ঢাকা রোববার, ২৮ জুন ২০২৬

এক নারীর উদ্যোগ পেল সরকারি স্বীকৃতি

এক নারীর উদ্যোগ পেল সরকারি স্বীকৃতি
×

সাজিদা ইসলাম পারুল

প্রকাশ: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১৩:৫৭

সেবার মহান ব্রত নিয়ে ২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠা করেন 'হেল্প ফর ইউ'। বিনামূল্যে অসহায় ও দুস্থ মানুষকে চিকিৎসাসেবা দেওয়াই ছিল তার মূল লক্ষ্য। কিন্তু তিনি জানেন, সুস্থ থাকতে হলে মানুষকে হাঁটতে হবে। তাই সর্বত্র হাঁটাকে গুরুত্ব দিয়ে দীর্ঘ ১৩ বছর সচেতনতামূলক কাজ করেছেন চাঁদপুরের হাজীগঞ্জের সোনাইমুড়ী গ্রামের জান্নাতুল মাওয়া রুমা। প্রচারের অংশ হিসেবে ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারির ১১ থেকে ১৯ তারিখ- মাত্র ৯ দিনে কলকাতা থেকে ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাব পর্যন্ত ৪৫০ কিলোমিটার পথ হেঁটে রেকর্ড গড়েছেন। স্বীকৃতি পেয়েছেন হেঁটে আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রমকারী প্রথম এশিয়ান নারী হিসেবে। শুধু তাই নয়, তার দীর্ঘ আন্দোলনের ফলে আজ বুধবার দেশে সরকারিভাবে প্রথমবারের মতো পালিত হতে যাচ্ছে 'হাঁটা দিবস'।
রাজধানীর তেজগাঁওয়ের পূর্ব রাজাবাজারের বাসিন্দা ৪৩ বছর বয়সী রুমা। তিনি আবু তাহের তপাদার ও রেহানা তপাদার দম্পতির তিন সন্তানের মধ্যে ছোট। মানুষের সুস্থ জীবনের আশায় প্রতিবছরই ভিন্ন ভিন্ন স্লোগানে হাঁটা দিবস বেসরকারিভাবে পালন করেছেন তিনি।
রুমা সমকালকে জানান, মানুষের সুস্থতার জন্য হাঁটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই তাগিদ থেকে জনগণকে হাঁটার পরামর্শ দিতে গেলে অনেক সময় হেনস্তার শিকার হতে হয় তাকে। এমনকি অনেকেই ধমকের সুরে বলে উঠতেন, 'নিজে হাঁটেন, অন্যকে কেন বলেন।' সেই বাধাই তার শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আরও দুই বন্ধুর সঙ্গে পরামর্শ করে হেঁটে রেকর্ড করার মধ্য দিয়ে এর গুরুত্ব ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন তিনি। এ জন্যই তিনি হেঁটে কলকাতা প্রেসক্লাব থেকে ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবে পৌঁছেছেন। চলার পথে বিভিন্ন থানা থেকে সংগ্রহ করেছেন অনুমতিপত্র। এ রকম ১২ থেকে ১৩টি অনুমতিপত্র তার সংগ্রহে রয়েছে বলে রুমা জানান।
কলকাতা থেকে ঢাকা :কাজের কারণেই বাসা থেকে প্রতিদিন কয়েক কিলোমিটার পথ যাতায়াত করতে হতো রুমাকে। কিন্তু গাড়িতে নয়, এর সবটাই যেতে হতো হেঁটে। ২০১৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি দুপুর আড়াইটায় কলকাতা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন শেষে হাঁটা শুরু করেছিলেন তিনি। প্রথম দিন প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পথ হেঁটে রাতে বিশ্রাম নেন লেকটাউনের একটি গেস্টহাউসে। পরদিন সকাল হতেই আবার শুরু তার পথচলা। হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে পড়লে পথের মধ্যেই একটু বিশ্রাম নেওয়া, তারপর আবার যাত্রা শুরু। কলকাতার ধর্মতলা-লেনিন সরণি-মৌলালী-দমদম-যশোর রোড হয়ে ঢাকায় পৌঁছাতে সময় লাগে ৯ দিন। রুমার এই অভিনব উদ্যোগকে সে সময় স্বাগত জানিয়েছিল বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়। তবে তার লক্ষ্য বিশ্বরেকর্ড গড়া হলেও এই দীর্ঘ পথ হাঁটার পেছনে সমাজের প্রতি নতুন বার্তাও আছে।
