ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

শহরে কিছুটা স্বস্তি, গ্রামে ব্যাপক ভোগান্তি

শহরে কিছুটা স্বস্তি, গ্রামে ব্যাপক ভোগান্তি
×

ফাইল ছবি

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০১ জুন ২০২৬ | ০৮:৫৬

পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটিতে দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতিতে দেখা গেছে মিশ্র চিত্র। সরকারের পক্ষ থেকে বিদ্যুতের কোনো ঘাটতি না থাকার দাবি করা হলেও বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎহীনতায় ভোগান্তির অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের গ্রাহকদের দুর্ভোগ বেশি পোহাতে হয়েছে। তবে অনেক জেলা ও বিভাগীয় শহরে ঈদের ছুটিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক ছিল।

যশোরে ঈদুল আজহার নামাজ শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি নেই। ফলে পরিকল্পিত লোডশেডিং করার সুযোগ নেই। কোথাও কোথাও ঝড়ে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের সমস্যার কারণে বিদ্যুৎ বিভ্রাট হতে পারে।

প্রতিমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের মধ্যেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। সিলেট, কুমিল্লা, কিশোরগঞ্জ, রাজবাড়ী, মৌলভীবাজার ও ফেনীতে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ছিল স্বস্তিদায়ক। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়ায় ঈদের ছুটিতে কোথাও পরিকল্পিত লোডশেডিং করতে হয়নি।

সিলেটে পিডিবি ও পল্লী বিদ্যুতের কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, ঈদের আগে ও পরে কোনো লোডশেডিং ছিল না। তবে অনেক গ্রাহক গত কয়েক দিনে এক থেকে দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকার কথা জানিয়েছেন। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য, ঝড়-বৃষ্টির কারণে লাইনে ত্রুটি দেখা দেওয়ায় কিছু এলাকায় সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ছিল। পিডিবি সিলেটের সহকারী প্রকৌশলী জারজিসুর রহমান রনি বলেন, লাইনের কাজের জন্য নির্দিষ্ট কিছু ফিডারের আওতায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকতে পারে। অন্যদিকে সিলেট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর জেনারেল ম্যানেজার আব্দুর রশিদ জানান, তাদের পিক আওয়ারে ১২০ মেগাওয়াট ও অফপিক আওয়ারে ৮০ মেগাওয়াট চাহিদা রয়েছে। ঈদের ছুটিতে চাহিদামতো বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া গেছে।

কুমিল্লায় ঈদের ছুটিতে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল বলে দাবি করা হয়েছে। কুমিল্লা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর জেনারেল ম্যানেজার মো. রাশেদুজ্জামান বলেন, ঈদের ছুটিতে প্রতিদিন গড়ে ১৪০-১৫০ মেগাওয়াট চাহিদা ছিল। রোববার সন্ধ্যায় সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৫৬ মেগাওয়াট। তিনি আরও বলেন, ঈদের ছুটিতে কোথাও লোডশেডিং দিতে হয়নি।  

কুমিল্লা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার দিলীপ চন্দ্র চৌধুরী বলেন, ঈদের ছুটিতে গড়ে ১৭০ মেগাওয়াট চাহিদা ছিল এবং জাতীয় গ্রিড থেকে সমপরিমাণ বিদ্যুৎ পাওয়া যায়। 

কিশোরগঞ্জেও ঈদের দিন থেকে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। ঈদের আগের দিন শহরে সাত দফায় মোট চার ঘণ্টার মতো লোডশেডিং হলেও পরে সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে আসে। পিডিবির নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুর রউফ জানান, কিশোরগঞ্জে ২৪ মেগাওয়াট চাহিদার পুরো সরবরাহ এখন পাওয়া যাচ্ছে। একইভাবে পল্লী বিদ্যুতের 

মহাব্যবস্থাপক মো. আতিকুজ্জামান জানান, আগে ৯০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৬০ মেগাওয়াটের মতো বিদ্যুৎ পাওয়া গেলেও ঈদের ছুটিতে পুরো চাহিদার বিদ্যুৎ সরবরাহ মিলেছে।

রাজবাড়ীতেও ঈদের ছুটিতে লোডশেডিং ছিল না। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, বর্তমানে জেলায় বিদ্যুতের কোনো ঘাটতি নেই। যদিও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সাময়িক কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছিল। জেলায় দৈনিক ৮০ মেগাওয়াট চাহিদার পুরোটা সরবরাহ করা হয়েছে।

