ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬

জীবনের পাঠও দেন মোক্তার হোসেন

জীবনের পাঠও দেন মোক্তার হোসেন
×

এক পায়ে সাইকেল চালিয়ে পড়াতে যান মোক্তার হোসেন সমকাল

সাঁথিয়া (পাবনা) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৫১

| প্রিন্ট সংস্করণ

এক পা ও এক হাত প্রায় অচল। তবুও প্রায় ৪০ বছর ধরে এক পায়ে সাইকেল চালিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছোট ছেলেমেয়েদের পড়িয়ে যাচ্ছেন মোক্তার হোসেন (৬৫)। যেখানে অনেকেই প্রতিবন্ধিতার কাছে হার মানে, সেখানে টিউশনি করে পাঁচ সদস্যের পরিবারের খরচ চালানোর পাশাপাশি গড়ে তুলেছেন অসংখ্য শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ। তাঁর অনেক ছাত্রছাত্রী এখন শিক্ষক, সরকারি চাকরিজীবীসহ বিভিন্ন পেশায় প্রতিষ্ঠিত।
পাবনার বেড়া উপজেলার শাহপাড়া মহল্লার বাসিন্দা মোক্তার হোসেনের জীবন যেন সংগ্রাম আর আত্মবিশ্বাসের এক অনন্য উদাহরণ। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে পোলিওতে আক্রান্ত হন। গ্রামাঞ্চলে পোলিও সম্পর্কে সচেতনতা ও আধুনিক চিকিৎসার সুযোগ ছিল না। ফলে কবিরাজি চিকিৎসার ওপর নির্ভর করে পরিবার। এতে শৈশবেই তাঁর ডান হাত ও ডান পা প্রায় অকেজো হয়ে যায়। অন্য শিশুদের মতো বেড়ে ওঠার সুযোগ না পেলেও হার মানেননি। প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও পড়াশোনার প্রতি ছিল তাঁর প্রবল আগ্রহ। নানা কষ্টের মধ্যেও দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। কিন্তু পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে আনুষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন থেমে যায়। এরপর নিজের অর্জিত জ্ঞান অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েই শুরু করেন টিউশনি।
খুব অল্প বয়সেই জীবিকার জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিক্ষার্থীদের পড়ানো শুরু করেন। প্রথমদিকে বাঁশের লাঠির ভরসায় চলাফেরা করে টিউশনি করতেন। শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দূরের বাড়িতেও যেতে হতো। তখন লাঠির সাহায্যে চলাচল হয়ে ওঠে আরও কষ্টকর। এই পরিস্থিতিতে নিজের সঞ্চয় ও ধার করা টাকা দিয়ে একটি পুরোনো সাইকেল কেনেন। এক মাস নিরলস অনুশীলনের পর বাঁশের লাঠি সঙ্গে নিয়েই এক পায়ে সাইকেল চালানো রপ্ত করেন। এরপর থেকে সেই সাইকেলই হয়ে ওঠে জীবিকার সঙ্গী। আজও এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে সাইকেল চালিয়ে শিক্ষার্থীদের পড়াতে যান।
মোক্তার হোসেনের ছাত্র এবং বর্তমানে বেড়া ফাজিল মাদ্রাসার সহকারী অধ্যাপক মাহবুব হোসেন বলেন, ‘স্যার শুধু বইয়ের পাঠ শেখাননি, শিখিয়েছেন জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করার সাহস। শারীরিক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও তিনি যেভাবে নিয়মিত বাড়ি বাড়ি গিয়ে পড়াতেন, তা আজও আমাকে অনুপ্রাণিত করে। তাঁর কাছ থেকেই শিখেছি, ইচ্ছাশক্তি আর পরিশ্রম থাকলে জীবনে কোনো বাধাই বড় নয়।’
মোক্তার হোসেন বলেন, ‘ছোটবেলায় বুঝিনি, আমার জীবন এত কঠিন হবে। এক পা ও এক হাত নিয়েই চার দশক ধরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিউশনি করছি। ঝড়-বৃষ্টি কিংবা কষ্ট–কিছুই আমাকে থামাতে পারেনি। এখন শুনি, আমার ছাত্ররা দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সুনামের সঙ্গে কাজ করছে। তাদের সাফল্যই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।’
 

আরও পড়ুন

×