ঢাকা মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

চট্টগ্রাম-৮ উপনির্বাচনে ভোট ২৩ শতাংশ

চট্টগ্রাম-৮ উপনির্বাচনে ভোট ২৩ শতাংশ
×

বোয়ালখালী উপজেলার একটি কেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতি- সমকাল

চট্টগ্রাম ব্যুরো

প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০২০ | ১০:৪০ | আপডেট: ১৩ জানুয়ারি ২০২০ | ১০:৪৭

সোমবার অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম-৮ উপনির্বাচনের ভোটকেন্দ্রগুলোতে তেমন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটলেও ভোটারের উপস্থিতি ছিল একেবারেই কম। দিনশেষে ভোট পড়েছে ২৩ শতাংশ।

সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, বাইরে জোরদার নিরাপত্তা এবং কিছু কর্মী-সমর্থকের জটলা থাকলেও বেশিরভাগ কেন্দ্রের ভেতরটা ছিল ফাঁকা।

বিএনপি অভিযোগ করেছে, তাদের সমর্থকদের বাধা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে অভিযোগ সত্য নয় বলে দাবি করে ভোট শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।

ঘড়ির কাঁটায় তখন সকাল সাড়ে ১০টা। তখনও ভারি কুয়াশার চাদরে আবৃত শহরতলি বোয়ালখালী। কর্ণফুলী নদীর কালুরঘাট সেতু পার হয়ে বোয়ালখালী উপজেলা সদরের গোমদণ্ডী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রের সামনে যেতেই চোখে পড়ল মানুষের জটলা। স্কুলটিতে দুটি ভোটকেন্দ্র রয়েছে। কেন্দ্রের ভেতরে ঢুকে দেখা গেল একেবারে বিপরীত দৃশ্য। কয়েকজন পুরুষ ঘুরে বেড়াচ্ছেন, তবে নারী ভোটারের দেখা নেই। কেন্দ্রের একটি ভোট গ্রহণ কক্ষে গিয়ে দেখা যায়, গল্প করে সময় কাটাচ্ছেন সহকারী প্রিসাইডিং অফিসাররা। আলাপচারিতায় যুক্ত হচ্ছেন পোলিং এজেন্টরাও।

বুথটির সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার মুক্তা ধর জানালেন, এই বুথে ৪৪০ ভোট থাকলেও দুপুর পৌনে ১১টা পর্যন্ত ভোট পড়েছে মাত্র ৫০টি। একই কেন্দ্রের আরেকটি বুথে গিয়ে দেখা গেল, পাশের একটি কক্ষে বসে আছেন দুই সেনা সদস্য। তাদের একজন বলেন, ইভিএমের কারিগরি সমস্যা সমাধানে রাখা হয়েছে তাদের। এর বাইরে অন্য কোনো দায়িত্ব নেই তাদের।

গোমদণ্ডী স্কুলের পর প্রায় তিন কিলোমিটারের ব্যবধানে রয়েছে আকুবদণ্ডী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্র। এর কিছুদূর আগে মনিরদীঘি এলাকায় মানুষের জটলা দেখে থামতেই সাংবাদিক বুঝতে পেরে এগিয়ে এলেন বিভিন্ন বয়সী বেশ কয়েকজন। তারা জানালেন, ভোট দিতে কেন্দ্রে গিয়েছিলেন তারা। কিন্তু কেন্দ্রের প্রবেশ মুখ থেকেই ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে তাদের। এ সময় একজন প্রতিবন্ধী খুুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এগিয়ে এসে রাগে-ক্ষোভে ফেটে পড়েন। বলেন, 'আমি অনেক কষ্ট করে ভোট দিতে গিয়েছিলাম। কিছু লোক আমাকে কেন্দ্রেই ঢুকতে দেয়নি। তারা বলেছে, তোমাকে কষ্ট করে ভোট দিতে হবে না।'

মনির দীঘিপাড়ে দেখা হয় বোয়ালখালী উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি ইকবাল পাশার সঙ্গে। তিনি সমকালকে বলেন, 'বিএনপি সমর্থক ভোটারদের কেন্দ্রে ঢুকতেই দেওয়া হচ্ছে না। যারা নৌকায় ভোট দেবেন, শুধু তাদেরই বেছে বেছে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে। ইভিএমের কারণে কারচুপি করতে না পেরে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা এভাবে ভোট নিয়ন্ত্রণ করছেন।'

প্রিসাইডিং অফিসার আহমদ হোসেন ভূঁইয়া জানান, শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কেন্দ্রের ভেতরে কোনো ঝামেলা নেই। বাইরে কী হচ্ছে তা জানেন না তিনি। কেন্দ্রে ২ হাজার ৭৬৯ ভোট থাকলেও দুপুর ১২টা পর্যন্ত ৩৮০ ভোট পড়েছে বলে জানান তিনি।

কেন্দ্রে যাওয়ার পথে বিএনপি সমর্থকদের বাধা দেওয়া ছাড়া অনেকটা শান্তিপূর্ণভাবেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে বোয়ালখালীতে। তবে দু'একটি স্থানে ককটেল বিস্ফোরণসহ কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। এতে কয়েক জন আহতও হয়েছেন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী মোছলেম উদ্দিন আহমদ, বিএনপি প্রার্থী আবু সুফিয়ানসহ ৬ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তবে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন মোছলেম ও সুফিয়ান।

