গ্যাস সংকটে তেলের বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন বাড়াতে চায় পিডিবি
বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পাওনা প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা
ফাইল ছবি
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৩৭ | আপডেট: ২৬ আগস্ট ২০২৬ | ১০:৪৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
গ্যাস সংকট সামাল দিতে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়াতে চায় সরকার। এ জন্য বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করেছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। তবে বকেয়া বিল পরিশোধ না হলে চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রগুলোর মালিকরা। তাদের দাবি, পাওনা পরিশোধ করা হলে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে আরও প্রায় আড়াই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দেওয়া সম্ভব।
বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের (বিপ্পা) সভাপতি ডেভিড হাসনাত বলেন, পিডিবি তাদের কাছ থেকে প্রায় ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চেয়েছে। বর্তমানে বেসরকারি ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে প্রায় দুই হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দেওয়া হচ্ছে। বকেয়া পরিশোধ করা হলে আরও প্রায় আড়াই হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।
তিনি বলেন, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছে পিডিবির প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। সরকার পুরো বকেয়া একসঙ্গে পরিশোধ করতে না পারলেও অন্তত দুই মাসের বিল রেখে বাকি অর্থ পরিশোধ করলে উদ্যোক্তারা নতুন ঋণপত্র খুলে জ্বালানি তেল আমদানি করতে পারবেন। এতে কেন্দ্রগুলো বাড়তি সক্ষমতায় চালানো সম্ভব হবে।
গ্যাসের বদলে তেল
সাম্প্রতিক সময়ে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া এবং এলএনজি সরবরাহে কয়েক দফা বিঘ্নের কারণে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। তাই বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে তেলভিত্তিক কেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে পিডিবি।
বিশেষ করে শিল্পে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর সিদ্ধান্তের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ব্যবহার কিছুটা কমিয়ে তেলভিত্তিক কেন্দ্র চালানোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হবে। তবে তেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ গ্যাসের তুলনায় বেশি হওয়ায় সরকারের ব্যয় বাড়বে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, বর্তমান সংকটে সরকারকে একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহ ঠিক রাখা এবং শিল্পে গ্যাস দেওয়া– দুই দিকই সামলাতে হচ্ছে। এ অবস্থায় তেলভিত্তিক কেন্দ্র চালানো তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজন হতে পারে। এতে শিল্পে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। তবে দীর্ঘ সময় তেলভিত্তিক কেন্দ্র চালানো হলে পিডিবির আর্থিক দায় বাড়বে বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, এটি সংকট মোকাবিলার সাময়িক ব্যবস্থা হতে পারে, তবে স্থায়ী সমাধান নয়।
বিপ্পার সাবেক সভাপতি ইমরান করিম বলেন, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর শুধু বিদ্যুৎ বিলই বকেয়া নেই, পিডিবির আরোপ করা এলডি বা জরিমানার বিষয়ও রয়েছে। এসবেরও সমাধান করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, বেসরকারি কেন্দ্রগুলো গ্রিডে বিদ্যুৎ দিতে প্রস্তুত। তবে জ্বালানি কেনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করতে হবে।
সক্ষমতার ১৯ শতাংশ ফার্নেস অয়েলভিত্তিক
পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, দেশে গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার ৫৯৩ মেগাওয়াট। এর মধ্যে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা পাঁচ হাজার ৬৪১ মেগাওয়াট, যা মোট সক্ষমতার প্রায় ১৯ শতাংশ। গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রের সক্ষমতা ১২ হাজার ৪৭২ মেগাওয়াট বা ৪২ শতাংশ। এ ছাড়া কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের সক্ষমতা সাত হাজার ২০৩ মেগাওয়াট, ডিজেলভিত্তিক ৭৬৮ মেগাওয়াট, নবায়নযোগ্য জ্বালানির এক হাজার ১২৯ মেগাওয়াট এবং আমদানি করা বিদ্যুতের সক্ষমতা দুই হাজার ৬৯৬ মেগাওয়াট।
খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত তেলভিত্তিক কেন্দ্র দিয়ে ঘাটতি সামাল দেওয়া যেতে পারে। তবে এতে জ্বালানি আমদানিতে বাড়তি অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি পিডিবির বকেয়া আরও বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাই গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ জোরদার করা প্রয়োজন।