মায়ামির মায়ায় আমেরিকার স্বাধীনতা দিবস
ছবি- এএফপি
সঞ্জয় সাহা পিয়াল, মায়ামি থেকে
প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬ | ১০:২১
ছাব্বিশে মার্চের ঢাকা আর চৌঠা জুলাইয়ের মায়ামি– ভৌগোলিক মানচিত্রে দুই ভিন্ন গোলার্ধের দুটি বিন্দু হতে পারে; কিন্তু স্বাধীনতা দিবসের উদযাপন নিশ্চয় কাছাকাছি। কৌতূহল নিয়েই আটলান্টিকের কূলে আমেরিকার আড়াইশ বছরের জন্মলগ্নে মায়ামির বেফ্রন্ট পার্কে কাল রাতে যখন পা রাখা, এখানে দৃশ্যপট সম্পূর্ণ আলাদা।
স্বাধীনতার উদযাপন এখানে কোনো স্মৃতির চাদরে মোড়ানো নীরবতা নয়; এটি আসলে এক উদ্দাম, চঞ্চল জীবনের জয়গান। ঢাকার রাজপথে যখন লাল-সবুজের আলপনা আর দেশাত্মবোধের চেনা গাম্ভীর্য, মায়ামির পামগাছের নিচে তখন জারুলের আরঅ্যান্ডবি বিটের তুমুল গর্জন, উইলি চিরিনোর সালসা মিউজিক আর কিউবান-মেক্সিকান বারবিকিউর স্মোকি সুবাসের এক তীব্র মাদকতা। মায়ামির রাতের আকাশ হাজার হাজার বর্ণিল আতশবাজি আর ড্রোনের আলোয় এক অপার্থিব আলোর রোশনাইয়ে মেতে ওঠা। আমেরিকানরা আনন্দ করে অর্জিত স্বাধীনতাকে জীবনের প্রতিটি ছত্রে উপভোগ করার দুর্দম ঔদ্ধত্যে।
মায়ামি তো আসলে এক সমুদ্র মায়ার শহর, যেখানে ওয়াশিংটনের ডিক্লেয়ারেশন অব ইন্ডিপেন্ডেন্সের গাম্ভীর্যের সমান্তরালে সমস্বরে বেজে ওঠে লাতিন আমেরিকার চেনা উৎসবের কোলাজ। এই শহরে সমুদ্রপাড়ে মার্কিনিদের ঐতিহ্যবাহী বারবিকিউ সংস্কৃতির স্মোকি গন্ধ আর পোড়া মাংসের সুবাসের সঙ্গে বাতাসে মিশে যাচ্ছিল খাঁটি কিউবান স্ট্রিট ফুড আর মেক্সিকান ট্যাকোর চেনা স্বাদ। সকালে স্বাধীনতা দিবসের জমকালো প্যারেড যখন পার্কের রাস্তাগুলো প্রদক্ষিণ করেছে, তখন বাদ্যির তালে তাল মিলিয়ে শরীর দোলাচ্ছিল মায়ামির চেনা ড্যান্স পার্টির উদ্দাম তারুণ্য। অনেকের হাতে আমেরিকার লাল-নীল-সাদা তারকাখচিত পতাকা থাকলেও গলার স্কার্ফে কিংবা উৎসবের আড্ডায় ছিল বিশ্বকাপ ফুটবল। শহরে এমনিতেই লাতিনদের আধিক্য চোখে পড়ার মতো। এক বর্ণ ইংরেজি না জেনেও তাদের অনেকে হোটেল-রেস্টুরেন্টের ব্যবসা দিব্যি চালিয়ে যাচ্ছেন শুধু মোবাইলে ট্রান্সলেটর অ্যাপ দিয়ে।
স্বাধীনতা দিবস উদযাপনে মায়ামির ঐতিহ্যবাহী বেফ্রন্ট পার্কে আয়োজিত ‘২৫০ ইউনাইটেড’ নামে মেগা কনসার্ট আয়োজন করা হয়েছিল। মানুষের ঢল নেমেছিল সেখানে। আমেরিকানরা এমনিতেই মিউজিক ভীষণ পছন্দ করে; গাড়ি কিংবা শপিংমল– সারাক্ষণই কোনো না কোনো মিউজিক বেজে চলে সেখানে। এদিন স্বাধীনতা দিবসের কনসার্টে মূল আকর্ষণই ছিল আরঅ্যান্ডবি, পপ-রক, রেগে এবং লাতিন মিউজিকের একঝাঁক বিশ্বখ্যাত আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় তারকা। তবে সবকিছু ছাপিয়ে ছিল রাতের আকাশে আতশবাজির মায়া।
বেসাইড মার্কেটপ্লেসের অন্ধকার আকাশকে ফালা ফালা করে যখন আমেরিকার ২৫০ বছরের ইতিহাস স্মরণে হাজার হাজার বর্ণিল আতশবাজি আর ড্রোনের কোরিওগ্রাফি জ্বলে উঠল, সাউথ বিচের রুপালি জলরাশিতে তখন তার প্রতিফলন যেন এক অনন্য আলোক-কাব্য। ছুটির দিনে শহরের ট্রাফিকও ছিল ভীষণ ব্যস্ত। কিউবান উবারচালকের দাবি, এবার নাকি তাদের এখানে স্বাধীনতা দিবসের উদযাপন বেশ জমকালো করেই হচ্ছে। আড়াইশ বছরের মাইলফলক বলে কথা। শুধু পার্ক বা পাবে নয়; সন্ধ্যার পর শহরের বিভিন্ন বাড়ির সামনেও ছেলে-বুড়োর আতশবাজি ফোটানোর আনন্দ ধরা পড়ে। তখন মনে হয়, ঢাকা থেকে মায়ামি– স্বাধীনতার আনন্দ বুঝি এমনই।
- বিষয় :
- বিশ্বকাপ ফুটবল
