বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ
পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্তির রায় উপেক্ষিত
আবু সালেহ রনি
প্রকাশ: ০৬ মার্চ ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ০৬ মার্চ ২০২২ | ১৪:৩৬
একাত্তরের অগ্নিঝরা ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) সমবেত জনসমুদ্রে দিয়েছিলেন এক ঐতিহাসিক ভাষণ। মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষায় জাতিকে সুসজ্জিত করেছিল তার এ ভাষণ। এ ভাষণকে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে গত বছরের ২১ সেপ্টেম্বর দেশের সব পাঠ্যপুস্তকে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ অন্তর্ভুক্ত করতে রায় দেন হাইকোর্ট।
রায়ে পাঠ্যসূচিতে ভাষণ অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেওয়া হয়। এ ছাড়া এই রায় বাস্তবায়নের বিষয়ে তিন মাসের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কাছে অগ্রগতি প্রতিবেদন দিতেও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু রায়ের ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও এখনও কোনো প্রতিবেদন দেয়নি শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
গতকাল রোববার সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল কার্যালয়, সুপ্রিম কোর্টের অতিরিক্ত রেজিস্ট্রারের দপ্তরে খোঁজ নিয়েও এই তথ্য পাওয়া গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. ফরহাদুল ইসলাম বলেন, 'এখনও কিছু করা হয়নি। হাইকোর্টের অনেক রায় ফেলে রাখা হয়। ভালো জিনিস মনে করিয়ে দিয়েছেন। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।'
মুক্তিযুদ্ধ ও এ দেশের জনগণের মুক্তির ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের গুরুত্ব অপরিসীম। বঙ্গবন্ধুর এই জাদুকরি ভাষণ মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষায় জাগ্রত জনতার মনোজাগতিক উদ্দীপনার উৎস হয়ে ওঠে। এ কারণে ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণকে জাতিসংঘের ইউনেস্কো থেকে 'মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারে' অন্তর্ভুক্ত করতে ওয়ার্ল্ড ডেমোক্রেসি হেরিটেজের স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এ ভাষণের গুরুত্ব তুলে ধরে বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক (অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি) ও বিচারপতি মো. মমতাজ উদ্দিন আহমেদ (অবসরপ্রাপ্ত আপিল বিভাগের বিচারপতি) এক ঐতিহাসিক রায়ে বলেন, ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ জাতির জন্ম এবং একই বছরের ১৬ ডিসেম্বর সেই জাতি জন্মের স্বীকৃতি পেয়েছে।
এ ভাষণের গুরুত্ব অনুধাবন করে ২০১৭ সালে হাইকোর্টে রিট করেন সুপ্রিম কোর্টের সাবেক সম্পাদক ড. বশির আহমেদ। ওই রিটে রুলের চূড়ান্ত শুনানি নিয়ে গত বছরের ৮ সেপ্টেম্বর রায় দেন হাইকোর্ট। রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহসান (প্রয়াত) ও বিচারপতি শাহেদ নুরউদ্দিন সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ বলেন, 'বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ পাঠ্যপুস্তকে নিয়ে আসা উচিত। এখনকার প্রজন্মকে এ ভাষণ শোনানোর পাশাপাশি এর আধেয় জানানো উচিত।'
হাইকোর্টের রায় বাস্তবায়ন না হওয়ার বিষয়ে রিটকারী বশির আহমেদ সমকালকে বলেন, সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার কার্যালয়সহ দফায় দফায় খোঁজ নিয়েছি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্নিষ্টরা কোনো প্রতিবেদন দেননি। অথচ হাইকোর্টে এ রিট আবেদনটি ২২৬ দিন শুনানির জন্য কার্যতালিকায় ছিল। দীর্ঘ অপেক্ষার পর আমরা রায় পেয়েছি। রায় বাস্তবায়নে গাফিলতি করলে সংশ্নিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনে আদালত আবমাননার মামলা করা হবে। তবুও এই রায় বাস্তবায়ন করতে হবে।
গণহত্যা জাদুঘর ট্রাস্টের সভাপতি ড. মুনতাসীর মামুন বলেন, 'হাইকোর্টের রায় বাস্তবায়ন না হওয়াটা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়। মুক্তিযুদ্ধের সরকার অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতা থাকা অবস্থায়ও যদি এই রায় ফেলে রাখা হয়, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে কী হতে পারে, তা আমাদের গভীরভাবে ভাবতে হবে।'
