আন্তর্জাতিক নারী দিবস
পারিবারিক বাধা থেকে ক্যান্সার কিছুই দমাতে পারেনি তাকে
সাইফুল হক মোল্লা দুলু, কিশোরগঞ্জ
প্রকাশ: ০৮ মার্চ ২০২০ | ০০:০৫ | আপডেট: ০৮ মার্চ ২০২০ | ০০:০৯
শাহনাজ কবীরের শুরুটা সহজ ছিল না। রক্ষণশীল পরিবারে বড় হওয়া শাহনাজ কবীরের বাবা ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা। বাবার ইচ্ছা, মেয়ে অবশ্যই পড়াশোনা করবে, কিন্তু চাকরি করতে পারবে না। পরিবারের ইচ্ছা, স্নাতক শেষ করে মেয়েকে উপযুক্ত পাত্রের হাতে সমর্পণ করবে। কিন্তু অদম্য শাহনাজ রক্ষণশীলতার প্রথা ভেঙে নিজকে যথাযথ স্থানে উন্নীত করেছেন। নিজের কাজের স্বীকৃতিও পেয়েছেন ক্যান্সারজয়ী শাহনাজ কবীর। গত বছর নির্বাচিত হয়েছেন দেশসেরা প্রধান শিক্ষক।
১৯৭০ সালের ২৫ মার্চ হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার কুমড়ি-দুর্গাপুর গ্রামে জন্ম শাহনাজের। বাবার পুলিশের চাকরির সুবাদে নানা জায়গায় নানা স্কুলে নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তিনি বেড়ে উঠেছেন। প্রাথমিক ও মাধ্যমকি পর্যায়ের ১০টি ক্লাসের পাঠ তাকে ১০টি বিদ্যালয় থেকে নিতে হয়েছে। মুন্সীগঞ্জের এভিজেএম সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৮৬ সালে প্রথম বিভাগে এসএসসি পাস করেন। ১৯৮৮ সালে কিশোরগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে এইচএসসি এবং ঢাকার লালমাটিয়া মহিলা কলেজ থেকে ১৯৯০ সালে স্নাতক পাস করেন। এবার পরিবার থেকে মেয়েকে বিয়ের জন্য চাপ দেওয়া হলো। কিন্তু মেয়ের ইচ্ছা, স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করবেন। বাবা রাজি হলেন। ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজ থেকে সেটাও হলো। বাবা বললেন, এবার ক্ষান্ত দাও। কিন্তু আত্মপ্রত্যয়ী শাহনাজ সাফ জানিয়ে দিলেন- সমাজের যদি কোনো কাজেই লাগতে না পারি, সেই পড়াশোনা দিয়ে লাভ কী! ভর্তি হয়ে গেলেন ময়মনসিংহের টিচার্স ট্রেনিং কলেজে (মহিলা)। এখান থেকে বিএড ও এমএড দুটোতেই প্রথম শ্রেণি লাভ করেন। এর পর ১৯৯৭ সালে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন নোয়াখালী জিলা স্কুুলে। সেই যে শুরু, আর পেছনে তাকাতে হয়নি শাহনাজ কবীরকে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় নানা স্কুলে শিক্ষকতা করে ২০০৬ সালে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন কিশোরগঞ্জ এসভি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। এখানে তার যোগদানের পর থেকেই আমূল বদলে যায় এই স্কুলের শিক্ষার পরিবেশ। ২০১০ সাল থেকে এই স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন।
শাহনাজ কবীর এসভিতে যোগদানের বছর ২০০৬ সালে ওই স্কুুলের ৩৫২ শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ২৬৯ জন পাস করে। জিপিএ ৫ পায় মাত্র ২৭ জন। এ অবস্থার উন্নতির জন্য কঠোর হতে থাকেন শাহনাজ। পরের বছর তিনি বিদ্যালয়ে ভর্তিতে তদবির পুরোপুরি বন্ধ করে দেন। বাড়তি নজর দেন পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের দিকে। অভিভাবকদের বিভিন্ন সময় ও পর্যায়ে স্কুলে ডেকে এনে কথা বলেন সন্তানদের নানা বিষয়ে। এর পর থেকেই বিস্ময়কর সফলতা আসতে শুরু করে। ২০১১ থেকে ১৯ সাল পর্যন্ত সারা জেলায় শতভাগ পাস ও জিপিএ ৫ প্রাপ্তিতে শীর্ষস্থান দখল করে এসভি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। সর্বশেষ গত বছর ২৪৩ জন এসএসসিতে অংশ নিয়ে শতভাগ পাস করার পাশাপাশি ১৩৬ জন জিপিএ ৫ পায়, যা জেলার সর্বোচ্চ।
