টু-জি বন্ধের পথে বাংলাদেশ, বিপাকে সাড়ে ছয় কোটি গ্রাহক
ছবি: সংগৃহীত
হাসনাইন ইমতিয়াজ
প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬ | ১৪:৫২ | আপডেট: ১৯ অক্টোবর ২০২৬ | ১৪:৫৩
দেশে টু-জি মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধের পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। এ জন্য ২০২৯ সালের ডিসেম্বরকে লক্ষ্য ধরে রোডম্যাপ তৈরির প্রস্তাব করা হচ্ছে। তবে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বড় বাধা সাশ্রয়ী ফোনের অভাব। দেশে সাড়ে ছয় কোটির বেশি গ্রাহক এখনও বাটন ফোন ব্যবহার করেন, যার বেশির ভাগই শুধু টু-জি নেটওয়ার্কে চলে। ফলে নেটওয়ার্ক বন্ধ হলে এসব গ্রাহককে নতুন ফোন কিনতে হবে।
গ্রাহকদের নতুন নেটওয়ার্কে স্থানান্তর করতে হলে কম দামে ফোনের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি মোবাইল অপারেটর, উৎপাদনকারী ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
বিটিআরসি সূত্রে জানা গেছে, ২০২৯ সালের ডিসেম্বরকে লক্ষ্য ধরে টু-জি বন্ধের রোডম্যাপ তৈরির প্রস্তাব করা হচ্ছে। এ বিষয়ে সরকারের অনুমোদন নিতে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে প্রস্তাব পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। অনুমোদন পেলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
স্মার্টফোনের দামই বড় বাধা
বিটিআরসির হিসাবে, দেশে মোবাইল ফোন সংযোগের সংখ্যা প্রায় ১৯ কোটি। এর মধ্যে সাড়ে ছয় কোটির বেশি গ্রাহক ফিচার ফোন বা বাটন ফোন ব্যবহার করেন। এসব ফোনের বেশির ভাগই টু-জি প্রযুক্তিনির্ভর। ফলে নেটওয়ার্ক বন্ধ হলে তাদের নতুন ফোন কিনতে হবে।
কিন্তু বাটন ফোনের সঙ্গে স্মার্টফোনের দামের বড় পার্থক্য। মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এমআইওবি) সভাপতি যাকারিয়া শহীদ বলেন, একটি বাটন ফোন ৮০০ থেকে এক হাজার টাকায় পাওয়া যায়। অন্যদিকে, ফোরজি-সমর্থিত ফিচার ফোন বা সবচেয়ে কম দামের স্মার্টফোন কিনতেও তিন থেকে ছয় হাজার টাকা লাগে। এই বাড়তি টাকা গ্রাহক কোথায় পাবেন, তার সমাধান করতে হবে।
যাকারিয়া শহীদের মতে, প্রথম বছরে কতজন গ্রাহক ফোন বদলান, তা দেখে পরবর্তী পরিকল্পনা করা উচিত। প্রথম বছরেই যদি প্রায় এক কোটি গ্রাহক ফোন বদলান, তাহলে তিন বছরে লক্ষ্য অর্জনের সম্ভাবনা তৈরি হবে।
ফোনের দাম বাড়ার পেছনে যন্ত্রাংশের মূল্যও ভূমিকা রাখছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তির প্রসারে মেমোরি চিপের চাহিদা ও দাম বাড়ছে। এতে কম দামে স্মার্টফোন উৎপাদন কঠিন হয়ে পড়ছে।
বাজার তৈরি জরুরি
শুধু ফোন উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই টু-জি বন্ধের পরিকল্পনা সফল হবে না বলে মনে করেন যাকারিয়া শহীদ। তাঁর মতে, আগে গ্রাহকের চাহিদা তৈরি করতে হবে, এরপর উৎপাদনকারীদের লক্ষ্য দিতে হবে। বাজার তৈরি না করে উদ্যোক্তাদের ফোন উৎপাদনে বাধ্য করলে উদ্যোগটি ব্যর্থ হতে পারে। আগেও এমন উদ্যোগে কোম্পানিগুলো লোকসানে পড়েছে।
সরকারকে অপারেটর, ফোন উৎপাদনকারী ও অন্য অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে কার কী দায়িত্ব, তা ঠিক করতে হবে। পাশাপাশি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সহযোগিতাও দিতে হবে।
পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকার ফোন তৈরির উদ্যোগ
দেশে কম দামে স্মার্টফোন উৎপাদনের উদ্যোগ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসাদ আগে চার হাজার টাকার মধ্যে স্মার্টফোন তৈরির লক্ষ্য নেওয়ার কথা বলেছিলেন। পরে যন্ত্রাংশের দামসহ বিভিন্ন কারণে সেই লক্ষ্য পাঁচ হাজার টাকায় পুনর্নির্ধারণের কথা জানানো হয়।
বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে প্রায় তিন কোটি ২৮ লাখ মোবাইল ফোন উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে দুই কোটি ১২ লাখের বেশি ছিল টু-জি ফিচার ফোন, যা মোট উৎপাদনের ৬৪ দশমিক ৬৯ শতাংশ। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত উৎপাদিত প্রায় এক কোটি ৮২ লাখ ফোনের মধ্যে এক কোটি ২০ লাখের বেশি ছিল টু-জি ফিচার ফোন। এ সময়ে মোট উৎপাদনের ৬৬ দশমিক ২৩ শতাংশ ছিল টু-জি ফোন।
স্থানীয় উৎপাদন বাড়াতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ফোন তৈরির জন্য আমদানি করা ২২ ধরনের কাঁচামালের ওপর অগ্রিম আয়কর কমিয়ে ১ শতাংশ করা হয়েছে। স্থানীয় উৎপাদনকারীদের জন্য শুল্ক ও শর্তসাপেক্ষে মূল্য সংযোজন করের ছাড়ও ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
তবে উৎপাদন খরচ কমানোর পাশাপাশি ফোন কেনার সামর্থ্য বাড়ানোও জরুরি। বিটিআরসি সূত্র জানায়, ভর্তুকিতে স্মার্টফোন সরবরাহ, কিস্তিতে কেনার সুযোগ, সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিলের ব্যবহার এবং কর-শুল্ক কমানোর মতো প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে। কম দামের ভোল্টিই-সমর্থিত ফিচার ফোনের সরবরাহ বাড়ানোর কথাও চিন্তা করা হচ্ছে।
ধাপে ধাপে বন্ধের রোডম্যাপ
বিটিআরসির প্রস্তাবে টু-জি বন্ধের জন্য তিনটি সম্ভাব্য সময়সীমা বিবেচনা করা হয়েছে। দ্রুত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ২০২৯ সাল, মাঝারি গতির ক্ষেত্রে ২০৩০ সাল এবং ধীরগতির ক্ষেত্রে ২০৩২ সালকে সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে দেখানো হয়েছে। কমিশন ২০২৯ সালের ডিসেম্বরকে লক্ষ্য ধরে এগোনোর প্রস্তাব করেছে। তবে ২০২৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের মধ্যে অগ্রগতি পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
বিটিআরসি সূত্র জানায়, এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারের অনুমোদন প্রয়োজন। অনুমোদন পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে।
২০২৪ সালের ১ অক্টোবর টু-জি বন্ধের রোডম্যাপ তৈরির উদ্যোগ নেয় বিটিআরসি। একই বছরের ২৮ আগস্ট মোবাইল ফোন উৎপাদনকারীদের সঙ্গে বৈঠকে শুধু টু-জি-সমর্থিত ফিচার ফোন সম্পূর্ণ তৈরি অবস্থায় আমদানির অনুমতি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। পরে অপারেটর, উৎপাদনকারী ও আমদানিকারকদের সঙ্গে আলোচনা করে নেটওয়ার্ক বন্ধের ঝুঁকি, করণীয় এবং গ্রাহক স্থানান্তরের বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা হয়।
পরিকল্পনায় শুধু টু-জি ফোনের আমদানি, উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ ধাপে ধাপে বন্ধ করার কথা রয়েছে। পাশাপাশি টু-জি-নির্ভর যন্ত্র ও সেবার তালিকা তৈরি, আগেভাগে গ্রাহকদের জানানো এবং নতুন প্রযুক্তিতে স্থানান্তরের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিটিআরসির ২৫টি খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রের ওপর চালানো জরিপে দেখা গেছে, কোনো দোকানে নতুন করে আনা ১০০টি টু-জি ফোন বিক্রি করতে সাধারণত দুই থেকে চার মাস লাগে। একজন গ্রাহক গড়ে দেড় থেকে দুই বছর একটি টু-জি ফোন ব্যবহার করেন। গ্রাহকের ফোন বদলানো ও বাজারের পরিস্থিতি বিবেচনায় পরিকল্পনায় আড়াই বছরের ব্যবহারের সময় ধরে হিসাব করার কথা বলা হয়েছে।
টু-জি বন্ধ হলে কী লাভ
