আজম খান স্মরণে ভিন্নরকম আয়োজন
আজম খান। ছবি: সংগৃহীত
বিনোদন প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬ | ১৪:৫১
আজ নন্দিত কণ্ঠশিল্পী ও দেশি ব্যান্ডসংগীতের উজ্জ্বল নক্ষত্র আজম খানের ১৫তম মৃত্যুবার্ষিকী। আজম খান কালজয়ী সেই শিল্পীদের একজন, যাঁর নাম চিরকাল শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং গৌরবের সঙ্গে উচ্চারিত হয়ে আসছে। তিনি শুধু একজন শিল্পী ছিলেন না; ছিলেন একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রতীক, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের তরুণ সমাজের কণ্ঠস্বর এবং বাংলা ব্যান্ডসংগীতের অন্যতম প্রধান স্থপতি। গানে গানে অগণিত শ্রোতা হৃদয় জয় করেছেন তিনি; পেয়েছিলেন পপগুরু খেতাব। দেশের সর্বোচ্চ দুই রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত এই কিংবদন্তি শিল্পীর স্মরণে আজ ভিন্নরকম এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে চ্যানেল আই। ‘ট্রিবিউট টু আজম খান’ শিরোনামে এ অনুষ্ঠানটি আজ সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় প্রচার হবে। এ আয়োজনের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা হবে রক অ্যান্ড পপগুরু আজম খানের সংগীত, জীবনসংগ্রাম, শিল্পীসত্তা এবং তাঁর রেখে যাওয়া অসাধারণ উত্তরাধিকার।
আয়োজকরা জানান, ভিন্নরকম এই আয়োজনে অংশ নিয়েছেন আজম খানের প্রতিষ্ঠিত ব্যান্ড ‘উচ্চারণ’-এর সদস্যরা। তাদের পরিবেশনায় থাকছে গুরু আজম খানের কালজয়ী গানগুলো। এ ছাড়াও তাদের আলাপচারিতায়, উঠে আসবে আজম খানের সংগীতজীবনের নানা স্মৃতি, তাঁর শিল্পভাবনা, সংগ্রাম এবং বাংলা ব্যান্ডসংগীতে তাঁর অনন্য অবদানের গল্প। পাশাপাশি আজম খানের মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা, স্বাধীনতা-পরবর্তী সাংস্কৃতিক আন্দোলনে তাঁর সম্পৃক্ততা, বাংলা রকসংগীতের বিকাশে তাঁর পথিকৃতের ভূমিকা এবং ‘উচ্চারণ’ ব্যান্ডের ইতিহাসও তুলে ধরা হবে বিস্তারিতভাবে। অনুষ্ঠানটি প্রযোজনা করেছেন ইফতেখার মুনিম এবং উপস্থাপনা করেছেন অপু মাহফুজ।
আজম খানের জন্ম ১৯৫০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার আজিমপুরে। কৈশোর থেকেই খেলাধুলা, সংস্কৃতি এবং সংগীতচর্চার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল প্রবল। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি অস্ত্র হাতে দেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তিনি ২ নম্বর সেক্টরের একজন সম্মুখসমরের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দেশের স্বাধীনতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
স্বাধীনতার পর যুদ্ধের রণাঙ্গন থেকে ফিরে এসে তিনি হাতে তুলে নেন গিটার। নতুন স্বাধীন বাংলাদেশের তরুণদের জন্য নতুন ভাষা, নতুন সুর এবং নতুন সাংস্কৃতিক চেতনার সূচনা করেন তিনি। সত্তরের দশকের শুরুতে ‘ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠী’-তে গান পরিবেশনের মাধ্যমে তাঁর সংগীতযাত্রা শুরু হয়।
পরবর্তী সময়ে তিনি গঠন করেন কিংবদন্তি ব্যান্ড উচ্চারণ, যা বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা করে। যে সময়ে ব্যান্ডসংগীতকে অনেকেই ‘অপসংস্কৃতি’ বলে আখ্যায়িত করতেন, সেই সময় আজম খান এবং উচ্চারণ সাহসিকতার সঙ্গে বাংলা ভাষায় রক, পপ এবং ফোক উপাদানের সমন্বয়ে নতুন ধারার সংগীত পরিবেশন করেন। তাদের পরিবেশনা শুধু জনপ্রিয়তাই পায়নি; বরং বাংলা ব্যান্ডসংগীতকে জাতীয় সংস্কৃতির মূলধারায় প্রতিষ্ঠিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
উচ্চারণ এবং আজম খানের জনপ্রিয় গানের তালিকায় রয়েছে– হৃদয় সাগর মরুভূমি, বাংলাদেশ, মা গো মা, সালেকা মালেকা, আলাল ও দুলাল, প্রেম চিরদিন দূরে দূরে, অভিমানী, পাপড়ি, জীবন সাথী, চুপ চুপ চুপ, হায় আল্লাহ, আসি আসি, জীবনে কিছু পাবো না প্রভৃতি। এই গানগুলোর অনেকগুলোই আজ বাংলা ব্যান্ডসংগীতের ক্লাসিক হিসেবে বিবেচিত হয় এবং নতুন প্রজন্মের কাছেও সমানভাবে জনপ্রিয়।
বাংলাদেশে ব্যান্ডসংগীতকে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে আজম খানের অবদান ছিল অসামান্য। তিনি এমন এক সময়ে ব্যান্ডসংগীতকে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন, যখন এ ধারার সংগীতকে অনেকেই সন্দেহের চোখে দেখতেন। তাঁর সাহসী পদক্ষেপ, ভিন্নধর্মী সংগীতচিন্তা এবং সাধারণ মানুষের ভাষায় কথা বলা গানগুলো তরুণ সমাজকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তাঁর হাত ধরেই পরবর্তী সময়ে দেশের অসংখ্য ব্যান্ড গড়ে ওঠে এবং বাংলা ব্যান্ডসংগীত আজকের মর্যাদায় পৌঁছায়।
সংগীতজীবনে একুশে পদক ও স্বাধীনতা পদকসহ তিনি দেশ-বিদেশে অসংখ্য সম্মাননা লাভ করেন। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে কিংবদন্তি ব্যান্ড সোলস এর ২০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে তাঁকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করা হয়। পরবর্তী সময়ে চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ডে আজীবন সম্মাননায় ভূষিত করা হয়। ২০১১ সালের ৫ জুন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেন এই সংগীত মহারথি।
- বিষয় :
- আজম খান
- মৃত্যুবার্ষিকী
