখনও স্বাস্থ্য উন্নতির দিকে যাচ্ছে, কখনও অবনতিও হচ্ছে।

শুধু এ দুই নারীই নন, এই শীতে আগুন পোহাতে গিয়ে অগ্নিদগ্ধ হয়ে রংপুর হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন অন্তত ২৬ জন। এদের মধ্যে বেশিরভাগই নারী ও শিশু। এভাবে অগ্নিদগ্ধ হয়ে এবার মারাও গেছেন কয়েকজন।

আবহাওয়া পরিবর্তনজনিত কারণে উত্তরাঞ্চলের শীত দিন দিন বেড়েই চলছে। এ অঞ্চলের বেশিরভাগ মানুষই হতদরিদ্র হওয়ায় শীত মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় বস্ত্র নেই তাদের। তাই সকাল কিংবা রাতে খড়কুটো জ্বালিয়ে তারা শীত নিবারণের চেষ্টা চালান। আর এতেই বাড়ে অগ্নিদগ্ধ হওয়ার ঘটনা। প্রতি বছর এ অঞ্চলে অর্ধশতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটে আগুন পোহানোর ঘটনায়।

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্র জানায়, এবার পৌষের শুরুতেই প্রচণ্ড শীত অনুভূত হওয়ায় আগুন পোহাতে গিয়ে দগ্ধ হয়ে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ২৬ জন ভর্তি হন। তাদের মধ্যে শরীরের ৫০ ভাগ পোড়া নিয়ে ঠাকুরগাঁওয়ের ইব্রাহিমের স্ত্রী হালিমা খাতুন, ২৫ ভাগ পোড়া নিয়ে জয়পুরহাটের পাঁচবিবি চানপাড়া এলাকার মৃত লাবলুর স্ত্রী ফজিলা বেগম, ৩৫ ভাগ পোড়া নিয়ে দিনাজপুরের পার্বতী উপজেলার দুর্গাপুর এলাকার হামিদুল ইসলামের স্ত্রী মুন্নি, ৪০ ভাগ পোড়া নিয়ে গাইবান্ধার সাদুল্যাপুর উপজেলার আলিনগর এলাকার তোফাজ্জল হোসেনের স্ত্রী হাজেরা বেগম, ২৫ শতাংশ পোড়া নিয়ে মিঠাপুকুর উপজেলার লতিপুর ইউনিয়নের মতলেবের স্ত্রী জোসনা, ৩৫ ভাগ পোড়া নিয়ে দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার আব্দুল জালালের স্ত্রী ছামসুন্নাহার, ২৮ ভাগ পোড়া নিয়ে রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার মৃত পুলিন চন্দ্রের স্ত্রী মুন্নিবালা, ৬০ ভাগ পোড়া নিয়ে লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার মোশাররফের স্ত্রী আনজুমা, ৫০ ভাগ পোড়া নিয়ে গাইবান্ধার সাদুল্যাপুর ইদিলপুর গ্রামের সিদ্দিকুর রহমানের শিশুকন্যা সাবিহা, রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার বুজরুক মহদীপুর গ্রামের আব্দুল হালিমের স্ত্রী রুবিনা, ৩০ ভাগ পোড়া নিয়ে রংপুর নগরীর ধাপপাশারীপাড়ার ওবাদ আলীর স্ত্রী বেগম রোকেয়া, ৩০ ভাগ পোড়া নিয়ে লালমনিরহাটে কালীগঞ্জ নতুন কোটারী গ্রামের আব্দুল হামীদের স্ত্রী ছকিনা বেগম, ৩০ ভাগ পোড়া নিয়ে নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার পাঠানপাড়া মীরগঞ্জের আব্দুল খালেকের স্ত্রী বেগম, ৬৫ ভাগ পোড়া নিয়ে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার পূর্ব বাছহাটা গ্রামের বাবর আলীর ছেলে আলম মিয়া, ১৮ ভাগ পোড়া নিয়ে রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার লাল মিয়ার সাত বছরের ছেলে রায়হান, ৫০ ভাগ পোড়া নিয়ে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ তিশামত সদরের মোজাক্কর রহমানের মেয়ে পাঁচ বছরের মিতু, নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার নওতারা গ্রামের মোস্তাফিজার রহমানের তিন বছরের মেয়ে মোনালিসা, রংপুরের হারাগাছ মধ্যপাড়া চিলমন এলাকার আবু তাহেরের ছেলে মোরসালিন, নীলফামারীর বড়ভিটা কিশোরগঞ্জের জিল্লুর রহমানের ছেলে নওশাদসহ ২৬ জন ভর্তি হন। তাদের মধ্যে গত বৃহস্পতিবার সাবিহা ও আলম চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। ইতোমধ্যে তিন রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে।

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের প্রধান ডা. এমএ হামিদ বলেন, খড়কুটো জ্বালিয়ে আগুন পোহাতে গিয়ে অগ্নিদগ্ধ হয়ে ভর্তি রোগীর বেশিরভাগই নারী-শিশু ও বৃদ্ধ। গ্রামের অসচেতন মানুষ শীত নিবারণ করতে গিয়ে এ ধরনের দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। এ দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সচেতনতা তৈরি করতে হবে। খড়কুটো জ্বালিয়ে নয়, শীত নিবারণে বেশি শীতবস্ত্র পরতে হবে। কেউ আগুনে পোড়া গেলে কোনো কবিরাজের কাছে নয়, সরাসরি হাসপাতালে রোগীদের আনলে রোগীদের মৃত্যুর ঝুঁকি অনেকটা কমে যায়।

আরও পড়ুন

×