ঢাকা সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

গার্মেন্টস মালিকের মেয়ের হলুদে অতিথি দেড় হাজার কর্মচারী

গার্মেন্টস মালিকের মেয়ের হলুদে অতিথি দেড় হাজার কর্মচারী
×

শৈবাল আচার্য্য, চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ০৩ জানুয়ারি ২০২০ | ১৩:০১

‘হলুদ বাটো, মেন্দি বাটো, বাটো ফুলের মৌ/ বিয়ের সাজে সাজবে কন্যা নরম নরম বরে’-গানের তালে নাচছে একদল মেয়ে। তাদের সবার গায়ে হলুদ রঙের শাড়ি; হাতে আলতা। গানের আসরে হলুদ রঙের একই শাড়ি পরে বসে আছেন হবু কনে। মেয়েদের গান শেষ হওয়ার ফাঁকে নাচতে নাচতে মঞ্চে আসেন একই রঙের পাঞ্জাবি পরা ছেলেরা। তাদের মাঝে আছেন মধ্য বয়সী এক ব্যক্তিও। তার গায়েও একই রঙের পাঞ্জাবি। ছেলেদের মাঝে যিনি আছেন তিনি এস এম আবু তৈয়ব। তিনি চট্টগ্রামের নাসিরাবাদ শিল্প এলাকার ইন্ডিপেন্ডেন্ট গার্মেন্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। যাদের সঙ্গে নিয়ে তিনি নাচে শরীক হয়েছেন তারা তার প্রতিষ্ঠানেরই কর্মচারী। মেয়েদের মাঝে কনে সেজে বসে থাকা হবু কনেটি তার মেয়ে। মেয়ে শ্রমিকদের মতো একই রঙের শাড়ি পরে তাদের মাঝে বসে আছেন উলফাতুন্নেছা পুতুলও। তিনি আবু তৈয়বের স্ত্রী। একমাত্র মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে তিনি কোনো ভিআইপিকে আমন্ত্রণ জানাননি। গানের তালে তালে যেভাবে সুন্দর করে সবাই নাচছিলেন, যে কেউ হয়তো বলবে- তাদের কোনো সখী অথবা বোনের বিয়ে হচ্ছে। আসলে কনে ছিল মালিকের একমাত্র মেয়ে। নিজ প্রতিষ্ঠানের দেড় হাজার শ্রমিককে অতিথি করে ব্যতিক্রম এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন আবু তৈয়ব। এটি করে মালিক শ্রমিকের সম্পর্ককে অনন্য এক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন চট্টগ্রাম ক্লাবের সাবেক এই সভাপতি।

শ্রমিকদের সঙ্গে মিলিয়ে একই রঙের পোশাক পরেছেন আবু তৈয়বসহ তার পরিবারের সবাই। কনে শ্রমিকদের আবদারও মিটিয়েছেন হাসি মুখে। আবু তৈয়বের স্ত্রী ব্যস্ত ছিলেন খাবার নিয়ে। খাবারেও ছিল ব্যতিক্রমী আয়োজন। মোরগ পোলাও, ডিম কারি, কোপ্তা, বোরহানি, জর্দা বাদ যায়নি কিছুই। এস এম আবু তৈয়বের একমাত্র মেয়ে সাইকা তাফাননুম প্রীতির বিয়ে হচ্ছে ঢাকার বারিধারার আসলাম মোল্লা ও রুবিনা মোল্লার ছেলে শফিউল ইসলাম মোল্লার সাথে। বিয়ের আগে বর্ণাঢ্যভাবে নিজ প্রতিষ্ঠানের দেড় হাজার শ্রমিককে নিয়ে ব্যতিক্রমী হলুদ আয়োজন করেন আবু তৈয়ব। রোববার চট্টগ্রাম নগরের নেভি কনভেনশন সেন্টারে বিয়ের আসর বসবে। যেই শাড়িটি তিনি নিজের স্ত্রী ও স্বজনদের জন্য কিনেছেন ঠিক একই শাড়ি কিনেছেন কারখানার দেড় হাজার শ্রমিকের জন্য। পুত্রসহ নিজে গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে যে পাঞ্জাবি পরেছেন ঠিক একই পাঞ্জাবি দিয়েছেন গার্মেন্টসের পুরুষ শ্রমিক ও কর্মকর্তাদের।

