স্থাপনা
৪০০ বছরের ইতিহাসের সাক্ষী ‘ তেরজুরি’
পটিয়ার আজিমপুর গ্রামে আলী আকবর চৌধুরীর জমিদার বাড়ি। সম্প্রতি তোলা সমকাল
নাসির উদ্দিন হায়দার, চট্টগ্রাম, আহমদ উল্লাহ, পটিয়া
প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৫৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
চট্টগ্রামের পটিয়া সদর থেকে বাইপাস সড়ক পেরিয়ে অলিহাট। এরপর আজিমপুর গ্রামের পথ ধরে এগোলে চোখে পড়ে এক পুরোনো জমিদারবাড়ি। চারপাশে সারি সারি তাল, সুপারি ও নারিকেল গাছ। সামনে দুটি দিঘি। সময়ের ভারে বাড়িটির অনেক কিছুই বদলে গেছে, কিন্তু এক প্রান্তে এখনও দাঁড়িয়ে আছে শ্যাওলা-আগাছায় ঢাকা একটি ভাঙাচোরা স্থাপনা। মোটা সীমানাপ্রাচীরের ভেতর নীরবে টিকে থাকা সেই স্থাপনার নাম ‘তেরজুরি’।
প্রায় ৪০০ বছর আগে এখানে জমিদারির টাকা-পয়সা, ধন-সম্পদ আর মূল্যবান কাগজপত্র রাখা হতো। আজ এটি কেবল ধ্বংসের চিহ্ন। স্থাপনাটির কদর শেষ হয়ে গেলেও হারায়নি নাম। চট্টগ্রামের মানুষের মুখে এখনও শোনা যায়– ‘আত্তুন কি তেরজুরি আছে?’ অর্থাৎ ‘আমার কি অঢেল টাকা আছে?’
‘তেরজুরি’ মূলত চট্টগ্রামের জমিদারদের ব্যাংক। জমিদারবাড়িতে অর্থ ও মূল্যবান সম্পদ রাখার জন্য ব্যবহৃত সুরক্ষিত স্থাপনা এটি। আজিমপুরের পুরোনো জমিদারবাড়ির উঠানে রয়েছে আলী আকবর চৌধুরী পরিবারের দশম উত্তরসূরি রসায়নবিদ গোলাম মওলা চৌধুরীর বাংলো বাড়ি। উৎসবে তার পরিবার জমিদারবাড়িতে যায়। তবে অন্য উত্তরসূরিরা সেখানে থাকেন না। জমিদারবাড়ি দেখতে দূরদূরান্ত থেকে লোকজন আসেন।
গোলাম মওলা জানান, তাঁর পূর্বপুরুষ আলী আকবর চৌধুরী ১৬ শতকে ৩৬ সম্প্রদায়ের মানুষ নিয়ে ইয়েমেন থেকে পটিয়ার আজিমপুর আসেন। জমিদারির টাকা-পয়সা, সম্পদ ও মূল্যবান কাগজপত্র রাখার জন্য ‘তেরজুরি’ তৈরি করেছিলেন তারা।
গোলাম মওলা বলেন, ‘এটি ছিল ৩০ ফুট বাই ৪০ ফুটের একটি স্থাপনা। মাটির নিচেও ছিল অংশবিশেষ। চৌধুরী মসজিদ ও তেরজুরির ইট একই ধরনের। এটি সরকারিভাবে সংরক্ষণ করা জরুরি, নয়তো এটি হারিয়ে যাবে।’
ট্রেজারি থেকে ‘তেরজুরি’?
কারও ধনী অবস্থা বোঝাতে ‘তেরজুরি’ শব্দটি ব্যবহার হয়। চট্টগ্রামের একটি প্রচলিত বচন ‘তেরজুরি বাই যারগুই?’ অর্থাৎ ‘টাকা কি ভেসে যাচ্ছে?’ লোকগানেও তেরজুরি শব্দটির ব্যবহার দেখা যায়। যেমন ‘ও হায়রে হায়! তেরজুরি মারি যার গৈ রেঙ্গুইন্নার ছিপাই’। অর্থাৎ ‘রেঙ্গুনের কোন সিপাই কোষাগার মেরে পালিয়ে যাচ্ছে।’
‘তেরজুরি’ হলো ধনভান্ডার, কোষাগার, কিংবা টাকা-পয়সা ও মূল্যবান সম্পদ রাখার নিরাপদ স্থান। শব্দটির উৎস নিয়ে চট্টগ্রামের স্থানীয়দের মত, এটি ইংরেজি ‘Treasury’ শব্দের চট্টগ্রামের রূপ। শিক্ষাবিদ ড. এনামুল হক তাঁর ‘চট্টগ্রামী বাংলার রহস্যভেদ’ গ্রন্থে ইংরেজি ‘Treasury’ শব্দ থেকে ‘তেরজুরি’ এসেছে বলে উল্লেখ করেছেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক, ভাষাবিজ্ঞানী ড. আবুল কাসেম এনামুল হককে সমর্থন করে বলেন, ইংরেজি ‘Treasury’ শব্দ থেকে তেরজুরির উৎপত্তি। তবে তিনি বলেন, ‘জমিতে হাল জোড়ার সঙ্গে তেরজুরির সম্পর্ক রয়েছে। অতীতে ১৩ জোড়া লাঙলের মালিকদের সম্পদশালী মনে করা হতো। অর্থাৎ যে পরিবার তের জোড়া হাল দিয়ে জমি চাষ করতে পারে, সেই পরিবারে ‘তেরজুরি’ থাকে– এমন কথা চট্টগ্রামে এখনও প্রচলিত।’
ক্ষমতার প্রতীক
আলী আকবর চৌধুরী জমিদারবাড়ির জামাতা গবেষক রশীদ এনাম বলেন, “শুনেছি, আগেকার দিনে জমিদারের হাতে যত বেশি সম্পদ, তার সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব তত বেশি ছিল। তেরজুরি ছিল এক অর্থে জমিদারি ক্ষমতার দৃশ্যমান প্রতীক। যে বাড়িতে বিশাল তেরজুরি ছিল, সেই বাড়ির আর্থিক সামর্থ্য সম্পর্কে স্থানীয় মানুষের ধারণাও ছিল আলাদা। এখান থেকেই হয়তো তেরজুরি ধীরে ধীরে মানুষের কথ্য ভাষায় ‘অঢেল সম্পদ’ বা বিপুল অর্থের প্রতীক হয়ে ওঠে।”
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও নাট্যজন সুবীর মহাজন বলেন, ‘একটি শব্দ কীভাবে একটি জনপদের অর্থনীতি, রাজনীতি, স্থাপত্য ও লোক সংস্কৃতির স্মৃতি বহন করতে পারে; ‘তেরজুরি’ তারই এক অনন্য উদাহরণ।
- বিষয় :
- ইতিহাস