করোনাযুদ্ধে চিকিৎসক ও মেডিকেল শিক্ষার্থীদের প্ল্যাটফর্ম
সম্মুখে যারা অন্তরালেও তারা
হাসনাইন ইমতিয়াজ
প্রকাশ: ০৯ মে ২০২০ | ০৪:৪৬ | আপডেট: ০৯ মে ২০২০ | ১০:০০
মাশতুরা জান্নাত মৃদুলা পড়াশোনা করছেন রংপুরের নর্দার্ন প্রাইভেট মেডিকেল কলেজে। করোনার প্রকোপে দেশের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো তাদের কলেজও ছুটি দেয়। বন্ধে বাড়িতে চলে যান মাশতুরা।
কিন্তু করোনার মতো দুর্যোগের সময় ঘরে বসে থাকতে মন সায় দিচ্ছিল না। দেশ ও জাতির জন্য কিছু করার তাড়নায় আবার ফিরেন ক্যাম্পাসে। কয়েকজন সহাপাঠীর সাথে মিলে তৈরি করেন করোনা সংক্রান্ত সচেতনতা মূলক ভিডিও ক্লিপস ও অনলাইন ক্যাম্পেইন সংশ্লিষ্ট নানা ধরনের কনটেন্ট। তাদের এ কাজে সহযোগিতা করে চিকিৎসক ও মেডিকেল শিক্ষার্থীদের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন প্ল্যাটফর্ম অব মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল সোসাইটি।
শুধু সচেতনতা মূলক কর্মকাণ্ডেই নয়, প্ল্যাটফর্মের সদস্যরা করোনার বিরুদ্ধে সামনে থেকে লড়াই করছেন। হাসপাতালে সরাসরি চিকিৎসা সেবার পাশাপাশি তাদের অনেক সদস্য স্বেচ্ছাশ্রমে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুমে কাজ করছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিভিন্ন টেমপ্লেট ও পলিসি বাংলা অনুবাদ করছেন। অনলাইন ও টেলিফোনে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ দিচ্ছেন। নিজেদের ওয়েব পোর্টালে করোনা সংক্রান্ত খবর ও সতর্ক বার্তা প্রচার করছেন। করোনা আক্রান্ত সহকর্মীদের সাহস যোগাতে তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। সচেতনতামূলক লিফলেটও বিতরণ করছেন।
প্ল্যাটফর্ম যাত্রা করে ২০১৩ সালে। এরপর থেকে সংগঠনটি বাংলাদেশের চিকিৎসকদের নিরাপদ কর্মস্থল সৃষ্টি, অধিকার রক্ষা ও দক্ষতা অর্জনের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।
প্ল্যাটফর্ম নিউজ পোর্টাল: চীনের উহান থেকে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে যাওয়া এবং চীনে প্রথম কোভিড-১৯ রোগীর মৃত্যুর পর জানুয়ারি মাসেই করোনাভাইরাস বিষয়ে আলোচনা ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম শুরু করে প্ল্যাটফর্ম। নিজেদের নিউজ পোর্টাল ও ফেসবুক পেজের মাধ্যমে। মহামারিতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, নিয়মিত করোনা আপডেট ইত্যাদির পাশাপাশি জানানো হচ্ছে দেশে ডাক্তাররা কোথায় আছেন, তাদের ভাবনা, পরামর্শ, অবস্থা ইত্যাদি।
প্রবাসীদের কোয়ারেন্টাইনে স্বেচ্ছাসেবা: ১ ফেব্রুয়ারি উহান থেকে দেশে আসা ৩১৬ প্রবাসীকে আশকোনা হজ্জ ক্যাম্পে রাখা হয়। তাদের স্বাস্থ্য সেবায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে সেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেন প্ল্যাটফর্মের সদস্যরা।
টেলিমেডিসিন সেবা: প্ল্যাটফর্মের প্রায় তিন হাজার স্বেচ্ছাসেবী ডাক্তার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিনামূল্যের জাতীয় করোনা হটলাইন ৩৩৩ এর মাধ্যমে টেলিফোনে জনগণকে সাস্থ্যসেবা দিচ্ছেন। এ পর্যন্ত তারা ফোন কলের মাধ্যমে ১৫ লাখের বেশি মানুষকে টেলিসেবা দিয়েছেন।
