সাভারের গোলাপ গ্রাম
পর্যটনের নতুন আকর্ষণ
গোবিন্দ আচার্য্য, সাভার
প্রকাশ: ২৭ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১৩:১৬
পথের দু'ধারে গোলাপ আর গোলাপ। টুকটুকে লাল গোলাপের সমারোহ চোখ জুড়িয়ে দেয়।
ফুলের ম ম গন্ধ জড়ানো স্নিগ্ধ বাতাস ভরিয়ে দেয় বুক। লাল গোলাপই শুধু নয়,
মাঝেমধ্যে দেখা মিলবে সাদা, পিঙ্ক, বেগুনি, কমলা, নীল ও হলুদরঙা গোলাপের।
নানান রঙের গোলাপের মধ্যে কখনও উঁকি দিচ্ছে জারবেরা- গ্লাডিওলাস-রজনীগন্ধা।
রাজধানীর অদূরে সাভারের বিরুলিয়ায় এই গোলাপরাজ্যে প্রতিদিনই আসছেন হাজারো
তরুণ-তরুণী, নারী-পুরুষ, শিশু। ফুলের সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে তারা ঘুরে
বেড়ান গোলাপের গ্রামগুলোতে। বিরুলিয়ার শ্যামপুর, সাদুল্লাহপুর, কমলাপুর,
বাগ্মীবাড়ি, মৈস্তাপাড়া, কালিয়াকৈর, কাকাবর, সামাইর, আকরাইন- সবক'টি গ্রামই
এখন গোলাপ গ্রাম। এসব গ্রামে ক্ষেতের পর ক্ষেতজুড়ে গোলাপের বাগান দিনে
দিনে হয়ে উঠছে কাছে-দূরের পর্যটকদের প্রিয় স্পট।
সরেজমিনে সম্প্রতি বিরুলিয়ার শ্যামপুরের একাধিক গোলাপ বাগানে দেখা যায়, শত
শত মানুষের পদচারণা। শীত উপেক্ষা করেই তারা ভিড় করেছেন গোলাপ বাগানে। কারও
হাতে লাল গোলাপ। কারও মাথায় গোলাপের ফুলমুকুট। কেউ ছবি তুলছেন গোলাপের
সঙ্গে। তরুণ-তরুণীরা মত্ত নানা ঢঙের সেলফি তোলায়। এক প্রেমিকযুগল
বন্ধুবান্ধব নিয়ে জন্মদিনের কেক কাটার আয়োজন করেছেন গোলাপ বাগানের কোণে।
মাথায় ফুলের মুকুট আর হাতে একগুচ্ছ গোলাপ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন ঢাকার
মতিঝিল থেকে আসা সানজিদা নাহিদ। সঙ্গে রয়েছেন তার ৬ বছরের মেয়ে এশা, ৮
বছরের ছেলে নাবিদ ও ছোট বোন হাসনা হেনা।
তিনি জানালেন, রাজধানীর দূষণযুক্ত পরিবেশ ও যানবাহনের বিরক্তিকর শব্দ ছেড়ে
কোলাহলমুক্ত পরিবেশে একটু সময় কাটাতেই ছেলেমেয়েকে নিয়ে এসেছেন। ফুলের
বাগানে ঘুরে ঘুরে অনেক ভালো লাগছে তাদের।
ছুটির দিনে মিরপুর থেকে পরিবার নিয়ে সাভারের গোলাপ গ্রামে বনভোজন করতে এসেছেন মোজাম্মেল হোসেন। তিনি জানালেন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আড়ংয়ের কর্মী তারা। বার্ষিক ছুটিতে বনভোজনের আয়োজন করতে তারা ৬০ জন পরিবার-পরিজন নিয়ে এসেছেন।
স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ঘুরতে আসা চাকরিজীবী শরিফুল ইসলাম বলেন, কাজের চাপে
থাকায় অন্য সময়ে পরিবার নিয়ে কোথাও ঘুরতে যেতে পারি না। তবে বিজয়ের মাসে