স্লোগানে মুখর সচেতনতামূলক কার্যক্রম :২০১৫ সালের স্লোগান ছিল 'হাঁটি, সুস্থ থাকি, সক্ষম হই', ২০১৬-তে ছিল 'হাঁটি, দেশ দেখি, কার্বনমুক্ত বিশ্ব গড়ি', ২০১৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের নদীয়ায় নদীয়া জেলা পরিষদ ও নদীয়া জেলা প্রশাসন যৌথভাবে হাঁটা দিবস পালন করে। সেই আয়োজনে সম্পৃক্ত ছিলেন রুমা। সে বছরের স্লোগান ছিল 'হাঁটি, সুস্থ থাকি', ২০১৮ সালের স্লোগান 'আসুন আমরা সবাই পায়ে হাঁটার অভ্যাস করি'। ২০১৯ সালে সিলেটে উদযাপিত হয় 'ইন্টারন্যাশনাল ওয়াকিং ডে প্রমোশনাল ইভেন্ট ইন সিলেট'। সে আয়োজনেও রুমা উপস্থিত ছিলেন।
আজ বুধবার সকাল ১০টায় রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে থেকে টিএসসি পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে আন্তর্জাতিক হাঁটা দিবসের র‌্যালি। 'হেল্প ফর ইউ' সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি জান্নাতুল মাওয়া রুমার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব আক্তার হোসেন। উপস্থিত থাকবেন ফুটবলার আবদুল গাফফার, কায়সার হামিদ, শেখ মো. আসলাম, সাংবাদিক নেতা মোল্লা জালাল।
এ আয়োজন প্রসঙ্গে রুমা সমকালকে বলেন, এটা একটা আবেগের জায়গা। দীর্ঘ আন্দোলনের ফসল এটি। এবারই প্রথম বাংলাদেশে পালিত হতে যাচ্ছে এ দিবস। আমি তো হেঁটে হাজারও মানুষের মন জয় করেছি। সকলের সহযোগিতা পেলে এ আন্দোলন সফল হবে। মানুষ হাঁটতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে। সুস্থ থাকবে। তবেই আমার জয় হবে।
এদিকে, ২০১৪ সালে নারী হিসেবে হেঁটে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে রুমার নাম নথিভুক্ত হলে বিভিন্ন ব্যাংক তাকে অনুদান হিসেবে অর্থ প্রদান করে। সেই অর্থ দিয়ে তিনি নড়াইলের ৯ জন, ঢাকার ৯, চাঁদপুরের ৯ ও খুলনার ৯ জন অসহায় শিশুকে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা করে অনুদান দিয়েছেন তাদের স্কুলের পোশাক, বই-খাতাসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার জন্য।
হাঁটা দিবসের নেপথ্যে :হাঁটার অভ্যাস নিয়মিত করার জন্য দরকার একটি সম্মিলিত উদ্যোগ। ২০১৫ সালে রুমার হাঁটার আন্দোলনে সম্মতি জানিয়েছিলেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি এবং বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। ওই বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারির দিনটিকে হাঁটা দিবস হিসেবে পালনের দাবি জানিয়েছিলেন তারা। এরই ধারাবাহিকতায় প্রতিবছর ১৯ ফেব্রুয়ারি হাঁটা দিবস হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য দিবসটি পালন ও প্রচলনের জন্য গণস্বাক্ষর সংগ্রহসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় দিবসটি উপলক্ষে কর্মসূচি পালন করে আসছিল রুমার সংগঠন 'হেল্প ফর ইউ'। ২০১৮ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলা প্রশাসন ও পরিষদের উদ্যোগে হাঁটা দিবসটি পালিত হয়। ১৯ ফেব্রুয়ারি হাঁটা দিবস পালনে ২০১৮ সালের ১ জুলাই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছিল। ওই চিঠির আলোকে ২০১৯ সালের ২৫ জুলাই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটিকে একটি চিঠি দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। চিঠিতে জানানো হয়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, শতকরা ৬৭ ভাগ মানুষ মারা যায় অসংক্রামক রোগের কারণে। এই রোগের প্রধান ঝুঁকির অন্যতম কারণগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে অপর্যাপ্ত কায়িক পরিশ্রম। সুতরাং অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত হাঁটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দৈনিক ৩০ মিনিট হাঁটা স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এই মর্মে ১৯ ফেব্রুয়ারি হাঁটা দিবস পালন করা যেতে পারে।

আরও পড়ুন

×