এলডিসি-উত্তরণ পেছানোর ইঙ্গিত দেয়নি সরকার
জাকির হোসেন
প্রকাশ: ২৪ নভেম্বর ২০২৫ | ১১:৩২ | আপডেট: ২৪ নভেম্বর ২০২৫ | ১১:৪৭
২০২৬ সালের নভেম্বরে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে টেকসই উত্তরণের জন্য বাংলাদেশ সঠিক পথেই রয়েছে। এলডিসি থেকে বের হওয়ার তিনটি মানদণ্ডেই বাংলাদেশ এখনও যোগ্য। এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি নিয়ে জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট কমিটিকে পাঠানো ‘বাংলাদেশ কান্ট্রি রিপোর্ট ২০২৫’-এ সরকার এমন অবস্থানের কথা জানিয়েছে।
ব্যবসায়ীদের দাবি থাকলেও কান্ট্রি রিপোর্টে উত্তরণ পেছানোর জন্য কোনো ইঙ্গিত সরকার দেয়নি। তবে উত্তরণের পথে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ ও অনিশ্চয়তার কথা রিপোর্টে বলা হয়েছে। জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) কাছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ সম্প্রতি কান্ট্রি রিপোর্ট পাঠিয়েছে।
এনহ্যান্সড মনিটরিং মেকানিজমের আওতায় প্রতি বছর এ রিপোর্ট পাঠাতে হয়। আগামীকাল মঙ্গলবার রিপোর্টের ওপর সিডিপির সঙ্গে সরকারের বৈঠক হবে। আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতিসংঘের সদরদপ্তরে সিডিপির বার্ষিক প্লেনারি সভা হবে। ওই সভায় বাংলাদেশের পরিস্থিতি পর্যালোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
প্রসঙ্গত, সিডিপি প্রতি তিন বছর পর এলডিসিগুলোর অবস্থা পর্যালোচনা করে। ২০১৮ সালে ওই কমিটি বাংলাদেশকে এলডিসি থেকে উত্তরণের যোগ্য বলে প্রথম স্বীকৃতি দেয়। দ্বিতীয় ও চূড়ান্ত স্বীকৃতি দেয় ২০২১ সালে। মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভঙ্গুরতা– এই তিন সূচকে উত্তীর্ণ হয়ে জাতিসংঘের মানদণ্ডে এলডিসি থেকে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করে বাংলাদেশ।
এলডিসি থেকে উত্তরণে সরকারের প্রস্তুতির সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী সমকালকে বলেন, সিডিপির কাছে সরকার ১০ নভেম্বর কান্ট্রি রিপোর্ট পাঠিয়েছে। মঙ্গলবার সিডিপির সঙ্গে রিপোর্টের বিষয়ে সরকারের একটি ভার্চুয়াল বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
উত্তরণ পেছানোর জন্য ব্যবসায়ীদের দাবির বিষয়ে অবস্থান জানতে চাইলে ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী বলেন, আসলে পেছানোর বিষয়টি সরকারের হাতে থাকে না। এ ছাড়া যে তিনটি মানদণ্ড রয়েছে, প্রতিটিতে বাংলাদেশ এখনও যোগ্যতার বিচারে অনেক ওপরে রয়েছে। তাঁর মতে, ব্যবসায়ীরা যেসব অনিশ্চয়তার কথা বলছেন, সেগুলো তিন থেকে পাঁচ বছর পর থাকবে না– তার গ্যারান্টি নেই। এলডিসি থেকে উত্তরণে সব সময় চ্যালেঞ্জ থাকবে। চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে হবে। পরীক্ষায় পাস করার পর কেউ যদি বলে তিনি সনদ নেবেন না, তাহলে তা যুক্তিযুক্ত দেখায় না।
অন্য দেশের পেছানোর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মালদ্বীপ সুনামির কারণে ধ্বংসযজ্ঞে পরিণত হয়। সামোয়া ও সলোমন দ্বীপপুঞ্জের মতো ছোট দেশ উচ্চ ঝুঁকিগ্রস্ত হয়ে পেছানোর আবেদন করে। তারা উত্তরণের যোগ্যতা হারিয়েছিল। বাংলাদেশের পরিস্থিতি তেমন নয়। এর পরও সরকার জাতিসংঘকে স্বাধীন মূল্যায়ন করতে বলেছে। তিনি জানান, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বিভিন্ন দেশ যাতে তিন থেকে পাঁচ বছর শুল্কমুক্ত সুবিধা দেয়, সরকার সেই চেষ্টা করছে।
প্রসঙ্গত, ব্যবসায়ীদের উদ্বেগের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের অনুরোধে বাংলাদেশের পরিস্থিতির ওপর স্বাধীন পর্যালোচনা করতে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য জাতিসংঘের হাই রিপ্রেজেন্টেটিভের কার্যালয়ের (ইউএন-ওএইচআরএলএলএস) একটি প্রতিনিধি দল ১০ থেকে ১৩ নভেম্বর বাংলাদেশ সফর করে।
তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি এবং বর্তমানে বাংলাদেশ চেম্বারের সভাপতি আনওয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ গতকাল সমকালকে বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য বাংলাদেশের আরও সময় দরকার। আগামী বছর এলডিসি থেকে উত্তরণ বাংলাদেশের অর্থনীতি বিশেষত রপ্তানি খাতের জন্য আত্মঘাতী হবে। সম্প্রতি জাতিসংঘের যে প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে এসেছিল, তাদের ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে সম্মিলিতভাবে সেই অবস্থানের কথা জানানো হয়। ব্যবসায়ীদের জোরালো দাবি, সরকারের পক্ষ থেকে উত্তরণ পেছানোর চেষ্টা করা হোক।
কেন এলডিসি থেকে উত্তরণ পেছানো দরকার– এমন প্রশ্নে পোশাক খাতের এই রপ্তানিকারক বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাত টালমাটাল। জ্বালানি সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের লক্ষণ নেই। চট্টগ্রাম বন্দরের লজিস্টিকস সক্ষমতা সীমিত। রাজস্ব আয়ে অগ্রগতি নেই। শুল্কমুক্ত সুবিধার জন্য বিভিন্ন দেশের সঙ্গে এফটিএর অগ্রগতি নেই। এর পরে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি শুল্কের বোঝা। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তাও বেড়েছে। অন্যদিকে, তৈরি পোশাকের বাইরে কোনো রপ্তানি খাত এখনও বড় হতে পারেনি। সার্বিক বিবেচনায় বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণে আরও সময় প্রয়োজন।
বাংলাদেশ কান্ট্রি রিপোর্টে বলা হয়েছে, গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির অগ্রগতি ব্যতিক্রম। সহিংস ঘটনা বা গণঅভ্যুত্থানে সরকারের পতন হয়েছে এমন বিভিন্ন দেশে অর্থনীতিতে বড় ধরনের পতনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ধীরগতির যে অবস্থা কিছুদিন ছিল, তা থেকে পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
- বিষয় :
- এলডিসি
- সরকার
- জাতিসংঘ
- স্বল্পোন্নত দেশ
