মানব পাচারের জাল: ৫
সিলেটে দুষ্টচক্রে প্রবাসীরাও
সাহাদাত হোসেন পরশ
প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ২০:৫৫ | আপডেট: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ২১:০০
মানব পাচারকারীদের পৃষ্ঠপোষকদের তালিকায় রয়েছে হবিগঞ্জের দু'জনের নাম। তারা হলেন- আজমিরীগঞ্জের সৌদি প্রবাসী মো. আব্দুল্লাহ ও হবিগঞ্জ সদরের সীতেশ চন্দ্র দাস। শুধু সৌদি প্রবাসী আব্দুল্লাহ নন, সারাদেশে মানব পাচার নেটওয়ার্কের অধিকাংশ সদস্যই অবস্থান করেন বিদেশে। ভাড়াটে দালালের মাধ্যমে দিনের পর দিন মানব পাচার করে চলেছেন তারা প্রবাস থেকে। দালালরা মাঝেমধ্যে ধরা পড়লেও বিদেশে থাকা রাঘববোয়ালরা থাকছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
সম্প্রতি একটি সংস্থা দেশব্যাপী মানব পাচারকারীদের এক তালিকা তৈরি করে। যেটি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সেখানে একাধিক প্রবাসী ছাড়াও রয়েছেন বেশ কয়েকজন দম্পতি। অনেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে বিদেশে অবস্থান করে নির্বিঘ্নে এই অপরাধ করে আসছেন। বরিশাল ও সিলেট অঞ্চলে এই সিন্ডিকেটের মোট সদস্য ৭৭ জন।
প্রবাসী পাচারকারীদের জাল রোহিঙ্গা ক্যাম্পে: মালয়েশিয়ায় প্রবাসী রোহিঙ্গা পাচারকারীরা এখন সক্রিয় রয়েছেন কক্সবাজারের ক্যাম্পে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের নানা কৌশলে সেখানে নিয়ে যাওয়ার। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নারীর সংখ্যা বেশি এবং তাদের বয়সানুপাতে বৈবাহিক সম্পর্কে যুক্ত হওয়ার উপযুক্ত পাত্র সংখ্যাও বেশ কম। তাই অনেক তরুণীর পরিবারই চেষ্টা করছে, মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত তাদের আত্মীয়ের মধ্য থেকে পাত্র নির্বাচন করে মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার। এই প্রক্রিয়ায় বেশিরভাগ সময়েই হোয়াটসঅ্যাপ ও ইমোসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পাত্রপাত্রী দেখানো হয়। এভাবে প্রাথমিক কথাবার্তা চলার পরবর্তী ধাপে মালয়েশিয়ার পাচারকারী চক্রের রোহিঙ্গারা যোগাযোগ করে কক্সবাজারে অবস্থানরত বাংলাদেশি দালাল সাইফুলের সঙ্গে। জনপ্রতি ২০-৩০ হাজার টাকা দিয়ে অবৈধভাবে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয় তাদের। সাইফুল কৌশলে ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গা তরুণীদের কক্সবাজারের নোয়াখালী পাড়া ও ঝুমপাড়ায় জড়ো করান। এরপর সুযোগমতো তাদের ট্রলারে তুলে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ার দিকে পাড়ি জমান তারা।
সিআইডির ডিআইজি (অর্গানাইজড ক্রাইম) ইমতিয়াজ আহমেদ সমকালকে বলেন, মানব পাচারে জড়িত মূল হোতাদের কেউ কেউ পরিবারের সদস্যসহ বিদেশে অবস্থান করেন। অনেক সময় তাদের দেশে ফেরত আনাও কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে।
