রেফারি, ভিএআর বিতর্কে ফুটবল দুনিয়া বিভক্ত
স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬ | ০৬:৫৩
আর্জেন্টিনার বিপক্ষে দুই গোলে এগিয়ে গিয়েও শেষ পর্যন্ত ৩-২ গোলে হেরে বিদায় নিয়েছে মিসর। বিদায়ের পর বিস্ফোরক অভিযোগ করেছেন মিসরের কোচ হোসাম হাসান। এ হারের পেছনে রেফারি ও ফিফাকে দায়ী করেছেন তিনি। মিসরের দ্বিতীয় গোলটি করা জিকো তো রেফারিকে জালিম বলেছেন। রেফারির বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলো তদন্তের দাবি তুলেছেন মিসর ফুটবলের প্রধান আবো রিদা। এ ম্যাচের রেফারিং ও ভিএআর নিয়ে পুরো ফুটবল দুনিয়া বিভক্ত হয়ে গেছে।
অবশ্য বিপক্ষেই বেশির ভাগ বোদ্ধা। তারা রেফারি ও ফিফার তীব্র সমালোচনা করেছেন। এর জেরেই রেফারি ও ভিএআরের সমর্থনে কথা বলেছেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। তবে ফিফা সভাপতি নিজেই আস্থার জায়গায় নেই। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ফোনে এক দিন আগে ফোলারিন বালোগানের লাল কার্ডের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করে তিনি নিজেই বিতর্কিত হয়ে গেছেন।
টুর্নামেন্ট থেকে বিদায়ের পর সংবাদ সম্মেলনে মিসরের কোচ হাসান বলেন, 'বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের চেয়ে আমরা ভালো খেলেছি। প্রায় সব দিকেই আমরা এগিয়ে ছিলাম। কিন্তু মাঠের ভেতরের কিছু সিদ্ধান্ত এবং মাঠের বাইরের কিছু বিষয় ম্যাচের ফলাফলকে প্রভাবিত করেছে। তারা হয়তো চেয়েছিল বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা টুর্নামেন্টে টিকে থাকুক। হয়তো তারা চেয়েছিল মেসি প্রতিযোগিতায় থাকুক।' এ ম্যাচের প্রধান রেফারি ছিলেন ফ্রান্সের ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ে। তাদের ম্যাচে এ রেফারি নিয়োগের বিরোধী করার কথা জানিয়ে হাসান বলেন, ‘আমরা সম্মান বা ফেয়ার প্লে- কিছু পাইনি। মোহামেদ সালাহর ওপর হওয়া ফাউলের ঘটনার সম্ভাব্য পেনাল্টি দেওয়া হয়নি। এমনকি ভিএআরও দেখা হয়নি। আমাদের দ্বিতীয় গোলও অদ্ভুতভাবে বাতিল করা হয়েছে। আমাদের সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছে।' রেফারির সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে হলুদ কার্ডও দেখেছেন তিনি।
এ ম্যাচের রেফারি ও ভিএআরের সিদ্ধান্ত নিয়ে চলছে তুমুল বিতর্ক। রেফারিং বিশেষজ্ঞ এবং প্রিমিয়ার লিগের সাবেক অফিসিয়াল গ্রাহাম স্কট সংবাদমাধ্যম ‘দ্য অ্যাথলেটিক'কে বলেছেন, ৬৭ মিনিটে মিসরের ফরোয়ার্ড জিকোর করা গোলটি বাতিল করা ছিল ভুল সিদ্ধান্ত।
স্কট ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, ‘মিসরের গোলটি বাতিল করার সিদ্ধান্ত ভুল ছিল। জিকোর করা গোলের ঠিক আগের মুহূর্তে লিসান্দ্রো মার্তিনেজের ওপর আত্তিয়ার চ্যালেঞ্জটি ছিল খুবই স্বাভাবিক কনট্যাক্ট (শারীরিক লড়াই)। এটিকে ফাউল না ধরে রেফারির স্বাভাবিক হিসেবে নেওয়া উচিত ছিল। ঘটনাটি ঘটেছিল গোলপোস্ট থেকে প্রায় ১০০ গজ দূরে। ফলে নিজেদের গুছিয়ে নিয়ে রক্ষণ সামলানোর পর্যাপ্ত সুযোগ ছিল আর্জেন্টিনার সামনে।'
