এলএনজি ক্রয়
পুনঃদরপত্রে বাড়তি গুনতে হচ্ছে ১২৩ কোটি টাকা
সাড়ে চার হাজার কোটি টাকায় ৪ কার্গো এলএনজি কেনায় অনুমোদন
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৫৯ | আপডেট: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:০৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
গ্যাস সংকট সামাল দিতে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের জন্য আরও চার কার্গো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কেনার অনুমোদন দিয়েছে সরকার। এর মধ্যে তিনটি কার্গো স্পট মার্কেট থেকে এবং একটি স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় কেনা হবে। চার কার্গো কিনতে ব্যয় হবে প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা। ৯ দিন আগে কেনা কার্গোর তুলনায় এবার তিনটি কার্গোর প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম বেড়েছে সর্বোচ্চ প্রায় সাড়ে চার ডলার।
এদিকে কম দামে এলএনজি পাওয়ার আশায় আগের দরপত্র বাতিল করে পুনঃদরপত্র ডাকায় উল্টো বেশি দামে দুটি কার্গো কিনতে হচ্ছে। এতে সরকারের বাড়তি ব্যয় হবে প্রায় এক কোটি মার্কিন ডলার (প্রায় ১২৩ কোটি টাকা)।
গতকাল বুধবার অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে চার কার্গো এলএনজি কেনার প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়। অনুমোদন অনুযায়ী, ১০ সেপ্টেম্বর সরবরাহের জন্য সৌদি আরামকো ট্রেডিং সিঙ্গাপুরের কাছ থেকে স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় প্রতি ইউনিট এলএনজি ২৩ দশমিক ৯৮ ডলার (প্রতি ইউনিট প্রায় দুই হাজার ৯৫০ টাকা) দরে একটি কার্গো কেনা হচ্ছে। স্পট মার্কেট থেকে ২৫-২৬ সেপ্টেম্বরের জন্য আরামকো ট্রেডিং সিঙ্গাপুরের কাছ থেকে প্রতি ইউনিট ২৭ দশমিক ৫৪ ডলার (প্রায় তিন হাজার ৩৮৭ টাকা), ১-২ অক্টোবরের জন্য বিপি সিঙ্গাপুরের কাছ থেকে ২৮ দশমিক ০৩ ডলার (প্রায় তিন হাজার ৪৪৮ টাকা) এবং ৫-৬ অক্টোবরের জন্য ভিটল এশিয়ার কাছ থেকে ২৬ দশমিক ৬৬৮ ডলার (প্রায় তিন হাজার ২৮০ টাকা) দরে এলএনজি কেনা হবে। এর মধ্যে ২৫-২৬ সেপ্টেম্বরের কার্গোটির আমদানি ব্যয় প্রায় এক হাজার ১৬৫ কোটি টাকা। ১-২ অক্টোবরের কার্গোটির ব্যয় এক হাজার ১৮৫ কোটি টাকার বেশি। ৫-৬ অক্টোবরের কার্গো কিনতে ব্যয় হবে প্রায় এক হাজার ১৩০ কোটি টাকা।
পুনঃদরপত্রে বাড়তি খরচ
পুনঃদরপত্রের কারণে দুটি কার্গোর দাম বেড়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২৫-২৬ সেপ্টেম্বর সরবরাহের জন্য গত সোমবারের দরপত্রে বিপি সিঙ্গাপুর প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম চেয়েছিল ২৫ দশমিক ৬২ ডলার (প্রায় তিন হাজার ১৫১ টাকা)। দাম বেশি বিবেচনায় সেই দরপত্র বাতিল করে নতুন করে দর চাওয়া হয়। কিন্তু পুনঃদরপত্রে একই সময়ের কার্গোর সর্বনিম্ন দর আসে ২৭ দশমিক ৫৪ ডলার (প্রায় তিন হাজার ৩৮৭ টাকা)। এতে এই কার্গোতেই সরকারের বাড়তি ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৬৫ লাখ ডলার (প্রায় ৮০ কোটি টাকা)।
অন্যদিকে, ৫-৬ অক্টোবর সরবরাহের জন্য আগের দরপত্রে ভিটল এশিয়া প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম চেয়েছিল প্রায় ২৫ দশমিক ৫ ডলার (প্রায় তিন হাজার ১৩৭ টাকা)। পুনঃদরপত্রে একই প্রতিষ্ঠান ২৬ দশমিক ৬৬৮ ডলার (প্রায় তিন হাজার ২৮০ টাকা) দর দিয়েছে। এতে এই কার্গোতে বাড়তি ব্যয় হবে প্রায় ৩০ লাখ ডলার (প্রায় ৩৭ কোটি টাকা)। সব মিলিয়ে দুই কার্গোতেই সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় এক কোটি ডলারের বেশি (১২৩ কোটি টাকার বেশি)।
জ্বালানি বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমার প্রত্যাশায় আগের দরপত্র বাতিল করা হয়েছিল। কিন্তু এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বেড়ে যায়। তাই পুনঃদরপত্র করেও কম দামে কার্গো পাওয়া যায়নি।
আগের চেয়ে বাড়ল দাম