বিশেষ ছুটির কারণে ছেলেমেয়ের ইচ্ছায় সাভারের গোলাপ বাগানে ঘুরতে এসেছি।
চারদিকে ফুল আর ফুল দেখে আনন্দে মাতোয়ারা তার চার বছরের ছেলে সালমান।
সাভারের আমিনবাজার থেকে দুই বছরের মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে গোলাপ গ্রামে ঘুরতে
এসেছেন সোহেল রানা। তিনি বলেন, সময় পেলেই তিনি প্রিয়জন ও বন্ধুদের নিয়ে
ঘুরতে চলে আসেন গোলাপ গ্রামে।
স্কুল শিক্ষার্থী মেহজাবিন জারিন বন্ধুদের নিয়ে ঘুরতে এসেছেন গোলাপ গ্রামে।
নিজের ইচ্ছেমতো ছবি তোলার পাশাপাশি নিজেকে সাজিয়েছেন ফুল ও ফুলের মুকুট
দিয়ে। তিনি বাসায় সাজিয়ে রাখার জন্য এক কুড়ি ফুল কিনেছেন ১২০ টাকায়।
জারিনদের মতো বিরুলিয়া এলাকায় অবস্থিত ড্যাফোডিল, ইস্টার্ন, ব্র্যাক, সিটি,
মানারাত ইউনিভার্সিটিসহ অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা
বন্ধুবান্ধব নিয়ে প্রতিদিনই ভিড় জমাচ্ছেন গোলাপ রাজ্যে। তারা সৌন্দর্য
উপভোগের পাশাপাশি কেউ কেউ বাসায় সাজিয়ে রাখার জন্য ফুল কিনে নিচ্ছেন।
বিরুলিয়া অঞ্চলের বিভিন্ন গ্রামের দুই শতাধিক চাষি এখন ফুল চাষ করছেন।
প্রতিদিন সন্ধ্যা ও ভোরবেলায় গ্রামগুলোতে বসে ফুলের হাট। এ অঞ্চলের ফুল
ঢাকার শাহবাগসহ বিভিন্ন জেলার ফুলবাজারে পাইকারি ও খুচরা বিক্রির জন্য নিয়ে
যাওয়া হচ্ছে।
শ্যামপুর গ্রামের ফুলচাষি আব্দুল খালেক নিজের ক্ষেত পাহারা দেওয়ার পাশাপাশি
বাগানের পাশেই ফুল বিক্রির জন্য দোকান সাজিয়ে বসেছেন। তিনি জানান, দোকানে
প্রতিটি গোলাপ বিক্রি হচ্ছে ৬ টাকায়, গ্লাডিওলাস ১৫ টাকা, জারবেরা ২০ টাকা
এবং জিপসি, গোলাপ ও চন্দ্রমল্লিকা দিয়ে বানিয়ে দেওয়া প্রতিটি ফুলের মুকুট
বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকায়। বিশেষ করে নারী দর্শনার্থীর প্রায় সবাই এসব ফুলের
মুকুট কিনে মাথায় দিয়ে ঘুরে বেড়ান দিনভর।
ফুলচাষি ইমরান হোসেন বলেন, পাঁচ বিঘা জমিতে গোলাপ চাষ করেছেন তিনি। সারা
বছরই এখন ফুলের চাষ হয়। ফুল কিনতে প্রতিদিন যেমন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের
পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা এ অঞ্চলে আসছেন, তেমনি ফুলবাগান দেখতে আসছেন
হাজার হাজার মানুষ। তিনি জানান, উপযুক্ত পরিবেশ থাকলে এসব মানুষের আগমন আরও
বাড়ত। তাতে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পাশাপাশি পর্যটন স্পট হিসেবে গড়ে উঠত
বিরুলিয়ার গোলাপরাজ্য।
- বিষয় :
- সাভারের গোলাপ গ্রাম
