ঢাকা শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬

`এটা ভাগ্য, এক যোদ্ধা আরেক যোদ্ধার সেবায় নিয়োজিত`

`এটা ভাগ্য, এক যোদ্ধা আরেক যোদ্ধার সেবায় নিয়োজিত`
×

সাহাদাত হোসেন পরশ

প্রকাশ: ১৭ মে ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০

করোনা রোগীদের চিকিৎসার পাশাপাশি মনোবল চাঙ্গা রাখা জরুরি। মনোবল দুর্বল হয়ে পড়লে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। রোগীর মনোবল জাগিয়ে তুলতেও চিকিৎসকদের বড় ভূমিকা রয়েছে। এজন্য আলাদা টিম করে দু'বার রোগীর কাছে গিয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে।
রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের চিকিৎসক মনোয়ার হাসনাত খান ও চিকিৎসক খালেদ মোহাম্মদ ইকবাল গতকাল তাদের এমন অভিব্যক্তির কথা সমকালের কাছে তুলে ধরেন। তারা জানান, 'বর্তমান পরিস্থিতিতে রোগীকে যদি বলা হয়, আপনি ভয় পাবেন না। আমরা আছি আপনার পাশে'- এটা  রোগীর মনোবল অনেক বাড়িয়ে দেবে। চিকিৎসক হিসেবে করোনার সামনের সারির যোদ্ধা হিসেবে চিকিৎসা দিচ্ছি আরেক সামনের সারির যোদ্ধা পুলিশ ভাইদের। তাদের মনোবল যাতে কোনোভাবেই ভেঙে না পড়ে, এটা নিশ্চিত করতে চিকিৎসকরা নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।
ডা. মনোয়ার এ প্রতিবেদককে আরও বলেন, একটি অদৃশ্য শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ করছি। সাধারণত পুলিশের অধিকাংশ সদস্যের ইমিউনিটি বেশ ভালো। শারীরিকভাবে সুস্থ। পুলিশের যারা করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের ৯০ শতাংশের শরীরে অন্য কোনো জটিল রোগ নেই। এজন্য পুলিশে দুই হাজারের বেশি আক্রান্ত হলেও মৃতের হার অনেক কম। সুস্থ হওয়ার হারও বেশি।
ডা. মনোয়ার হোসেন বলেন, করোনা রোগীর সুস্থ হওয়ার ক্ষেত্রে চিকিৎসার পাশাপাশি মোটিভেশন গুরুত্বপূর্ণ। করোনা মোকাবিলার জন্য একটা ন্যাশনাল গাইডলাইন রয়েছে। সেটা সবার মেনে চলা উচিত। পুলিশে যারা আক্রান্ত হচ্ছেন, তাদের জন্য প্রতিনিয়ত ভালো খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে। চিকিৎসকরা প্রতিদিন রোগীর খোঁজ নিচ্ছেন। পুলিশের একটি বিশেষ টিম রয়েছে, যারা রোগীর মনোবল চাঙ্গা রাখতে নিয়মিত তাদের ভালো-মন্দের খবর নিচ্ছেন। রোগীর সঙ্গে এই যোগাযোগ রাখা খুব জরুরি। নতুবা রোগী মনোবল হারিয়ে ফেলেন। আমাদের অনেক সহকর্মীর  মোবাইল নম্বর প্রত্যেক ফ্লোরে দেওয়া আছে। বলা হয়েছে, কেউ অসুস্থতা বোধ করলেই যেন ফোন করেন। চিকিৎসক-নার্স সঙ্গে সঙ্গে চলে যাবেন। আর যারা ডিউটিতে রয়েছেন সেসব ডাক্তার-নার্স তো রয়েছেনই।
ডা. মনোয়ার আরও বলেন, পুলিশের প্রত্যেক রোগীর চিকিৎসার ব্যাপারে হাসপাতালের পরিচালক খোঁজ নেন। এটা পুলিশ মহাপরিদর্শককে প্রতিদিন অবহিত করা হয়। এই হাসপাতালে এখন কোনো কিছুর ঘাটতি নেই। কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতাল আড়াইশ' শয্যার। রোগীর চাপের কারণে রাজধানীর উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজ, হোটেল আরামবাগ, রাজারবাগ স্কুল অ্যান্ড কলেজ, বিজয়নগর হোটেল, ডিটেকটিভ ট্রেনিং স্কুল, ডিএমপির ট্রাফিক ব্যারাক ও ইমপালস হাসপাতালে করোনা আক্রান্ত পুলিশ সদস্যদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে কনসালট্যান্ট, চিকিৎসকের সংখ্যা ৭০। নার্স রয়েছেন ৬০ জন। এখন পর্যন্ত এখানকার ছয় ডাক্তার ও সাত নার্স করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। দু'জন চিকিৎসক সুস্থ হয়েছেন। অন্যরা ভালোর দিকে। এখন পর্যন্ত পুলিশ হাসপাতাল দেড় হাজার করোনা রোগীকে সামলেছে। শুরু থেকেই স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষার বিষয়ে কর্তৃপক্ষ মনোযোগী হওয়ায় এই হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সদের করোনায় আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা কম। এখন এক হাজার করোনা আক্রান্ত পুলিশ সদস্যের রাজারবাগের কেন্দ্রীয় হাসপাতালের আওতায় চিকিৎসা চলছে।
কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের আরেক চিকিৎসক খালেদ মোহাম্মদ ইকবাল। তিনি কার্ডিওলজি বিভাগের প্রধান হিসেবে সেখানে কর্মরত। ডা. ইকবাল জানান, তিনটি গ্রুপে ভাগ হয়ে তারা পুলিশ হাসপাতালে চিকিৎসা দিচ্ছেন। একেক টিম ১০ দিন ধরে দায়িত্ব পালন করে আসছে। দিনে দু'বার রোগীর ওয়ার্ডে যাওয়া হয়। এতে রোগীর আত্মবিশ্বাস ও আস্থা বাড়ে।
ইকবাল আরও বলেন, প্রতিদিন কোনো রোগীকে যখন ডাক্তার গিয়ে জিজ্ঞেস করেন- 'আপনি কেমন আছেন? তখন রোগী অনেক খুশি হন। মনোবল চাঙ্গা হয়। আমরা এখানে রোগীর মধ্যে আস্থা ফেরানোটাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। পুলিশে শত শত আক্রান্ত। এখন পর্যন্ত আটজন মারা গেছেন। তার মধ্যে দু'জন হাসপাতালে আসার আগেই মারা যান।
ডা. ইকবাল আরও জানান, ১০ দিন হাসপাতালে কাজ করার পর  স্বাস্থ্যকর্মীরা তাদের নিজেদের করোনা টেস্ট করান।  ফল নেগেটিভ হলে আনন্দিত হন। এরপর ১৪ দিনের জন্য কোয়ারেন্টাইনে থাকেন। আবার তারা কাজে যোগ দেন। রোগী সুস্থ হয়ে হাসিমুখে বাড়ি ফিরছে এই দৃশ্য দেখাটাই ডাক্তার হিসেবে সবচেয়ে বড় তৃপ্তির এবং আনন্দের বলে মন্তব্য করেন তিনি।

 
 

 
 

আরও পড়ুন

×