ঢাকা সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬

বরিশালের বাকেরগঞ্জ

প্রতিষ্ঠান আছে কাগজে, বাস্তবে মিলছে না

প্রতিষ্ঠান আছে কাগজে, বাস্তবে মিলছে না
×

বাকেরগঞ্জ (বরিশাল) সংবাদদাতা

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬ | ০৮:২৯

বরিশালের বাকেরগঞ্জে মাদ্রাসা ও এতিমখানার নামে চাল বরাদ্দ দিয়ে আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উপজেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের মাধ্যমে ১৫টি প্রতিষ্ঠানের নামে ১৫ টন চাল বরাদ্দ হয়। এসবের বাজারমূল্য প্রায় ৯ লাখ টাকা। কিন্তু নানা জায়গায় খোঁজ নিয়েও তালিকায় থাকা কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। 

তালিকা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এলাকার পরিচিত কিছু প্রতিষ্ঠানের নামের অংশ বদল করে নতুন নাম তালিকায় দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন মাদ্রাসা ও এতিমখানার সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, এমন অনিয়মের কারণে প্রকৃত এতিম শিক্ষার্থীরা সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২০২৫ সালের শেষের দিকে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুমানা আফরোজের সুপারিশে ১৫টি এতিমখানার নামে ১৫ টন চাল বরাদ্দ দেন বরিশাল জেলা প্রশাসক। এগুলো হলো– বামনিকাঠী আল আকসা জামে মসজিদ ও এতিমখানা, উত্তমপুর জামে মসজিদ, আল কোরআন নুরানী মডেল মাদ্রাসা ও এতিমখানা, রঘুনাথপুর জান্নাতুল মাদ্রাসা ও এতিমখানা, মমতাজন্নেছা মহিলা মাদ্রাসা ও এতিমখানা, ইসলামিয়া হাফেজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা, চৌধুরী বাড়ীর জামে মসজিদ ও এতিমখানা, হাফিজিয়া মাদ্রাসা এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিং, দক্ষিণ দাড়িয়াল দারুসুন্নাত হাফেজি মাদ্রাসা ও এতিমখানা লিল্লাহ বোর্ডিং, ছালেহিয়া দিনিয়া মাদ্রাসা চরামদ্দি, পাঠকাঠী জামে মসজিদ ও এতিমখানা, বায়তুল আকসা জামে মসজিদ ও মাদ্রাসা, খয়রাবাদ হাফেজি মাদ্রাসা ও এতিমখানা, শিয়ালঘুনি স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা ও দাড়িয়াল দারুন্নাজাত হাফেজি মাদ্রাসা ও এতিমখানা।

তালিকায় এসব প্রতিষ্ঠানের কোনোটির পূর্ণ ঠিকানা দেওয়া হয়নি। সরেজমিন খোঁজ নিয়েও এসব প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে তথ্য মেলেনি। তালিকার ৬ নম্বরে থাকা ইসলামিয়া হাফেজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাকেরগঞ্জ পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সাহেদগঞ্জ এলাকায় এই নামে একটি প্রতিষ্ঠান ছিল। কিন্তু কয়েক বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটির কোনো কার্যক্রম নেই। পাশেই বাকেরগঞ্জ হাফেজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা নামে একটি প্রতিষ্ঠান চালু আছে। এই প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বরাদ্দ পাওয়া প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নেই।

বাকেরগঞ্জ হাফেজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার প্রধান শিক্ষক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমার প্রতিষ্ঠানের নামে কোনো বরাদ্দ আসে না। অথচ অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে বরাদ্দ আসে।’

তালিকার পাঁচ নম্বরে আছে মমতাজন্নেছা মহিলা মাদ্রাসা ও এতিমখানা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কলসকাঠী ইউনিয়নের চর কলসকাঠী এলাকায় কাছাকাছি নামে একটি প্রতিষ্ঠান আছে। সেটির নাম মুসলিম পাড়া মমতাজ নেছা মহিলা মাদ্রাসা। এই প্রতিষ্ঠানটি মুসলিমপাড়া সুন্নাতিয়া কারিমীয়া বহুমুখী মাদ্রাসা ও এতিমখানার সঙ্গে যুক্ত। বিষয়টি নিশ্চিত করেন মুসলিমপাড়া সুন্নাতিয়া কারিমীয়া বহুমুখী মাদ্রাসা ও এতিমখানার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মাওলানা মো. হারুনুর রশিদ বলেন, যে নামে চাল বরাদ্দ হয়েছে, সে নামে এই এলাকায় কোনো প্রতিষ্ঠান নেই।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যেই বরাদ্দ তুলে নেওয়া হয়। তাদের অভিযোগ করেন, এসব তালিকার সঙ্গে সাবেক-বর্তমান কর্মকর্তারা জড়িত। তাদের যোগসাজশে এতিমদের বরাদ্দ আত্মসাৎ করা হয়েছে।

পৌর এলাকার ফয়জুল করিম দারুল উলূম বহুমুখী মাদ্রাসা ও এতিমখানায় শিক্ষকতা করেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ বাকেরগঞ্জ শাখার নেতা মাওলানা কামাল উদ্দিন। তাঁর ভাষ্য, ‘উপজেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের বরাদ্দ তালিকায় যে নামগুলো দেখেছি, আমার জানামতে সেগুলোর একটি নামও সঠিক নয়। এসব নামে কোনো মাদ্রাসা বা এতিমখানা আছে বলে আমার জানা নেই।’ ভুয়া তালিকা করে এভাবে এতিমের নামে বরাদ্দ আত্মসাতের অভিযোগ তুলে তিনি হতাশা প্রকাশ করেন।

বাকেরগঞ্জ হাফেজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার অভিভাবক সদস্য ও পৌর বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. মিরাজ উদ্দিন জুয়েল বলেন, ‘শুনেছিলাম আমাদের প্রতিষ্ঠানের নামে তিন টন চাল বরাদ্দ এসেছে। পরে অফিসে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, আমাদের নামে কোনো বরাদ্দ নেই।’

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ বাকেরগঞ্জ শাখার সভাপতি মো. নাছির উদ্দিন রোকন ডাকুয়া বাকেরগঞ্জ আল কারিম মডেল মাদ্রাসার পরিচালক পদেও আছেন। তিনি বলেন, ‘এতিমের হক আত্মসাৎ করা শুধু অপরাধ নয়, এটি পাপও। যারা এতিমদের বরাদ্দ আত্মসাৎ করেছেন, তাদের কঠোর বিচার হওয়া উচিত।’

এসব বিষয়ে কোনো কিছুই জানেন না বলে দাবি করেন উপজেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামান। তিনি খোঁজখবর নিয়ে বিস্তারিত জানানোর আশ্বাস দেন।

বাকেরগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মিল্টন চন্দ্র পাল বলেন, ‘বরাদ্দের বিষয়টি আমি নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছি না। এসব প্রতিষ্ঠানের নামে আদৌ বরাদ্দ হয়েছে কিনা, তা যাচাই করা হবে।’ তবে অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে বরাদ্দ হয়ে থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেন তিনি। 

আরও পড়ুন

×