মেসির বুকে প্রতিদানের ছটফটানি
সঞ্জয় সাহা পিয়াল, কানসাস সিটি থেকে
প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩৬
আটলান্টায় প্রলয়ংকরী ফুটবল-যুদ্ধের পর আর টিম হোটেলে ফেরেননি মেসিরা। ওই বিকেলেই চার্টার্ড ফ্লাইটে চড়ে ফিরে আসেন কানসাসে মিসৌরি নদীর ধারে তাদের প্রিয় হোটেলে। ম্যাচের ক্লান্তি আর বারুদের গন্ধ গায়ে মেখেই তারা যখন হোটেলের অলিন্দে সুষুপ্তির খোঁজে, ঠিক মধ্যরাতের নিস্তব্ধতা চিরে সেখানে ভক্তের ভিড়। তারা এসেছিলেন তাদের আরাধ্য ঈশ্বরকে ভালোবাসার অর্ঘ্য জানাতে। পরিস্থিতি এমন এক মোহোৎসব পর্যায়ে পৌঁছাল যে, টিম হোটেল কর্তৃপক্ষকে এসে বিনীত আর্তি জানাতে হলো, ‘ওদের একটু ঘুমাতে দিন, রাত ১০টার পর আর ওই ড্রামের কানফাটানো আওয়াজ তুলবেন না!’ ভক্তদের এই যে অকৃত্রিম, অযাচিত এবং আদিম ভালোবাসা— এটাই আসলে লিওনেল মেসির এই বিশ্বকাপের মূল চালিকাশক্তি।
কাতারের সেই মরূদ্যানের বুকে গোটা আর্জেন্টিনা দল বুটের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়েছিল শুধু একটা মানুষের মাথায় রাজমুকুট পরাবে বলে। ওটা ছিল ভক্তদের পক্ষ থেকে মেসির প্রতি এক পরম আরাধনা কাব্য। কিন্তু এবার চিত্রনাট্য উলটে গেছে। এলএমটেন খুব ভালো করেই জানেন, ফুটবল-ঈশ্বরের খাতাতেও ঋণের একটা হিসাব থাকে। আর কানসাসের এই নিশিরাতের আরতি ভালোবাসার সেই ঋণের বোঝাটাই যেন আরও বাড়িয়ে দেয়। সতীর্থদের প্রবল আস্থা তাঁকে প্রতিদান দিতে প্রেরণা দেয়। মিসরকে হারানোর পর সতীর্থরা তাঁকে কাঁধে চড়ে নিয়েছেন। তবে এবার আর শুধু এই চেনা ফ্রেমে ফ্রেমবন্দি হতে চান না। এবার তিনি নিজেই গোটা দলকে, গোটা দেশের কোটি ভক্তের প্রত্যাশাকে নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। কাতার যদি হয়ে থাকে সতীর্থদের পক্ষ থেকে মেসিকে দেওয়া এক ঐতিহাসিক উপহার, তবে এবারের বিশ্বকাপ আসলে লিওনেলের পক্ষ থেকে এক অনন্যসাধারণ প্রতিদান। তিনি এবার খেলছেন নিজের জন্য নয়; খেলছেন এই মানুষগুলোর ভালোবাসার ঋণশোধের এক মহাজাগতিক তাগিদে। বুটের ডগায় সেই ভালোবাসার অর্ঘ্য মেখে মেসি এবার তৈরি— সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এক নতুন ভোরের ইতিহাস লিখতে!
