দৃষ্টি নেই, সামর্থ্যও নেই তবু অসহায় মানুষের পাশে সেই সিদ্দিকুর
সহায়তা নিয়ে মানুষের পাশে সিদ্দিকুর- সমকাল
ইন্দ্রজিৎ সরকার
প্রকাশ: ২১ এপ্রিল ২০২০ | ১১:২৩ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০
বিসিএস পাস করে বড় সরকারি কর্মকর্তা হওয়ার স্বপ্ন ছিল তার। ইচ্ছে ছিল, নিজের দুর্দশাগ্রস্ত পরিবারের হাল ধরবেন। হাসি ফোটাবেন সবার মুখে। পরিবারের হাল তিনি ঠিকই ধরেছেন, তবে বড় কর্মকর্তা হওয়ার স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি।
বলছি টিয়ারসেলের আঘাতে দৃষ্টি হারানো সেই সিদ্দিকুর রহমানের কথা। এখন তিনি এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডের টেলিফোন অপারেটর হিসেবে কাজ করেন। স্বল্প আয় আর সীমিত সামর্থ্যের এই মানুষটি অন্তরের দৃষ্টি দিয়ে দেখেছেন, অনুভব করেছেন করোনায় অসহায় হয়ে পড়া মানুষের কষ্ট। তাই যৎসামান্য খাদ্যসামগ্রী নিয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন নিজের গ্রামের মানুষের পাশে। তবু তার আক্ষেপ, সামর্থ্য আরেকটু বেশি হলে আরও কিছু মানুষকে সহায়তা দিতে পারতেন!
২০১৭ সালের ২০ জুলাই পরীক্ষার রুটিন ও তারিখ ঘোষণাসহ কয়েকটি দাবিতে শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নেন সরকারি তিতুমীর কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সিদ্দিকুর। সেদিন পুলিশের ছোড়া টিয়ারসেলে চোখে মারাত্মক আঘাত পান তিনি। পরে সরকারি উদ্যোগে দেশে ও ভারতের চেন্নাইয়ে তার চিকিৎসা করানো হয়। তবে চিকিৎসকরা জানিয়ে দেন, তার দুই চোখে আলো ফেরার সম্ভাবনা নেই।
সিদ্দিকুর রহমান সমকালকে বলেন, 'আমি নিজে সাধারণ পরিবারের সন্তান। সাধারণ মানুষের কষ্ট আমি হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করি। মার্চে ছুটি ঘোষণার পর আমি গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার বানিয়াপাড়া ইউনিয়নের ঢাকিরকান্দায় এসেছি। এখানে এসে শুনি, প্রতিবেশীদের অনেকের অবস্থা খুব খারাপ। তাদের কেউ হয়তো রিকশা-ভ্যান চালান, কেউ গৃহকর্মী বা কৃষিশ্রমিক। এই পরিস্থিতিতে তারা বেকার হয়ে পড়েছেন। আমার আয় খুব বেশি নয় ঠিকই। কিন্তু এই মুহূর্তে, মানুষগুলোর অবস্থা আরও বেশি খারাপ। এক বেলা খাবার পেলে দুই বেলা না খেয়ে থাকতে হচ্ছে। আর প্রতিবেশীকে অভুক্ত রেখে নিজে পেটপুরে খাওয়াটা অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।'
সিদ্দিকুর জানান, বেশি মানুষকে সহায়তার সক্ষমতা নেই বলে তিনি এলাকার অতি দরিদ্র, বয়স্ক ও বিধবাদের বেছে নিয়েছেন। খুব বেশি কিছু দিতে পারেননি, ৪৭ জনকে তিন কেজি করে আটা ও হাত ধোয়ার জন্য একটি করে সাবান দিয়েছেন। প্রথমে আটার সঙ্গে অন্য কিছু দিতে চেয়েছিলেন, যা রুটি খাওয়ার জন্য দরকার। তবে পরে চিন্তা করেছেন, এই পরিস্থিতিতে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে বাঁচতে বারবার হাত ধোয়ার কথা বলা হচ্ছে। তাই সাবান দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহে তিনি প্রথম দফায় এসব সহায়তা দেন। তবে সব কিছু বন্ধ রাখার সময় বেড়েছে, আর সেইসঙ্গে আরও বেশি দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে মানুষ। তাই আবারও সহায়তা দেওয়ার ব্যাপারে ভাবছেন তিনি।
সিদ্দিকের বন্ধু শেখ ফরিদ জানান, সিদ্দিকের মতো সবাই যদি তার চারপাশের অসহায় মানুষগুলোর পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেন, তাহলে আর কাউকে না খেয়ে থাকতে হতো না। সিদ্দিক তার সামান্য সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি বাইরের কাউকে জানাতে চাননি। তবে তার উদ্যোগটি অনুকরণীয় মনে করে বন্ধুরা তা ফেসবুকে শেয়ার করেছেন।
দৃষ্টি হারানোর পর শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে সিদ্দিকুরকে এসেনশিয়াল ড্রাগসে চাকরি দেন তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। দৃষ্টি হারালেও পড়ালেখা চালিয়ে গেছেন সিদ্দিকুর। গত বছর তিনি প্রথম বিভাগ (সিজিপিএ-৩.০৭) পেয়ে অনার্স পাস করেন। এরমধ্যে বিয়েও করেছেন। তার মেয়ে রোকাইয়া তাসনিমের বয়স এখন ছয় মাস।