বরিশাল: মানব পাচারকারী চক্রে রয়েছে বরিশালের ৭ জন। তাদের মধ্যে ৪ জনই নারী। বরিশালের মানব পাচারকারী এ চক্রের সদস্যরা হলেন উজিরপুরের দাশেরহাটের সোহেল তালুকদার, একই এলাকার কোহিনুর বেগম, রূপাতলীর কবির ওরফে ঠাটা পড়া কবির, কাউনিয়ার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মুক্তা বেগম, রসুলপুর কলোনির মুক্তা আক্তার, কাউনিয়ার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের হারুন শিকদার ও তার স্ত্রী চামেলী বেগম।
পিরোজপুর: মানব পাচারকারী ও পাচারে সহায়তাকারী হিসেবে পিরোজপুরে রয়েছে ৯ জন। তারা হলেন নাজিরপুরের পূর্ব বাসিয়ারীর মহিদুল ইসলাম, বড় আমতলার আব্দুল আজিজ, আলম, দক্ষিণ বানিয়ারীর সেলিম, আলমগীর হোসেন সুরাত, নিভাষ, কামাল, বড় আমতলার মো. জাহাঙ্গীর ও মো. ফয়সাল।
পটুয়াখালী: পটুয়াখালীতে মানব পাচারকারী হিসেবে আছেন ৭ জন। তারা হলেন দুমকীর চরবয়রার রফিকুল ইসলাম শাকিল ও তার স্ত্রী চম্পা বেগম, বদরপুরের বাদল বাবু, বিরাজলের আলমাস হাওলাদার, মহিপুর পৌরসভার নয়াপাড়া তুলাতলীর নজরুল ইসলাম, বাউফলের পাকঢালের রুবেল মিয়া ও সোহাগ মৃধা।
সিলেট: মানব পাচারকারীদের তালিকায় রয়েছেন সিলেটের ৯ জন। তারা হলেন গোলাপগঞ্জের এনাম আহমেদ। তিনি নিউ ইয়াহিয়া ওভারসিজের কর্ণধার। এ তালিকায় আরও আছেন শরীফগঞ্জ ইউনিয়নের জায়েদ আহমেদ, বিশ্বনাথের কাকলীপাড়ার রফিকুল ইসলাম। আম্বরখানার নজির আহমেদ। তিনি মেটরি এয়ার ইন্টারন্যাশনালের কর্ণধার। মাহমুদুর রহমান চৌধুরী শিপু তিনি আল রাফা ইন্টারন্যাশনালের কর্ণধার। জিন্দাবাজারের তাজ ট্র্যাভেল অ্যান্ড ট্যুরের কর্ণধার হাসান আহমদ, দেলোয়ার হোসেন খান ও হাসান আব্দুল গণি।
হবিগঞ্জ: হবিগঞ্জ জেলায় মানব পাচার নেটওয়ার্কে নাম উঠে এসেছে ১৮ জনের। তারা হলেন- হবিগঞ্জ সদরের পাইকপাড়ার ফজলু মিয়া, মাহমুদাবাদের হাসান মিয়া, পাইকপাড়ার শাহবাজ, নিতাই চরের জহুর আলী, হবিগঞ্জ সদরের বানিয়াচংয়ের মিয়া, আজমিরীগঞ্জের জাহের আনসারী, পাথারিয়ার কোহিনুর আলম, নোয়াগাঁওয়ের মোতাহের মিয়া, নবীগঞ্জের লুৎফুর রহমান মাখন, দিলবাহার আহমেদ, কাস্তগ্রামের মুহিদ মিয়া, মাহমুদপুরের তনু মিয়া, কালাম মিয়া, বৈঠাখালের ফুল মিয়া, নবীগঞ্জের আব্দুল কাউয়ুম, দুর্গাপুরের আঙ্গুর মিয়া, অলিউর রহমান ও ভানুদেবের জাবেদ আলী।
সুনামগঞ্জ: সুনামগঞ্জের মানব পাচারে জড়িত ৯ জনের নাম মিলেছে। তারা হলেন ছাতকের কালারুকা এলাকার শামীম মিয়া, রামপাশার পারভেজ মিয়া, বাউশার রোকন মিয়া, শমছু মিয়া, জানিগাঁওয়ের শহিদুল হক, করিমপুরের এনামুল হক ও কান্দিগাঁওয়ের ফয়জুল ইসলাম। তার বিরুদ্ধে মানব পাচার প্রতিরোধ আইনে সুনামগঞ্জ সদর থানায় দুটি মামলা রয়েছে। এই তালিকায় আছেন সুনামগঞ্জ সদরের আহমদ রওশনের ছেলে কোরবান আলী ও মোহনপুরের আবদুল মন্নাফের ছেলে আফাজ উদ্দিন।