এ কথা কোচ লিওনেল স্কালোনি মিক্সড জোনে দেশি এবং বিদেশি সাংবাদিকদের কাছে খুলে বলেছেন। যেখানে কোনো এক সাংবাদিকের জিজ্ঞাসা ছিল, ‘স্কালোনি, লোকে বলে আর্জেন্টিনার এই দল মেসির জন্য বিশ্বকাপ জিততে চায়। আপনি কি প্রত্যাশার এই চাপ অনুভব করছেন?’ উত্তরে রিপোর্টারের ভুলটা ভাঙিয়ে দেন স্কালোনি, ‘আমার মনে হয় লোকে ভুল ভাবে। আজ লিও (মেসি) দেখিয়ে দিয়েছে, সে আসলে আমাদের সবার জন্য জিততে চায়। সে মনে করে, আগের বিশ্বকাপটা তার সতীর্থরা তাকে উপহার দিয়েছে। এবার সে সতীর্থদের জন্য সেই উপহারটা দিতে চায়। খেয়াল করে দেখবেন, ম্যাচটি জেতার পর সে আবেগী হয়ে পড়েছিল। সেটি এ কারণে নয় যে সে গোল করেছিল বলে; সেটি এই কারণে যে সে অনুভব করেছিল— যে দায়িত্বটা সে কাঁধে নিয়েছে, তা সে পালন করতে পেরেছে। আসলে মাঝেমধ্যে আমার মনে হয়, দলকে বিপদে পড়া নিয়ে সে যতটা চিন্তিত থাকে, আমরা অনেকে তার বিপদে পড়া নিয়ে ও ততটা চিন্তিত থাকি না। দলের প্রতি প্রবল এক দায়িত্ববোধ থেকেই সে অবিচল থাকে লক্ষ্যে।’
স্কালোনি আরও পরিষ্কার করে দেন, মিসরের কাছে ২-০ গোলে পিছিয়ে যাওয়ার পরও মেসি শান্ত ছিলেন, কারও দিকে অভিযোগের কোনো আঙুল তোলেননি; বরং গোল খাওয়ার পর বলটি চেয়ে নিয়েছেন নতুন করে কিক অফের জন্য। দলের প্রতি মেসির এই অভিভাবকত্বটার কারণেই ম্যাচ শেষে সবাই তাকে কাঁধে তুলে নেন। যদিও স্কালোনি জানিয়েছেন, আর্জেন্টিনার এই দলটিতে তারা সবাই ভাইয়ের মতো। সেখানে তাদের বন্ধনটা এত দৃঢ় যে, সবাই কিছু না কিছু করে দলকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চায়।
মিক্সড জোনে লিওনেল মেসিও এসেছিলেন, চোখের কোণে জমে থাকা কান্নার দাগ তখনও স্পষ্ট। প্রথমার্ধে পেনাল্টি মিসের সেই অপরাধ বোধ কীভাবে তাকে গ্রাস করছিল, তা স্বীকার করে নিয়ে অবরুদ্ধ গলায় মেসি জানান, ‘পেনাল্টিটা মিস করার পর আমার মনে হচ্ছিল, আমি বুঝি আজ গোটা দলটাকে ডুবালাম। বড্ড রাগ হচ্ছিল নিজের ওপর।’ ২-০ গোলে পিছিয়ে থাকার পর কীভাবে আর্জেন্টিনা ম্যাচে ফিরল, তা বলতে গিয়ে শুধুই সতীর্থদের প্রশংসা। ‘২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে থাকার পর ঘুরে দাঁড়ানো সহজ নয়। তবে আমি সব সময়ই যেমন বলি, এই দল কখনও হার ছাড়ে না, শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যায়। আমাদের ভাগ্য ভালো, কুতি (রোমেরো) গোল পাওয়ার পরও সময় ছিল। আর আমরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই জিততে পারলাম। দল আজ যা করেছে, তা অবিশ্বাস্য। আমি সন্তুষ্ট যে, সবাই এটা উপভোগ করে যেতে পারবে। আশা করি, আমরা এগিয়ে যেতে পারব।’
স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দিলেন, এই দলটার আসল ক্যারেক্টার বা ইউএসপি ঠিক কোথায়। এই দলের প্রত্যেক ফুটবলার, কোচিং স্টাফের সঙ্গে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি সমর্থকের ভালোবাসার বিশাল এক অর্ঘ্য তিনি কাঁধে নিয়ে নিয়েছেন। তাই লিওনেল মেসির এই বিশ্বকাপ অভিযান ভালোবাসার ঋণ শোধানোরও। আর প্রতিদানের তাড়না তাঁকে এত মরিয়া করে তোলে।
- বিষয় :
- লিওনেল মেসি
- আর্জেন্টিনা
- বিশ্বকাপ ফুটবল