ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬

করোনাভাইরাস

প্রতিরোধ করা যাবে তো?

প্রতিরোধ করা যাবে তো?
×

রাজবংশী রায়

প্রকাশ: ২৯ জানুয়ারি ২০২০ | ১৩:৩২

চীনের উহান রাজ্য থেকে প্রাণঘাতী সংক্রামক রোগ করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে দেশে দেশে। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত কোনো রোগী পাওয়া না গেলেও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে দেশব্যাপী। রাস্তাঘাট, বাসাবাড়ি সর্বত্রই আলোচনার কেন্দ্রে এই ভাইরাস।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠিক কীভাবে শুরু হয়েছিল চীনে, সে সম্পর্কে এখনও নিশ্চিত হতে পারেননি সে দেশের স্বাস্থ্য বিভাগ ও বিশেষজ্ঞরা। তবে তাদের অনেকের ধারণা, প্রাণী থেকে মানুষের দেহে সংক্রমিত হয়েছে এ রোগ। এরপর ছড়িয়েছে মানুষ থেকে মানুষে। আবার অনেকে ধারণা করছেন, কিছু সামুদ্রিক প্রাণী, যেমন- বেলুগা জাতীয় তিমি করোনাভাইরাসের বাহক হতে পারে। এ ভাইরাসের উৎপত্তিস্থল উহানের একটি বাজার; মুরগি, বাদুড়, খরগোশ, সাপসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী পাওয়া যায় সেখানে এবং এসব প্রাণীর মাধ্যমে করোনাভাইরাস সংক্রমিত হতে পারে মানুষের দেহে। এ সবকিছুই ধারণাগত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও এই নতুন ভাইরাস সম্পর্কে এখন পর্যন্ত কিছু বলতে পারেনি। এটি প্রতিরোধে ওষুধ কিংবা টিকা আবিস্কার হয়নি। কোন পরীক্ষার মাধ্যমে এটি শনাক্ত করা সম্ভব হবে, জানা যায়নি তাও। এতে করে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে সর্বত্রই। এ অবস্থায় ভাইরাসটি বাংলাদেশে সংক্রমিত হলে পরিস্থিতি কী হতে পারে, এই সংক্রমণ ঠেকাতে বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত- প্রশ্ন উঠেছে তা নিয়ে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, 'করোনাভাইরাসটি বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়লে তা অত্যন্ত ভয়াবহ হবে। এটি হয়তো সামাল দেওয়া অসম্ভব হতে পারে। কারণ, জাতি হিসেবে আমরা নিয়মতান্ত্রিক নই। চীন যেভাবে এই ভাইরাসের উৎসস্থল উহান রাজ্যকে অন্যান্য রাজ্য, এমনকি বিশ্বের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে, সেটি বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব হবে না। এ দেশের মানুষ সেটি মানতেও চাইবে না। সুতরাং এটি সংক্রমিত হলে তা প্রতিরোধ করা কঠিন হয়ে পড়বে।'

ডা. নজরুল ইসলাম আরও বলেন, নতুন ছড়িয়ে পড়া এই ভাইরাস প্রতিরোধে কোনো টিকা কিংবা ভ্যাকসিন এখনও আবিস্কার হয়নি। এমনকি কোন পরীক্ষার মাধ্যমে এটি শনাক্ত করা হবে, সে সম্পর্কেও কারও ধারণা নেই। এ রোগের চিকিৎসা সম্পর্কে চিকিৎসকদের এখনও জানা নেই, যা এই রোগ প্রতিরোধ করতে পারে। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে কথা বলে যতটুকু জানা গেছে, তাতে আশা করা যায়, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই হয়তো এই ভাইরাস প্রতিরোধের ওষুধ আবিস্কার হবে।

তবে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) পরামর্শক রোগতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ডা. মাহমুদুর রহমান বলেন, 'অতীতে সোয়াইন ফ্লুসহ বিভিন্ন ভাইরাস মোকাবিলায় বাংলাদেশ সফল হয়েছে। সুতরাং করোনাভাইরাস মোকাবিলায়ও সফল হবে- এটি প্রত্যাশা করি। তবে এ জন্য কিছু নিয়মকানুন মেনে চলতে হবে। এই রোগ মূলত হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ছড়ায়। সুতরাং আক্রান্ত কাউকে পাওয়া গেলে প্রথমেই তাকে নূ্যনতম ১৪ দিন আলাদা করে রাখতে হবে, যাতে অন্যদের সংস্পর্শে আক্রান্ত ব্যক্তি না যেতে পারে। একই সঙ্গে যারা আক্রান্ত হয়নি, তাদের চলাফেরায় সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে বাইরে বের হলে মাস্ক ব্যবহার, বাইরে থেকে বাসায় এসে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলতে হবে। তাহলে হয়তো এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।'

এদিকে, গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সংক্রামক ব্যাধি করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে সাংবাদিকদের জানান। এ ভাইরাস নিয়ে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, 'করোনাভাইরাস নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই, সবাই সতর্ক থাকুন। সরকারের সব ধরনের প্রস্তুতি আছে, ভয়ের কোনো কারণ নেই। বাংলাদেশে এখনও কোনো রোগী পাওয়া যায়নি।'