টু-জি বন্ধ হলে এই নেটওয়ার্কে ব্যবহৃত তরঙ্গের একটি অংশ ফোরজি ও ভবিষ্যতে ফাইভজি সেবায় কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হবে। এতে অপারেটররা বিদ্যমান তরঙ্গ আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করে ফোরজি নেটওয়ার্কের সক্ষমতা বাড়াতে পারবে। ফলে ইন্টারনেটের গতি ও সেবার মান উন্নত করার সুযোগ তৈরি হবে। ফোরজি নেটওয়ার্কে ভোল্টিই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লে উন্নত মানের ভয়েস কলও দেওয়া সম্ভব। একই সঙ্গে পুরোনো নেটওয়ার্কের যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার খরচ কমানোর সুযোগ রয়েছে। তবে এসব সুবিধা পেতে তরঙ্গ পুনর্বণ্টন, নেটওয়ার্ক উন্নয়ন এবং গ্রাহকদের উপযোগী ফোনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
রবি আজিয়াটা লিমিটেডের চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার শাহেদ আলম বলেন, টু-জি বন্ধের উদ্যোগকে তাঁরা স্বাগত জানান। পুরোনো নেটওয়ার্ক সরিয়ে নেওয়া হলে ফোরজি সেবায় তরঙ্গ বরাদ্দ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। এতে গ্রাহকেরা আরও উন্নত মোবাইল সেবা পাবেন।
ভারত-পাকিস্তানে এখনও চলছে টু-জি
বাংলাদেশের মতো ভারত ও পাকিস্তানেও টু-জি নেটওয়ার্ক পুরোপুরি বন্ধের নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। ভারতে ২০২৪ সালে টেলিযোগাযোগ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে দেওয়া এক প্রস্তাবে স্বল্প আয়ের গ্রাহকদের সহায়তা ছাড়া টু-জি ও থ্রিজি বন্ধের বাধ্যতামূলক সময়সীমা না দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল। পাকিস্তানেও ২০২৬ সালের মে মাসে ৫৭ হাজারের বেশি টু-জি বেস স্টেশন চালু ছিল।
অন্যদিকে, সিঙ্গাপুরে ২০১৭ সালে ধাপে ধাপে টু-জি সেবা বন্ধ করা হয়। সুইজারল্যান্ডে ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে অপারেটররা পর্যায়ক্রমে টু-জি নেটওয়ার্ক সরিয়ে নেয়। ভিয়েতনামও ধাপে ধাপে পুরোনো নেটওয়ার্ক বন্ধ করেছে। ২০২৪ সালে সেখানে শুধু টু-জি ফোনে সেবা বন্ধের প্রথম ধাপ শুরু হয় এবং ২০২৬ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর দেশজুড়ে টু-জি বন্ধের সময়সীমা কার্যকর হয়।
নেটওয়ার্ক আছে, ব্যবহার কম
দেশে চতুর্থ প্রজন্মের (ফোরজি) নেটওয়ার্কের আওতা বাড়লেও মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার এখনও তুলনামূলক কম। বিশেষজ্ঞদের হিসাবে, দেশের প্রায় ৯৯ শতাংশ মানুষ ফোরজি নেটওয়ার্কের আওতায় থাকলেও মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার করেন প্রায় ৪৬ শতাংশ।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির বলেন, সাশ্রয়ী ফোরজি ও ভোল্টিই-সমর্থিত ফোন, নির্ভরযোগ্য ভয়েস সেবা এবং গ্রাহকদের জন্য প্রণোদনা নিশ্চিত করতে হবে। ডিজিটাল সেবায় সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ফল হিসেবে টু-জি বন্ধ হওয়া উচিত; এটি যেন সেই অংশগ্রহণের পূর্বশর্ত না হয়ে দাঁড়ায়।
সময়সীমার আগে প্রস্তুতি জরুরি
খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টু-জি বন্ধের আগে গ্রাহকদের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সেবা ও যন্ত্রের বিকল্প ব্যবস্থা করতে হবে। স্মার্ট মিটার, যানবাহন শনাক্তকরণ ব্যবস্থা, বিক্রয়কেন্দ্রের পয়েন্ট অব সেলস যন্ত্র, নিরাপত্তা অ্যালার্ম এবং বিভিন্ন শিল্পকারখানার যন্ত্র এখনও টু-জি নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল হতে পারে। এসব ব্যবস্থাকে নতুন প্রযুক্তিতে স্থানান্তর না করে নেটওয়ার্ক বন্ধ করলে সেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিটিআরসির পরিকল্পনায় অপারেটরদের কাছ থেকে স্থানান্তর পরিকল্পনা নেওয়া, গ্রাহকদের নিয়মিত বার্তা দিয়ে জানানো, প্রয়োজনে সিম বদলানো এবং যাঁদের পক্ষে নতুন ফোন কেনা কঠিন, তাঁদের সহায়তার ব্যবস্থা করার সুপারিশ রয়েছে। নেটওয়ার্ক বন্ধের আগে জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা ও গুরুত্বপূর্ণ সেবাগুলোর প্রস্তুতি যাচাই করার কথাও বলা হয়েছে।