স্পেন-পর্তুগাল: ডালাসে ইউরোপিয়ান ক্ল্যাসিকো
নাজমুল হক নোবেল
প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬ | ০৯:৫২ | আপডেট: ০৬ জুলাই ২০২৬ | ০৯:৫২
উত্তর আমেরিকার তীব্র গরমে একটু স্বস্তি পেতে তিনটি এয়ারকন্ডিশন্ড স্টেডিয়ামকে গুরুত্বপূর্ণ ভেন্যু হিসেবে ব্যবহার করছে ফিফা। সেই তিনটির একটি হলো এনএফএলের (ন্যাশনাল ফুটবল লিগ– আমেরিকান ফুটবল) জনপ্রিয় দল ডালাস কাউবয়দের ঘর ‘এটিঅ্যান্ডটি’ স্টেডিয়াম। ৮০ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার সেই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত স্টেডিয়ামে আজ উত্তাপ ছড়াবে ইউরোপিয়ান ক্ল্যাসিকো। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর বিশ্বকাপ স্বপ্নের কী ইতি ঘটবে দুরন্ত ছন্দে থাকা লামিনে ইয়ামালের স্পেনের হাতে? নাকি কোয়ার্টার ফাইনালে নাম লিখিয়ে শিরোপার পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবেন সিআর সেভেন! আসরের অন্যতম আকর্ষণীয় এ ম্যাচ ঘিরে ফুটবল দুনিয়া টানটান উত্তেজনায় ফুটছে।
৪১ বছর বয়সী রোনালদোর এটাই হয়তো শেষ বিশ্বকাপ। আজ পর্তুগাল হেরে গেলে এটাই হতে পারে ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলারের শেষ ম্যাচ। আন্তর্জাতিক ফুটবল ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা অবশ্য এখনও নিজের বিদায় নিয়ে কোনো কথা দেননি। তবে তাঁর বোন বিশ্বকাপ শেষে তাঁর বিদায়ের ইঙ্গিত দিয়েছেন। এবারের আসরে রোনালদো অবশ্য তেমন ভালো খেলছেন না। উজবেকিস্তানের বিপক্ষে জোড়া গোল করে ‘আই এম ব্যাক’ চিৎকার দিলেও গ্রুপ পর্বের বাকি দুই ম্যাচে ছিলেন একেবারেই নিষ্প্রভ। কঙ্গোর বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র হওয়া ম্যাচে তাঁকে খুঁজেই পাওয়া যায়নি। ওই ম্যাচের পর অনেকেই রোনালদোকে দলের বোঝা বলে সমালোচনাও করেছিলেন। নকআউটে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ২-১ ব্যবধানে জেতা ম্যাচে পেনাল্টি থেকে গোল করলেও ভালো খেলতে পারেননি। শেষ দিকে রোনালদোকে বদলে রুবেন নেভেসকে নামিয়ে ছিলেন কোচ মার্টিনেজ। এবারের আসরে রোনালদোকে বদল করতে গড়িমসি করেও সমালোচনার মুখে পড়েছেন কোচ। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে বদলি হিসেবে নেমে রোনালদোর পজিশনে গিয়ে ৯৪ মিনিটে দুর্দান্ত এক হেডে পর্তুগালকে জয় এনে দিয়েছেন গনসালো রামোস। অনেকের পরামর্শ, রোনালদোর বদলে ২৫ বছর বয়সী রামোসকে স্ট্রাইকার হিসেবে খেলালে ভালো ফল পাবে পর্তুগাল। কিন্তু কোচ মার্তিনেজ মনে হয় না এ পরামর্শ কানে তুলবেন।