ভিএআর হস্তক্ষেপে গোল বাতিল করার মতো ফাউল হয়নি বলেও মনে করছেন তিনি। রেফারির ভুল সংশোধনে ভিএআর বিস্ময়করভাবে সীমা লঙ্ঘন করছে বলেও মনে করছেন গত বছর অবসরে যাওয়া এ রেফারি। তিনি মনে করছেন, মিসরের বাতিল হওয়া গোলটির আগে উল্লেখ করার মতো কোনো ফাউল হয়নি।
“ওয়ার্ল্ড কাপ নাউ’ অনুষ্ঠানে এর ব্যাখ্যা দেন তিনি, “কোনো ফাউলের সূত্র ধরে গোল হলে, সেই গোল কোনোভাবেই বৈধতা পাবে না। এটি অনুকে আগে থেকেই ভিএআর প্রটোকলের অংশ। তাই গোল বাতিলের সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল।'
কিংবদন্তি ইংলিশ স্ট্রাইকার ইয়ান রাইট আর্জেন্টিনার তৃতীয় গোলটি বাতিলের পক্ষে। কারণ, এ গোলের আক্রমণটি শুরুর সময় সালাহ ফাউলের শিকার হয়েছিলেন। ইংল্যান্ডের আইটিভি স্পোর্টসে বিশ্লেষকের দায়িত্ব থাকা রাইট বলেন, 'যদি আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রে বক্সের প্রান্তে ফাউলের জন্য আগের ঘটনা টেনে এনে গোল বাতিল করতে পারেন, তবে সালাহর ঘটনার জন্যও আপনাকে আগের ঘটনা টেনে দেখতে হবে। হয়তো আঘাতটি হস্তক্ষেপের মতো ন্যানতম পরিস্থিতি গেছিল। তিনি সামান্য ছিল, কিন্তু তাকে আঘাত করা হয়েছিল।
একই যুক্তিতে, আর্জেন্টিনার জয়সূচক গোলের আগে মোহামেদ সালাহকে ফাউলের অভিযোগে মিসরের পেনাল্টির দাবি নাকচ করে রেফারি সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছেন। তাঁর মতে, একই ধরনের ঘটনার দুই রকম সিদ্ধান্ত নিয়েছেন রেফারি।
ফক্স স্পোর্টসের ফুটবল নিয়ম বিশ্লেষক ও সাবেক ফিফা রেফারি মার্ক ক্ল্যাটেনবার্গও মনে করছেন, মিসরের গোল বাতিল করা উচিত ছিল না। ফক্স স্পোর্টসকে ক্ল্যাটেনবার্গ বলেন, 'আমি মনে করি না এটা ফাউল ছিল এবং গোলটি বাতিল করতে ভিএআরের এভাবে হস্তক্ষেপ করা উচিত ছিল না।'
২০১৬ ইউরো ও চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে রেফারিং করা ক্ল্যাটেনবার্গ চলতি বিশ্বকাপে রেফারিদের ধারাবাহিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তবে ফক্স স্পোর্টসের ফুটবল রেফারিং বিশেষজ্ঞ ডক্টর জো মাচনিকের অভিমত আবার ভিন্ন। তাঁর মতে, যেহেতু সেটি ফাউল ছিল, তাই গোল বাতিলের সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল।
ম্যাচ শেষে লিভারপুলের সাবেক ডিফেন্ডার জিমি ক্যারাঘারও ভিএআর হস্তক্ষেপে গোল বাতিল করা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, ‘আমি বলতে পারি, এটি যদি অন্য কোনো দলের বিপক্ষে হতো, তবে এটিকে (মিসরের গোল) গোল হিসেবেই গণ্য করা হতো। এটি যদি প্রিমিয়ার লিগ, লা লিগা বা সিরি’এতে হতো, তাহলে ভিএআর পর্যালোচনার পরও গোল বহাল থাকত।' কিংবদন্তি ইংলিশ স্ট্রাইকার অ্যালান শিয়েরার সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, ‘হয় দুটিই ফাউল, না হয় একটিও ফাউল নয়।'
সাংহাই বিজনেস স্কুলের অধ্যাপক সাইম চ্যাডউইক আবার এই ম্যাচের রেফারিংয়ের সঙ্গে ভিন্ন যোগসূত্র টেনেছেন। আলজাজিরাকে তিনি বলেছেন, বালোগান কাণ্ডের পর আমরা আসলে বুঝতে পারছি না যে, কোনটা বৈধ সিদ্ধান্ত আর কোনটা অবৈধ। আর ট্রাম্প প্রশাসনের তীক্ষ্ন নজরদারির মধ্যে হচ্ছে এবারের বিশ্বকাপ। আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হ্যাভিয়ার মিলেই আবার ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র।
- বিষয় :
- আর্জেন্টিনা
- মিসর
- বিশ্বকাপ ফুটবল