এর আগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে সারাদেশের সরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে চিঠি পাঠিয়ে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়। জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদি সেব্রিনা ফ্লোরা স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে প্রতিটি হাসপাতালে পৃথক পাঁচটি করে শয্যা প্রস্তুত রাখতে বলা হয়। এ ছাড়া রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল ও সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে পৃথক ইউনিট চালু করা হয়। এসব হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সদের এই রোগ মোকাবিলায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন মেনে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

অধ্যাপক ডা. মীরজাদি সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, 'বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ হচ্ছে। তাদের নির্দেশনা মেনে কাজ করছি। এই ভাইরাস প্রতিরোধে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দুটি কৌশল হাতে নিয়েছে। প্রথমত, দ্রুত আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত করা; দ্বিতীয়ত, আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেলে তাকে সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখা। প্রয়োজনে ওই রোগীকে অন্যদের থেকে পৃথক করে ফেলা। কেউ আক্রান্ত হলে তাকে কুর্মিটোলা হাসপাতালে রাখার ব্যবস্থা আছে। এ পর্যন্ত চীন থেকে আসা তিন হাজার ৩৪৮ জনকে স্ট্ক্রিনিং করা হয়েছে। তাদের মধ্যে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত কাউকে পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে চীন থেকে আসার পর জ্বরে আক্রান্ত দু'জনের লালার নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে।' তারা সাধারণ ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত বলে তিনি জানান।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, 'করোনাভাইরাস পরিস্থিতির ওপর স্বাস্থ্য বিভাগ সার্বক্ষণিক নজর রাখছে। এখন পর্যন্ত দেশে এ রোগে কেউ আক্রান্ত না হলেও স্বাস্থ্য বিভাগ পূর্বপ্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। এরই অংশ হিসেবে প্রতিটি হাসপাতালে পৃথক শয্যা চালু করা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের সব জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও সিভিল সার্জনদের নিজ জেলায় গত ১৪ দিনে আসা সব চীনের নাগরিকের তালিকা প্রদান করতে বলা হয়েছে। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। সে কারণে কেউ সে দেশে ভ্রমণে গেলে এ-সংক্রান্ত করণীয় সম্পর্কে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ওই নির্দেশনা অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশ (্‌অ্যাটাব) এবং ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) বরাবর পাঠানো হয়েছে।' এতে করে সবাই সতর্ক হবে বলে মনে করেন তিনি।

যেভাবে নিরাপদ থাকবেন :করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে জনসাধারণকে সতর্ক থাকতে বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। এগুলো হলো- ঘরের বাইরে মাস্ক ব্যবহার, গণপরিবহন এড়িয়ে চলা, প্রচুর ফলের রস এবং পর্যাপ্ত পানি পান, ঘরে ফিরে সাবান বা হ্যান্ডওয়াশ দিয়ে ভালোভাবে হাত ধুয়ে নিতে হবে। কিছু খাওয়া কিংবা রান্নার আগে ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে, ডিম কিংবা মাংস রান্না করার আগে ভালোভাবে সেদ্ধ করতে হবে, ময়লা কাপড় দ্রুত ধুয়ে ফেলা, নিয়মিত ঘর ও কাজের জায়গা পরিস্কার রাখা এবং অপ্রয়োজনে ঘরের দরজা-জানালা খুলে না রাখতে বলা হয়েছে।

করোনাভাইরাসের লক্ষণ :বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ সমকালকে বলেন, 'করোনাভাইরাস সম্পর্কে এখন পর্যন্ত যতটুকু তথ্য পাওয়া গেছে তা হলো, জ্বর দিয়ে এ রোগের লক্ষণ শুরু হয়। জ্বরের সঙ্গে সর্দি, শুকনো কাশি, মাথাব্যথা, গলাব্যথা ও শরীর ব্যথা থাকতে পারে। এক সপ্তাহের মধ্যে শ্বাসকষ্ট দেখা দিতে পারে। সাধারণ ফ্লুর মতোই হাঁচি-কাশির মাধ্যমে এ ভাইরাস ছড়াতে পারে। করোনাভাইরাস মূলত শ্বাসতন্ত্রে সংক্রমণ ঘটায়। লক্ষণগুলো হয় অনেকটা নিউমোনিয়ার মতো। কারও ক্ষেত্রে ডায়রিয়াও দেখা দিতে পারে। তবে মানুষের দেহে ভাইরাসটি সংক্রমণের পর ১ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে লক্ষণ দেখা দিতে পারে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো হলে এ রোগ কিছুদিনের মধ্যে এমনিতেই সেরে যায়। কিন্তু কিডনি, ডায়াবেটিস, হৃদযন্ত্র কিংবা ফুসফুসের পুরোনো রোগীদের ক্ষেত্রে মারাত্মক জটিলতা দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে এটি নিউমোনিয়া, রেসপিরেটরি ফেইলিউর অথবা কিডনি অকার্যকারিতার দিকে মোড় নিতে পারে। এতে করে মৃত্যু ঘটতে পারে আক্রান্ত ব্যক্তির।'

আরও পড়ুন

×