করোনা কন্ট্রোল রুম: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত করোনা কন্ট্রোল রুমে কাজ করছেন প্লাটফর্মের ২০ সদস্যের একটি দল। তারা টেলিমেডিসিন সেবা দেওয়ার পাশাপাশি করছেন কল ট্রেসিং এর কাজ। এছাড়াও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার বিভিন্ন প্রোটোকল এবং ১৫টির অধিক গাইডলাইন বাংলায় অনুবাদও করছেন।
কনটাক্ট ট্রেসিং: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাথে মিলে প্লাটফর্ম কর্মীরা এপ্রিলের শুরু থেকে ঢাকা ও খুলনায় কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং অর্থাৎ কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা এবং তাদের কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করার কাজ করছেন।
মিট দ্য সুপার হিরো ক্যাম্পেইন: করোনা পরিস্থিতিতে সামনে থেকে লড়ছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। এই সুপার হিরোদের সকলের কাছে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য প্ল্যাটফর্ম শুরু করেছে মিট দ্য সুপারহিরো ক্যাম্পেইন, যা এই দুঃসময়ে সামনের সারিতে থেকে সেবা দিয়ে যাওয়া চিকিৎসকের মনোবল হয় দৃঢ় করতে সহযোগিতা করছে। পাশাপাশি বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সহযোগিতায় হোম কোয়ারেন্টাইন ও আইসোলেশনে থাকা চিকিৎসকদের মানসিক সাপোর্ট ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। রয়েছে ডক্টরস সাপোর্ট টিম, বাড়ির মালিক বা অন্য কেউ ডাক্তারদের বাসায় থাকা নিয়ে হেনেস্তা করলে প্রশাসন ও পুলিশের সহযোগিতায় প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন জায়গায় কভিড-১৯ রোগীর সেবায় নিয়োজিত চিকিৎসকদের খাবার পৌঁছানো বা তাদের যাতায়াতের বিষয়ে সহযোগিতা করছে প্ল্যাটফর্ম।
কোভিড বিষয়ক চিত্রকর্ম: চিকিৎসক ও মেডিকেল শিক্ষার্থীরা করোনা মহামারির চিত্র তুলে ধরছেন নিজেদের রং তুলিতে। তাদের সেসব চিত্রকর্মগুলো এক ফ্রেমে আনা হচ্ছে 'এন আর্ট ইজ এ স্টোরি অব কোভিড-১৯' প্রজেক্টের মাধ্যমে। এখন পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে ৬৫ এরও বেশি শিল্পকর্ম।
করোনা প্ল্যাটবট: প্ল্যাটফর্মের রয়েছে নিজস্ব করোনা প্ল্যাটবট, (m.me/Platform.med.org) যেখানে কথোপকথনের মাধ্যমে কোভিড-১৯ সম্পর্কিত তথ্য সহজেই জেনে নেয়া সম্ভব।
এ ছাড়াও প্ল্যাটফর্ম আগামী ফাউন্ডেশনের সাথে সমন্বিতভাবে তালিকাভুক্ত ১৩টি বিদ্যালয়ের দুই হাজার ৮৭৫ জন শিক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকদের ফোনে স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছে। সংগঠনটি সারা দেশব্যাপী এক হাজার স্বেচ্ছাসেবী নিয়ে গঠন করে 'কোভিড-১৯ ফাইটার্স ভলান্টিয়ার টিম। দেশের আপদকালীন সেবা দেয়ার জন্য এই স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। রংপুর, পাবনা ও সিলেটে স্বেচ্ছা সেবকেরা সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করেছে।
প্ল্যাটফর্মের সাধারণ সম্পাদক ডা. ফয়সাল বিন সালেহ সমকালকে জানান, তারা নিজস্ব "আমাদের ডাক্তার" আ্যপস তৈরির করছেন, যার মাধ্যমে অডিও ও ভিডিও কলের মাধ্যমে রোগীদের টেলিসেবা প্রদান করা হবে।