হটফেভারিট স্পেনের শুরুটাও ভালো হয়নি। প্রথম ম্যাচেই আসরের বিস্ময় কেপ ভার্দে গোলশূন্যভাবে রুখে দিয়েছিল। তবে ইউরো চ্যাম্পিয়নরা সঠিক সময়েই ঘুরে দাঁড়িয়েছে। শেষ ৩২-এর ম্যাচে অস্ট্রিয়াকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়েছে। জোড়া গোল করেছেন মিকেল ওইয়ারসাবাল; উইংব্যাক পেদ্রো পোরো করেছেন অন্য গোলটি। লামিনে ইয়ামাল গোল না পেলেও প্রতিপক্ষের ডিফেন্সকে যথেষ্ট ভুগিয়েছেন। নকআউটের শুরুতেই এমন দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে বেশ খুশি স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। তাদের এ পারফরম্যান্স বাকিদের জন্য একটি বার্তা বলেও মনে করছেন তিনি, ‘অসাধারণ একটি ম্যাচ খেললাম। আমি ভীষণ খুশি। কারণ প্রায় প্রতিটি দিক থেকে আমরা প্রায় নিখুঁত পারফরম্যান্সের কাছাকাছি।’ তার পরও প্রতিটি ক্ষেত্রে উন্নতির জায়গা দেখছেন কোচ, ‘এখনও আমরা নিজেদের সেরাটায় পৌঁছাতে পারিনি। তাই প্রতিটি বিভাগেই উন্নতির জায়গা রয়েছে। এটাই আমাদের টিম স্পিরিট।’ টানা ৩৪ ম্যাচ অপরাজিত থাকার আত্মবিশ্বাস তাদের সঙ্গী।
স্পেনের জন্য এ ম্যাচটি প্রতিশোধের মিশনও। বছরখানেক আগে উয়েফা নেশন্স লিগের ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল দুই দল। জার্মানির সেই ম্যাচে স্প্যানিশদের অভিজ্ঞতা তিক্ত। টাইব্রেকারে হেরেছিল লা ফুয়েন্তের দল। নির্ধারিত সময়ে ২-২ গোলে ড্র হওয়ার পর পেনাল্টি শুটআউটে ৫-৪ গোলে জিতেছিল রোনালদোর পর্তুগাল। এবারের মঞ্চটা আরও বিশাল। সে সঙ্গে দুই প্রজন্মের দুই তারকার শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইও। এক প্রজন্মের শেষের নায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো মুখোমুখি হবেন নতুন প্রজন্মের অন্যতম প্রতিভা লামিনে ইয়ামালের। হ্যামস্ট্রিং ইনজুরি থেকে ওঠা ইয়ামাল ধীরে ধীরে ছন্দ ফিরে পাচ্ছেন। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জয়ের পর ভীষণ আত্মবিশ্বাসী ১৮ বছরের এ তরুণ, ‘আমি এই রাউন্ডগুলো পেরিয়ে যেতে চাই এবং স্পেনের হয়ে জিততে চাই। আমরা কোনো দলকে ভয় পাই না, আমরা স্পেন!’ দুই দলের সর্বশেষ পাঁচ লড়াইয়ে উভয়ের জয় একটি করে। বাকি তিনটি ম্যাচ ড্র হয়েছে।
দুই দলের আসল লড়াইটা হবে মাঝমাঠে। এখানে সম্ভবত কিছুটা হলেও পর্তুগাল এগিয়ে। ভিনিতহা, ব্রুনো ফার্নান্তেজ, জোয়াও নেভেসের মতো দাপুটে ও সৃষ্টিশীল মিডফিল্ডার আছে পর্তুগালে। তবে স্পেনও খুব একটা পিছিয়ে নেই। অভিজ্ঞ রদ্রির নেতৃত্বে পেদ্রি ও গাভির মতো দুই অমিত প্রতিভাধর তরুণ মিডফিল্ডার আছে তাদের। তবে স্পেন এগিয়ে যাবে আক্রমণভাগে। লামিনে ইয়ামালের নেতৃত্বে মিকেল ওইয়ারসাবাল ও দানি অলমোর মতো কার্যকরী ফরোয়ার্ড আছে স্পেন দলে। আর পর্তুগালে বুড়ো রোনালদোর সঙ্গে পেদ্রো নেতো এ রাফায়েল লিয়াওয়ের আক্রমণভাগ এখনও পুরোপুরি জ্বলে উঠতে পারেনি।