গার্মেন্টস কন্যারা কেউ ৫০ টাকা, কেউ ২০ টাকা, কেউবা ১০০ টাকা চাঁদা দিয়ে নিজেদের মতো করে প্রীতিকে চমৎকার এক সেট স্বর্ণের গহনা উপহার দিয়েছেন। প্রায় দেড় লাখ টাকা দিয়ে কেনা সেই গহনা গার্মেন্টস কন্যারাই পরিয়ে দেন মালিক কন্যাকে।

ব্যতিক্রমী এমন আয়োজন প্রসঙ্গে এসএম আবু তৈয়ব সমকালকে বলেন, ‘এমন উদ্যোগ প্রচারের জন্য নয়। গার্মেন্টস কারখানার খেটে খাওয়া শ্রমিকদের প্রচুর ভূমিকা রয়েছে আমার জন্য, আমার কন্যার জন্য ও পুরো পরিবারের জন্য। শ্রমিকদের রুটি-রুজি যেমন আমি ব্যবস্থা করি; ঠিক তেমনি শ্রমিকরাও আমার রুটি-রুজির ব্যবস্থা করে। শ্রমিকরা হলো আমার অক্সিজেন। তারা না হলে আমার প্রতিষ্ঠানের মেশিনগুলো চলবে না। আমার প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের পরিবারের অংশ মনে করেই মেয়ের গায়ে হলুদের ব্যতিক্রমী আয়োজন করেছি। অনেক আগ থেকেই শ্রমিকদের নিয়ে কিছু একটা করার চিন্তা ছিল। মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানকেই এজন্য উত্তম পন্থা হিসেবে মনে করেছি। তাই একমাত্র মেয়ের গায়ে হলুদ অনুষ্ঠানটি বেছে নিয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘প্রীতি বিবিএ শেষ করার পর অনেকবার আমার  সঙ্গে কারখানায় যায়। এর মাধ্যমে তার সঙ্গে নারী শ্রমিকদের সখ্যতা গড়ে ওঠে। শ্রমিকরা সবাই ওকে খুব পছন্দ করে। এমন ব্যতিক্রমী আয়োজনে আনন্দের বন্যা দেখতে পেয়েছি শ্রমিকদের মাঝে।’

সাইকা তাফাননুম প্রীতি বলেন, ‘আমার ভাগ্য অনেক ভালো। কারণ দেড় হাজার শ্রমিক ভাই-বোনদের নিয়ে নিজের হলুদ অনুষ্ঠানটি করতে পেরেছি। এমন সৌভাগ্য খুব কম মানুষের হয়। বিয়ে উপলক্ষে এটি বাবার কাছ থেকে আমার সবচেয়ে বড় উপহার। এমন আয়োজনে আমি অনেক আনন্দিত।’

স্বাভাবিকভাবে কারখানায় প্রতিদিন সেলাই মেশিনের টুনটান শব্দ, গাড়ির হর্ন, শ্রমিকদের নানা হাঁক ডাকে পুরো এলাকা জমজমাট থাকলেও বৃহস্পতিবার চারদিকে ছিল সুনসান নিরবতা। শ্রমিকরা কেউ আসেননি কাজে। ছিল না কোনো হৈ চৈও। দিনভর এমন নিরবতা থাকলেও বিকেলের পর শ্রমিকরা হলুদ রঙের শাড়ি আর পাঞ্জাবি পরে একে একে আসতে থাকেন মালিকের মেয়ের হলুদ আয়োজনে।

জানা গেছে, চট্টগ্রাম ক্লাবে বিয়ের অনুষ্ঠানে যেসব খাবার আইটেম দিয়ে যে বাবুর্চি রান্না করেন ঠিক একই আইটেম দিয়ে খাবার পরিবেশন করা হয় কর্মচারীদের।

আরও পড়ুন

×