খাসজমিকে ব্যক্তির দেখিয়ে কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ
আমিনুল ইসলাম খান রানা, সিরাজগঞ্জ
প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৫৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এলএ (ভূমি অধিগ্রহণ) শাখায় সরকারি খাসজমিকে ব্যক্তিমালিকানাধীন দেখিয়ে প্রায় ২ কোটি ৭১ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ তুলে নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ভূমি অধিগ্রহণে ঘুষ-কমিশন বাণিজ্য এবং নথি জালিয়াতির অভিযোগও রয়েছে। এসব ঘটনায় প্রশাসনিক তদন্ত শুরু হলেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
সংশ্লিষ্ট নথি, অভিযোগপত্র ও একাধিক ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এলএ শাখার কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং দালালচক্র ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের অর্থ ছাড়ে অনিয়ম করে আসছেন। ক্ষতিপূরণপ্রত্যাশীদের পরিচয়পত্র, দাগ-খতিয়ান বা ভূমি রেকর্ডে সামান্য অসংগতি দেখিয়ে সরকারি ফি ছাড়াও দুই থেকে সাড়ে তিন শতাংশ পর্যন্ত কমিশন আদায় করা হয়। কমিশন না দিলে মাসের পর মাস ফাইল আটকে রাখা হয়।
সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগটি উল্লাপাড়া উপজেলার সলঙ্গা ইউনিয়নের পাঁচিলা মৌজার ৪৭৭ নম্বর দাগের খাসজমিকে ঘিরে। বহু বছর আগে সড়ক ও জনপথ বিভাগের অনুকূলে অধিগ্রহণ করা ওই জমিকে পুনরায় ব্যক্তিমালিকানাধীন দেখিয়ে ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের হাটিকুমরুল ইন্টারচেঞ্জ প্রকল্পের আওতায় দ্বিতীয়বার অধিগ্রহণ দেখানো হয়। এর বিপরীতে প্রায় ২ কোটি ৭১ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ উত্তোলনের অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এলে তদন্ত শুরু হয়।
ক্ষতিপূরণগ্রহীতাদের একাংশের দাবি, শুধু অর্থগ্রহীতাদের নয়, নথি যাচাই, অনুমোদন ও অর্থ ছাড়ের দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকাও তদন্তের আওতায় আনা উচিত। তাঁদের প্রশ্ন, প্রশাসনিক অনুমোদন ছাড়া অর্থ ছাড় হলো কীভাবে?
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, শুধু হাটিকুমরুল ইন্টারচেঞ্জ প্রকল্প নয়, সিরাজগঞ্জ-বগুড়া রেলপথসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণেও একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, দালালদের মাধ্যমে কমিশনের হার নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। টাকা না দিলে ক্ষতিপূরণের প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে।
ধোপাকান্দি মৌজার সহির উদ্দিন অভিযোগ করেন, তাঁর জমির ক্ষতিপূরণ পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে সাবেক এক সার্ভেয়ারের মাধ্যমে ১৫ লাখ টাকা নেওয়া হয়। পরে তাঁকে জানানো হয়, সংশ্লিষ্ট জমির কোনো রেকর্ড তাঁর নামে নেই। তিনি প্রশাসন ও গণমাধ্যমের দ্বারস্থ হয়েছেন।
এদিকে জেলা ভূমি অধিগ্রহণ কার্যালয়ের আরেকটি মামলায় (এলএ কেস নং-০৩/২০২৩-২৪) অভিযোগ রয়েছে, নালিশি সম্পত্তি নিয়ে তদন্ত চলমান থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট দাবিদারকে ভূমি অধিগ্রহণ আইনের ৮ ধারায় ক্ষতিপূরণ গ্রহণের নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
বর্তমান ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা (এলএও) মো. নিয়ামত আলী খান হিমেল বলেন, দুই মাস আগে জালিয়াতির বিষয়টি নজরে আসে। প্রাথমিকভাবে ২ কোটি ১ লাখ টাকা জালিয়াতির মাধ্যমে উত্তোলনের সত্যতা পাওয়া গেছে। সার্টিফিকেট মামলা হওয়ার পর ৭০ লাখ টাকা হয়তো কয়েকজন পরিশোধ করেছেন। এ ঘটনায় প্রশাসনিক তদন্ত, সার্টিফিকেট মামলা এবং প্রয়োজনীয় আইনগত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এলএ কেস নং-০৩/২০২৩-২৪–সংক্রান্ত অভিযোগও খতিয়ে দেখা হবে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) নূর নাহার বেগম বলেন, অভিযোগ নিষ্পত্তির আগে চূড়ান্তভাবে ক্ষতিপূরণের অর্থ পরিশোধ করা হয় না। অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার জেলা প্রশাসনের নয়। তদন্ত প্রতিবেদন বিভাগীয় কমিশনারের মাধ্যমে ভূমি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম বলেন, প্রতিটি অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত হয়েছে।প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের সাসেক-২ প্রকল্পের পরিচালক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (অ্যাডমিন) ড. ওয়ালীউর রহমান বলেন, অধিগ্রহণের অর্থ জেলা প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ক্ষতিপূরণ বিতরণের দায়িত্বও জেলা প্রশাসনের। আগে অধিগ্রহণ করা সরকারি জমি পুনরায় কীভাবে অধিগ্রহণ দেখানো হলো এবং কীভাবে অর্থ ছাড় হলো, তার জবাব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেই দিতে হবে।
বিভাগীয় কমিশনার ও অতিরিক্ত সচিব ড. আ. ন. ম. বজলুর রশীদ বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে অভিযোগ অস্বীকার করে কানুনগো রাকিবুল ইসলাম, শামীম হোসেন, সার্ভেয়ার আমিনুল এবং অবসরপ্রাপ্ত সার্ভেয়ার মমতাজ উদ্দিন দাবি করেছেন, এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন।
ভূমি ব্যবস্থাপনা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, অভিযোগ প্রমাণিত হলে শুধু আর্থিক অনিয়ম নয়; ভূমি প্রশাসনের নথি যাচাই, অনুমোদন ও তদারকি ব্যবস্থার গুরুতর দুর্বলতারও প্রতিফলন। সব পর্যায়ের দায়িত্বশীলদের ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে।
- বিষয় :
- খাসজমি