চলমান জ্বালানি সংকটের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ের এলএনজি কেনার দামের সঙ্গেও এবার বড় পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। গত ২৪ আগস্ট দুই কার্গো কেনার অনুমোদনে প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম ছিল ২৪ দশমিক ৬২ ও ২৪ দশমিক ২৫ ডলার। এর আগে ১৯ আগস্ট একটি কার্গোর দাম ছিল ২৩ দশমিক ৯৩ ডলার। কিন্তু এবার তিনটি স্পট কার্গোর দাম ২৬ দশমিক ৬৭ থেকে ২৮ দশমিক ০৩ ডলারে উঠেছে। অর্থাৎ, দুই সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি ইউনিট এলএনজি কেনায় খরচ বেড়েছে সর্বোচ্চ প্রায় চার ডলার এক সেন্ট। জুলাইয়ের শেষ দিকে একটি কার্গোর ব্যয় ৯৪৩ কোটি টাকা ছাড়িয়েছিল। এবার তিনটি কার্গোর প্রতিটির আমদানি ব্যয় প্রায় এক হাজার ১৩০ থেকে এক হাজার ১৮৫ কোটি টাকা।
১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রেশনিং
দুই মাস ধরে গ্যাসের সংকটে ভুগছে দেশের বিভিন্ন খাত। এর মধ্যে এলএনজি সরবরাহে একের পর এক জটিলতা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করেছে। জুলাই ও আগস্টে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকায় সরবরাহ কমে যায়। টার্মিনাল চালু হওয়ার পরও প্রয়োজন অনুযায়ী এলএনজি পাওয়া যাচ্ছে না। একই সময়ে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদনও কমেছে।
১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পরিস্থিতি সামাল দেওয়া নিয়েই পেট্রোবাংলা বড় চাপে আছে। আগামী ৬ সেপ্টেম্বর সরবরাহের জন্য সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ব্ল্যাক কিউবের কাছ থেকে একটি কার্গো এলএনজি কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি কার্গো সরবরাহ করতে পারছে না। ওই সময়ের জন্য দুই দফা স্পট দরপত্র করেও কোনো সরবরাহকারী পাওয়া যায়নি। তাই ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহে রেশনিং করতে হচ্ছে।
পেট্রোবাংলা সূত্র বলছে, ১০ সেপ্টেম্বর সৌদি আরামকো ট্রেডিং সিঙ্গাপুরের কার্গো আসার কথা রয়েছে। ওই কার্গো পাওয়া গেলে এলএনজি সরবরাহ কিছুটা বাড়বে। বর্তমানে দুটি ভাসমান টার্মিনাল থেকে দৈনিক প্রায় ৭১ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। কার্গো সরবরাহ বাড়লে টার্মিনাল দুটির মাধ্যমে সরবরাহ ৯০ কোটি ঘনফুটের বেশি হতে পারে। এর ফলে সার্বিক গ্যাস সরবরাহ প্রায় ২৪৫ কোটি ঘনফুটে উঠতে পারে।
পেট্রোবাংলার গতকাল বুধবার বিকেল ৪টার তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ হয়েছে ২৩৩ কোটি ৯০ লাখ ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় গ্যাস ১৬২ কোটি ৫০ লাখ এবং আমদানি করা এলএনজি বা আরএলএনজি ৭১ কোটি ৪০ লাখ ঘনফুট। বিপরীতে দৈনিক চাহিদা প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট।
দুই হাজার মেগাওয়াট ছাড়াল লোডশেডিং
গতকাল দিনের শুরুতে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি তুলনামূলক স্বাভাবিক থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত বাড়তে থাকে ঘাটতি। সকাল ১০টায় লোডশেডিং ছিল মাত্র ৩৩৮ মেগাওয়াট। এক ঘণ্টার ব্যবধানে তা বেড়ে দাঁড়ায় এক হাজার ১৪২ মেগাওয়াটে। দুপুর ১টায় ঘাটতি আরও বেড়ে হয় এক হাজার ৭৮৭ মেগাওয়াট। এর পর পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়। বিকেল ৩টায় লোডশেডিং দুই হাজার ২১৭ মেগাওয়াট এবং বিকেল ৪টায় সর্বোচ্চ দুই হাজার ৩২০ মেগাওয়াটে ওঠে। বিকেল ৫টায়ও ঘাটতি ছিল দুই হাজার ১৪৬ মেগাওয়াট।
বিদ্যুৎ সরবরাহের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল দুপুর ১২টায় দিনের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৩৫০ মেগাওয়াট। এ সময় সরবরাহ হয়েছে ১৩ হাজার ৫২৩ মেগাওয়াট। ঘাটতি ছিল এক হাজার ৮২৭ মেগাওয়াট।
এর আগে মঙ্গলবার রাতেও বড় ঘাটতি ছিল। রাত ১টায় লোডশেডিং হয় দুই হাজার ৩৭৬ মেগাওয়াট। রাত ২টায় দুই হাজার ৩৬৪ এবং রাত ৩টায় দুই হাজার ২৪০ মেগাওয়াট ঘাটতি ছিল।
সোমবার সন্ধ্যায় পরিস্থিতি ছিল আরও খারাপ। সন্ধ্যা ৬টায় লোডশেডিং হয় দুই হাজার ৯০৯ মেগাওয়াট। রাত ৯টায় দুই হাজার ৩৯৭ মেগাওয়াট ঘাটতি ছিল। কয়েক দিন ধরে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঘন ঘন লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
- বিষয় :
- এলএনজি
- গ্যাস সংকট
- বিদ্যুৎ সংকট
- লোডশেডিং