বিহঙ্গ কথা
কাপ্তাইয়ের টিকি বাজ
আ ন ম আমিনুর রহমান
প্রকাশ: ২২ নভেম্বর ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ২২ নভেম্বর ২০২১ | ১৩:১৮
কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানের বড়ছড়ার সর্পিল ঝিরি ধরে হাঁটছি। সঙ্গে রয়েছে সহকর্মী ড. তৈমুর ইসলাম ও শেষ বর্ষ প্রাণিচিকিৎসার চারজন ছাত্র। মার্চের প্রচণ্ড গরমে প্রাণ ওষ্ঠাগত। কিন্তু পায়ে স্যান্ডেল থাকায় ঝিরির ঠান্ডা পানির স্পর্শে সমস্ত দেহ-মন যেন জুড়িয়ে গেল! কাজেই পায়ে চলা পথ না মাড়িয়ে ঝিরির পানিপথেই হাঁটতে লাগলাম। অনেকটা পথ হাঁটা হয়ে গেল, কিন্তু কোনো পাখির তো দেখা পেলাম না? প্রচণ্ড গরমে পাখিরা বোধ হয় গাছের ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছে, তাই চোখে পড়ছে না। কী আর করা, অনেকটা বাধ্য হয়েই বুনো ফুল-ফল-প্রজাপতি-ফড়িংয়ের ছবি তুলতে লাগলাম। একসময় তৈমুরসহ ছাত্রদের বললাম আমার থেকে বেশ একটু দূরত্ব বজায় রেখে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে নিঃশব্দে হাঁটতে। পাখিদের স্বাভাবিক কাজকর্মে ব্যাঘাত না ঘটালে ওরা বিরক্ত কম হবে। এতে পাখি পর্যবেক্ষণ ও ছবি তুলতে সুবিধা হবে।
যা হোক, ছড়ার বেশ ক'টি বাঁক পেরিয়ে একসময় প্রায় এক কিলোমিটার দূরে চলে এলাম। ওখানে একটি নীলকান মাছরাঙাকে (Blue-eared Kingfisher) ঝোপের ওপর বসে স্থির দৃষ্টিতে ঝিরির পানির দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখলাম। খানিকক্ষণ পরেই ও ঝিরি থেকে ছোট্ট একটি মাছ মুখে নিয়ে দ্রুত অন্যদিকে চলে গেল। আর আমিও সুযোগমতো বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলে ওর কিছু ছবি তুলে নিলাম। এরপর আবারও ঝিরি ধরে হাঁটা। এ মুহূর্তে তৈমুর ও ছাত্রদের থেকে বেশ দূরে একাকী রয়েছি। পুরো ঝিরিতে সুনসান নীরবতা। এমন সময় নীরবতায় ছেদ ঘটাল একটি পোকামারা (Common Kestrel)। ঝিরির পাশে হেঁটে বেড়াচ্ছিল একটি ধূসর খঞ্জন (Grey Wagtail)। পাশের এক ঝোপে দেখা গেল বেশ ক'টি কালোমাথা বুলবুলি (Black-headed Bulbul)। আর ঝিরির পানিতে গোসল করছিল ক'টি কালোঝুঁটি বুলবুলি (ইষধপশ-পৎবংঃবফ ইঁষনঁষ)। ওদের সবার ছবি তুলে সামনের দিকে এগোতেই ঝিরির পাশে গাছের ডালে মাথায় রাজকীয় ঝুঁটিওয়ালা এক শিকারি পাখিকে বসে থাকতে দেখে মনটা খুশিতে নেচে উঠল। দ্রুত ওর ক'টি ছবি তুলে সামনের দিকে এগিয়ে গেলাম। একটি বড় গাছের মগডালে বসে থাকা পাকড়া ধনেশের (ওহফরধহ চরবফ ঐড়ৎহনরষষ) ছবি তুলে শিকারি পাখিটি যেখানে বসে ছিল, সেখানে ফিরে এলাম। কিন্তু গাছের ডালে ওকে পেলাম না। তবে আকাশপানে তাকাতেই ওকে চমৎকার ভঙ্গিমায় উড়ে বেড়াতে দেখলাম। আর সঙ্গে সঙ্গে ওর কিছু উড়ন্ত ছবি তুলে ফিরতি পথ ধরলাম।
কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানের বড়ছড়ায় দেখা রাজকীয় শিকারি পাখিটি এ দেশের দুর্লভ আবাসিক পাখি টিকি বাজ। বড় বাজ বা বড় বাজা নামেও পরিচিত। পশ্চিমবঙ্গে বলে পাটকিলে গিরগিট বাজ। ইংরেজি নামJerdon’s Baza বা Blyth’s Baza| Accidpitridae গোত্রের বাজটির বৈজ্ঞানিক নাম Aviceda jerdoni। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে টিকি বাজ বাস করে। 
প্রাপ্তবয়স্ক টিকি বাজের দেহের দৈর্ঘ্য ৪৬-৪৮ সেন্টিমিটার, প্রসারিত ডানা ১০৯-১১৭ সেন্টিমিটার ও ওজন ৩৫০-৩৬০ গ্রাম। একনজরে পালকের রং বাদামি ও তাতে থাকে গাঢ় ডোরা। পিঠ ও ডানার ওপর এবং কিনারার পালকগুলোয় থাকে গাঢ় কালচে-বাদামি ডোরা। ডানার মাঝের ও নিচের পালকের ডোরাগুলো কিছুটা লালচে। হালকা বাদামি মাথায় কালচে-বাদামি ডোরা। মাথার লম্বা রাজকীয় ঝুঁটির পালক কালচে, যার প্রান্ত সাদা। লেজের পালকের ওপরে তিনটি চওড়া কালচে রিংয়ের মতো মোটা দাগ থাকে। গলার মাঝখানে কালচে ও বুকে থাকে লালচে-বাদামি ডোরা। পেট ও দেহের বাকি অংশে লালচে-বাদামি ও সাদাটে ডোরা রয়েছে। চঞ্চু হালকা খয়েরি, যার আগা কালো। পা ও পায়ের পাতা বাদামি। স্ত্রী ও পুরুষ পাখির মধ্যে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। পুরুষের চোখ সোনালি-হলুদ ও নখ খয়েরি-কালো। অন্যদিকে, স্ত্রীর মাথা ও দেহ ফিকে; চোখ বাদামি। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির মাথা সাদাটে ও তাতে কালো ডোরা এবং লেজে কালচে বলয়ের মতো মোটা দাগ থাকে।
এদের মূলত সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের চিরসবুজ বনে দেখা যায়। সচরাচর গাছের উঁচু ডালে পাতা বা ডালের আড়ালে একাকী বসে থাকে। বসার জায়গা থেকে তীক্ষষ্ট দৃষ্টিতে নিচের দিকে শিকার খোঁজে। শিকার পেলে দ্রুত নিচে নেমে ছোঁ মেরে শিকার ধরে। পাখি ও ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী, বিশেষ করে ইঁদুর ও কাঠবিড়ালি প্রিয় শিকার। তবে গিরগিটি, ব্যাঙ, বড় পতঙ্গ এবং অন্যান্য প্রাণীতেও অরুচি নেই। উচ্চ স্বরে বিড়ালের মতো করে 'পি-আউ--পি-আউ--পি-আউ---' বা 'কিকিয়্যা-কিকিয়্যা-কিকিয়্যা---' শব্দে ডাকতে থাকে। অবশ্য প্রজননের সময় তীব্র স্বরে 'কিপ-কিপ-কিপ---' বা 'চিপ-চ্যাপ-চিপ-চ্যাপ---' শব্দে ডাকে।
ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল প্রজননকাল। এ সময় মাটি থেকে ৭-২০ মিটার উঁচু গাছের পাতাওয়ালা শাখায় সবুজ পাতা, ঘাস ও শিকড়-বাকড় দিয়ে অল্প খাদওয়ালা বাটির মতো বাসা বানায়। ডিম পাড়ে দু-তিনটি, রং হলদে-সাদা। ডিম ফোটে ২৭-৩০ দিনে। ছানারা দেড় মাসে উড়তে শিখে। আয়ুস্কাল সাত-আট বছর।
লেখক :অধ্যাপক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর।
- বিষয় :
- বিহঙ্গ কথা