সকাল ৯টায় ভোটগ্রহণ শুরুর পর নগরের বহদ্দারহাট এলাকায় এখলাছুর রহমান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে দেখা হয়ে যায় আওয়ামী লীগ প্রার্থী মোছলেম ও বিএনপি প্রার্থী সুফিয়ানের। দলের নেতাকর্মীদের নিয়ে প্রথমে এই কেন্দ্রে আসেন সুফিয়ান। এরপর সেখানে যান মোছলেম। এ সময় কোলাকুলিও করেন তারা। কিন্তু দুপুর ২টায় আবু সুফিয়ান রিটার্নিং কর্মকর্তা মুহাম্মদ হাসানুজ্জামানের কাছে চিঠি দিয়ে নির্বাচন স্থগিত ও পুনঃনির্বাচনের দাবি জানান।

অবশ্য দুপুরে উপজেলার পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত পি সি সেন সারোয়াতলী হাই স্কুলে গিয়ে দেখা গেছে ভিন্নচিত্র। বুথের সামনে নারী ভোটারের সারি। অবাধে লোকজন চলাফেরা করছেন। ভোটারের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার জিতেন্দ্র লাল দাশ জানান, কেন্দ্রে ১ হাজার ৫৮৬ ভোটার থাকলেও সকাল সাড়ে ১১টা পর্যন্ত ভোট পড়ে ৩০ শতাংশ।

এই কেন্দ্রে কথা হয় স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি কাজল দের সঙ্গে। সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। সমকালকে তিনি বলেন, কাউকে বাধা দেওয়া হচ্ছে না। সবাই নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিচ্ছেন। এই কেন্দ্র থেকে আনুমানিক চার কিলোমিটার দূরে হোরারবাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র। দুপুর দেড়টার দিকে এই কেন্দ্রে গিয়ে বিএনপির কোনো এজেন্টকে পাওয়া যায়নি। অবশ্য বেশকিছু ভোটার উপস্থিত ছিলেন।

সকালের দিকে বহদ্দারহাট মোড়ে এখলাছুর রহমান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে মোছলেমের ব্যানার-পোস্টার ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীর ভিড় দেখা গেলেও তিনটি বুথই ছিল কার্যত ভোটারশূন্য। এসব বুথে ছিলেন না ধানের শীষ প্রতীকের এজেন্ট।

নৌকার এজেন্ট মারেফুল আজম জানান, সকাল থেকে বিএনপি প্রার্থীর এজেন্টকে দেখেননি তারা। অভিন্ন কথা বলেন এক সহকারী প্রিসাইডিং অফিসারও। তবে বিএনপি অভিযোগ করেছে কেন্দ্রে প্রবেশ করতেই দেওয়া হয়নি তাদের কোনো এজেন্টকে। দুপুর ১২টার দিকে কেন্দ্র থেকে তিনজনকে আটক করেন দুই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। তাদের দু'জন ছাত্রলীগ নেতা। ভোট দিলেও আটক তিনজনের হাতে কোনো কালির চিহ্ন পাননি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। ফলে তাদের পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়। আটক তিনজন হলেন- জনি, রানা ও মিঠুন। তাদের মধ্যে জনি ও মিঠুন নগর ছাত্রলীগের নেতা।

এদিকে সোমবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে নগরীর চান্দগাঁও থানার খাজা রোডে এনএমসি স্কুলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতাকর্মীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে বিএনপি ও যুবদলের কয়েকজন নেতাকর্মী আহত হন। এরমধ্যে ওই কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা নগর বিএনপির আইন বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম ও চান্দগাঁও থানা যুবদলের সদস্য খোরশেদুল আলম গুরুতর আহত হন। তাদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অ্যাডভোকেট সিরাজের মাথা ফেটে যায়। গতকাল সকাল থেকেই কেন্দ্রটিতে উত্তেজনা বিরাজ করছিল। এক পর্যায়ে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দু'পক্ষ মুখোমুখি হয়ে পড়ে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা লাঠিসোটা নিয়ে তাদের ধাওয়া করে। এবং কয়েকজনকে পিটিয়ে আহত করে।

সকাল ১১টার দিকে নগরীর সিডিএ পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে আবু সুফিয়ানকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ উঠেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, বেশকিছু নেতাকর্মী নিয়ে সুফিয়ান ভোটকেন্দ্রে গেলে কেন্দ্রের বাইরে থেকে আওয়ামী লীগের সমর্থকরা তার বিরুদ্ধে 'ভুয়া, ভুয়া' স্লোগান দিতে শুরু করেন। একপর্যায়ে পুলিশ পাহারায় বেরিয়ে যান তিনি।

চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি আবু সুফিয়ান সমকালকে বলেন, নির্বাচনে ১৭০টি কেন্দ্রের ১২০টি থেকেই তার এজেন্টদের কাউকে কাউকে বের করে দেওয়া হয়েছে। আবার কাউকে কাউকে ঢুকতেই দেয়নি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। বিএনপি সমর্থকদের কেন্দ্রে যাওয়ার পথে বাধা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া আরও নানাভাবে কারচুপি করা হয়েছে। এ ধরনের নির্বাচনের আর কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। তাই তিনি নতুন নির্বাচনের দাবি জানিয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তাকে চিঠি দিয়েছেন।

চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নৌকার প্রার্থী মোছলেম উদ্দিন সমকালকে বলেন, 'সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। তারপরও বিএনপি এই নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে মিথ্যা অভিযোগ করছে, নানা ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছে। কোনো কেন্দ্র থেকে তাদের কোনো এজেন্টকে বের করে দেওয়া হয়নি।'

আরও পড়ুন

×