লেখাপড়ার পাশাপাশি সাংস্কৃৃতিক কর্মকাণ্ড, বিতর্কসহ যে কোনো সৃজনশীল কাজে অনন্য এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বিতর্কে বৃহত্তর ময়মনসিংহের সেরা স্কুুল এসভি। বিএফএফ-সমকাল জাতীয় বিজ্ঞান বিতর্ক প্রতিযোগিতায় পরপর দুইবার জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হয়েছে এ স্কুল। ছাত্রীদের শৃঙ্খলা, নিয়মানুবর্তিতা, অধ্যবসায়সহ সার্বিক কর্মকাণ্ডকে সমৃদ্ধ করার মাধ্যমে প্রগতিশীল ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিকশিত করার নানা উদ্যোগ নিয়েছেন শাহনাজ কবীর। চারবার এ বিদ্যালয়টি শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মর্যাদা অর্জন করেছে।
এসবের স্বীকৃতিও পেয়েছেন শাহনাজ কবীর। গত বছর দেশের সেরা প্রধান শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছেন। এর আগেই ২০১৭ সালে জীবনে ঘটে যায় ওলটপালট করা মতো ঘটনা। সে বছর মার্চে জাপান সফরে গিয়ে জানতে পারেন, তার শরীরে বাসা বেঁধেছে ঘাতক ব্যাধি ক্যান্সার। কিন্তু তিনি ভড়কে যাননি। ক্যান্সারকে জয় করতে তিনি ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। পরে তাকে ভারতে চিকিৎসা নিতে হয়। জটিল চিকিৎসা শেষে দেশে আসার পর টানা ছয় মাস কেমোথেরাপি নেন। তবুও তিনি নিয়মিত স্কুলের খোঁজখবর রাখতেন।
গত সোমবার দুপুরে এসভি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে গিয়ে কথা হয় তার সঙ্গে। শাহনাজ কবীর বলেন, বিদ্যালয়ে না থাকলে নিজেকে অসহায় মনে হয়। তাই সব সময় বিদ্যালয়েই উপস্থিত থাকি। তিনি বলেন, মূলত শিক্ষার প্রতি অনুরাগ থেকেই কাজ করা; কিছু পাওয়ার জন্য নয়। চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই দুটি স্বপ্ন ছিল- প্রধান শিক্ষক এবং দেশের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হওয়া। দুটি আশাই পূরণ হয়েছে। এ জন্য সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ। তিনি মনে করেন, এ অর্জন তার একার নয়। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, সহকর্মী, অভিভাবকরা সব সময় তাকে নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন। তাই তাদের কাছেও তিন ঋণী। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে তার স্বামী ড. রফিকুল ইসলাম সব সময় উৎসাহ ও সহযোগিতা দেওয়ায় শাহনাজ তার কাছেও কৃতজ্ঞ বলে জানান।
কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক সারওয়ার মুর্শেদ চৌধুরী বলেন, চাকরি জীবনে নানা জেলায় কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছে। এ জেলায় যোগদানের পর এসভি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে প্রথমে দেখেই মনে হয়েছে, তিনি একজন সৎ, দক্ষ ও নীতিবান নারী। তিনি অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে আপস করেন না। তাই তাকে সব সময় সমর্থন দিয়েছি। আগামী বাংলাদেশ গঠনে নারীকে কীভাবে গড়ে তোলা যায়, তা নিয়েও রাত-দিন কাজ করেন শাহনাজ। তিনি দেশসেরা প্রধান শিক্ষক হয়েছেন। এ খবরে আমরা সবাই গর্বিত ও আনন্দিত।
- বিষয় :
- নারী দিবস
- দেশ সেরা প্রধান শিক্ষক
