ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অরক্ষিত গ্যাসের উৎস নিয়ে সচেতন না হলে সামনে বিপদ

অরক্ষিত গ্যাসের উৎস নিয়ে সচেতন না হলে সামনে বিপদ
×

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৯ মার্চ ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ১০ মার্চ ২০২৩ | ০৪:৩৩

‘দেশের বিভিন্ন এলাকায় কয়েকটি বিস্ফোরণের ঘটনার পর এর পেছনে কেউ কেউ নাশকতার আশঙ্কা করছেন। তবে আমাদের বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞদের তদন্তে এ ধরনের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। সায়েন্স ল্যাবরেটরি ও সিদ্দিকবাজারের বিস্ফোরণস্থলে মিথেন গ্যাসের উপস্থিতি পেয়েছি। প্রাথমিক তদন্তের পর এটা বলতে পারি, বদ্ধ ঘরে জমে থাকা গ্যাস থেকেই বিস্ফোরণের সূত্রপাত। সিদ্দিকবাজারে যে ভবন থেকে বিস্ফোরণ, এর বেজমেন্টে বাণিজ্যিক গ্যাসের লাইন ছিল। অরক্ষিত গ্যাসলাইনের উৎস নিয়ে সচেতন না হলে সামনে আরও বড় বিপদের মুখোমুখি হতে হবে।’

গতকাল বৃহস্পতিবার সমকালকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এমন মন্তব্য করেন ঢাকা মহানগর পুলিশের সিবিআরএন ও বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দলের প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রহমত উল্লাহ চৌধুরী। বোমা বিশেষজ্ঞদের আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব বম্ব টেকনিশিয়ান অ্যান্ড ইনভেস্টিগেটসের (আইএবিটিআই) সদস্যও তিনি।

রহমত উল্লাহ বলেন, যে কোনো বিস্ফোরণের পর প্রথম এর যথাযথ তদন্ত শুরু করা জরুরি। কারণ চিহ্নিত করা না গেলে পরবর্তী দুর্ঘটনার ক্ষেত্র প্রস্তুত থাকে। অবহেলা ও গাফিলতির দায়িত্ব কারও এড়ানো উচিত হবে না। অনেকের প্রশ্ন, হঠাৎ কেন এমন ধারাবাহিক বিস্ফোরণ? এর উত্তরে তিনি বলেন, শুষ্ক মৌসুমে সাধারণত অগ্নিসংযোগ ও বিস্ফোরণ বেশি ঘটে। এটা তো অস্বীকার করা যাবে না, ঢাকায় আমরা এক ধরনের বোমার ওপর বসবাস করছি। শীতকালে সাধারণত বাসাবাড়ি ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে এসি-ফ্যান দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে। ঢাকায় অসংখ্য ভবন রয়েছে, যেখানে সারাবছর বাতাস প্রবাহের কোনো ব্যবস্থা থাকে না। হঠাৎ গরম শুরু হলে অনেকেই এসি বা অন্য যে কোনো বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম সংস্কার না করে চালু করেন। তখন যে কোনো উৎস থেকে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ হয়ে দুর্ঘটনা ঘটে। এটা অবশ্যই মানতে হবে, ভবনের আন্ডারগ্রাউন্ডে গ্যাস সংযোগ রাখা যাবে না। এমনকি ভবনের গ্যাস, স্যুয়ারেজ লাইন ও পানির লাইন পাশাপাশি রাখা বিপজ্জনক।