একই চিত্র মৌলভীবাজার ও ফেনী জেলায়ও। মৌলভীবাজারে ১১৫ মেগাওয়াট চাহিদার সমপরিমাণ বিদ্যুৎ পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন পল্লী বিদ্যুতের জেনারেল ম্যানেজার সুজিত কুমার দাশ। বিদ্যুৎ বিতরণ বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী হোসাইন মোহাম্মদ সাব্বিরও জানান, জেলায় চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ রয়েছে। ফেনীতে পিডিবি ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মোট ১৭০ মেগাওয়াট চাহিদার সমপরিমাণ বিদ্যুৎ পাওয়ায় কোনো লোডশেডিং করতে হয়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

তবে দেশের অন্য কয়েকটি এলাকায় পরিস্থিতি ছিল একেবারেই ভিন্ন। মুন্সীগঞ্জে ঈদের ছুটির মধ্যেও নিয়মিত লোডশেডিং হয়েছে। জেলার ছয়টি উপজেলায় দিন-রাত মিলিয়ে পাঁচ দফা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতার অভিযোগ করেছেন গ্রাহকরা। মুন্সীগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির এজিএম (পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ) মুহাম্মদ সোহরাব আলী বলেন, জেলায় প্রতিদিন ১৭৫-১৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা থাকলেও সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১১০-১১৫ মেগাওয়াট। প্রায় ৬০ মেগাওয়াট ঘাটতির কারণে লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলায় বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এক সপ্তাহ ধরে পৌর শহরে প্রতিদিন গড়ে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। বাউফল পল্লী বিদ্যুতের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মজিবর রহমান চৌধুরী বলেন, ঝড়ে বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুতের সঞ্চালন লাইনের খুঁটি উপড়ে পড়ায় সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। সীমিত সরবরাহ দিয়ে পৌর শহরসহ ১৫টি ইউনিয়নের চাহিদা মেটাতে হয়েছে।

রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলায় ঈদের আগের দিন থেকে দিনে অন্তত তিনবার বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতার অভিযোগ উঠেছে। তবে রংপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর মহাব্যবস্থাপক আশরাফ উদ্দিন খান বলেন, উপকেন্দ্রের রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য কিছু সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখতে হয়েছে। বর্তমানে সরবরাহ শতভাগ স্বাভাবিক রয়েছে এবং কোনো লোডশেডিং নেই।

সবচেয়ে নাজুক পরিস্থিতির খবর এসেছে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলা থেকে। স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, উপজেলা সদরে প্রতিদিন পাঁচ থেকে আট ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের গ্রামাঞ্চলে এই সময়সীমা বেড়ে ১২-১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত পৌঁছে। দীর্ঘদিনের এ ভোগান্তির প্রতিবাদে শনিবার শ্যামনগর মাইক্রোস্ট্যান্ডে এলাকাবাসীর ব্যানারে বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে।

যশোরের অভয়নগরেও লোডশেডিং ভয়াবহ আকার ধারণ করে। শহরাঞ্চলে তুলনামূলক কম হলেও গ্রামাঞ্চলে প্রতিদিন ১০-১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। নওয়াপাড়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর এজিএম (কম) মেহেদী ইসলাম জানান, চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ কম পাওয়ায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে।

সরকারি তথ্যে লোডশেডিং নেই 
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির তথ্য মতে, ঈদের ছুটিতে লোডশেডিং তেমন ছিল না। ঈদের দিন বৃহস্পতিবার বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি বেশ স্বাভাবিক ছিল। দিনের বেশির ভাগ সময় লোডশেডিং শূন্য থাকলেও রাত ৯টায় ১৪ মেগাওয়াট এবং পরবর্তী কয়েক ঘণ্টায় সামান্য (৮ মেগাওয়াট) লোডশেডিং দেখা যায়। পরদিন শুক্রবার রাত ৯টায় ৫ মেগাওয়াট এবং রাত ১২টায় ৩ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়। বাকি সময়ে চাহিদা ও সরবরাহ সমান ছিল। শনিবার লোডশেডিংয়ের পরিমাণ কিছুটা বৃদ্ধি পায়। সকাল ১০ ও ১১টায় সর্বোচ্চ ৪০ মেগাওয়াট করে এবং দুপুর ১২টায় ৫০ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়। আবার রাতের দিকে ১০টা থেকে ১২টা পর্যন্ত ৩০ থেকে সর্বোচ্চ ৬৭ মেগাওয়াট লোডশেডিং রেকর্ড করা হয়। শনিবার রাত ১টা থেকে ৫টা পর্যন্ত সর্বনিম্ন ৫ থেকে সর্বোচ্চ ৩৫ মেগাওয়াট লোডশেডিং হলেও গতকাল রোববার সকাল ৬টা থেকে সন্ধা ৬টা পর্যন্ত কোনো লোডশেডিং ছিল না।

গতকাল দুপুর ১২টার দিকে চাহিদা ১১ হাজার মেগাওয়াটে দাঁড়ায় এবং সেই চাহিদার সমপরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়।

[তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিরা] 

আরও পড়ুন

×