রহমত উল্লাহ চৌধুরী বলেন, সিদ্দিকবাজারের ঘটনাস্থলে কয়েক ফুট উচ্চতার গ্যাসের স্তর ছিল। সাধারণত কোনো বদ্ধ ঘরে ৫ থেকে ১১ শতাংশ মাত্রার মিথেন গ্যাস থাকলে সেখানে যে কোনো সময় বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। এ ধরনের বিস্ফোরণ যে কোনো মানুষ ইচ্ছা করলেই ঘটাতে পারে না। বিস্ফোরণের জন্য তিনটি বিষয় একযোগে কাজ করে। তা হলো বদ্ধ ঘরে গ্যাসের ক্লাউড জমা হতে হবে; থাকবে অক্সিজেনের উপস্থিতি; পাশাপাশি স্ফুলিঙ্গের কোনো উৎস থাকবে। কোনো নাশকতাকারীর পক্ষে এই বিষয়গুলো এক করা প্রায় অসম্ভব। শুধু বাংলাদেশ কেন, বিশ্বে এ ধরনের বিস্ফোরণ মনুষ্য সৃষ্টিজনিত হয়েছিল– এমন নজির খুঁজে পাওয়া যায় না। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অনেক দেশ থেকে বিস্ফোরণের ওপর আমরা প্রশিক্ষণ নিয়েছি। বিদেশি বোমা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে প্রায়ই অভিজ্ঞতা বিনিময় হয়। বাংলাদেশে বিস্ফোরণের ঘটনাগুলোর অধিকাংশ গ্যাসের সোর্স থেকে হয়ে থাকে– এ ব্যাপারে তাঁরাও একমত পোষণ করেছেন। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কোনো দুর্ঘটনাস্থলে বিস্ফোরকের আলামত পাওয়া যায়নি। ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) ব্যবহার করেও কেউ নাশকতা করলে সেখানে অবশ্যই বিস্ফোরকের মেটাল জাতীয় আলামত থাকবে।

আন্তর্জাতিক এই বোমা বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, সিদ্দিকবাজারের ঘটনার সঙ্গে আগের বেশ কয়েকটি বিস্ফোরণের ধরনের মিল রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো মগবাজারের বিস্ফোরণ। নারায়ণগঞ্জের একটি মসজিদেও ভয়াবহ বিস্ফোরণে অনেকে হতাহত হয়েছিলেন। দুর্ঘটনা এড়াতে নাগরিকদের সচেতন হওয়া জরুরি। বাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রে বিল্ডিং কোড অবশ্যই মানতে হবে; কেউ না মানলে কর্তৃপক্ষকে মানানোর ব্যবস্থা করতে হবে। যে কোনো ভবনে মানসম্পন্ন ইলেকট্রনিকস সামগ্রী ব্যবহার নিশ্চিত করা। ভবনের সেপটিক, পানির ট্যাঙ্ক নিয়মিত পরিষ্কার করা দরকার। যেসব জায়গায় গ্যাস জমে থাকতে পারে, সেখানে ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা করা। রান্নাঘরের জানালা অবশ্যই খোলা রাখা। প্রয়োজনে ‘ফোর্স ভেন্টিলেশনের’ ব্যবস্থা করা।

রহমত উল্লাহ চৌধুরী আরও বলেন, সিদ্দিকবাজারের বিস্ফোরণের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো বেজমেন্ট থেকে সূত্রপাত। নিচে ভেন্টিলেশন না থাকায় বিস্ফোরণে বেজমেন্টসহ দুটি তলা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। বেজমেন্ট থেকে চাপটা মূলত ওপরের দিকে প্রবাহিত হয়। করোনার পর অনেক মানুষ নিজ বাসাবাড়িতে পালস অক্সিমিটার ও প্রেশার মাপার মেশিন রাখছেন। নাগরিকদের কাছে এই অনুরোধ– গ্যাস পরিমাপের জন্য অল্প টাকায় যন্ত্র কিনতে পাওয়া যায়। নিজেরাও অনেক সময় সেটার মাধ্যমে ঘরে কোনো অরক্ষিত সূত্র থেকে গ্যাস জমা হচ্ছে কিনা, সেটা মেপে দেখতে পারেন।

তিনি আরও বলেন, প্রতিটি বিস্ফোরণের পেছনে পরিবেশগত দায় অবশ্যই রয়েছে। গ্যাস সংযোগ আছে– এমন কক্ষে বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা আমরা রাখি না। দুর্ঘটনা এড়াতে জরুরি হলো প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা রাখা। এ ছাড়া ক্ষয়প্রাপ্ত, বিনষ্ট ও পরিত্যক্ত গ্যাসের পাইপলাইন পরিবর্তন, মেরামত ও প্রয়োজনে অপসারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান অনুসরণ করতে হবে।

আরও পড়ুন

×