নিরাপদ চলাচল
ভরসা দিচ্ছে দুই চাকার যান
করোনা পরিস্থিতিতে চলাচলের নিরাপদ বাহন হিসেবে চাহিদা বাড়ায় বাইসাইকেল কিনতে দোকানে ভিড় করছেন অনেকে। শনিবার রাজধানীর বংশাল থেকে তোলা ছবি - কাজল হাজরা
সাহাদাত হোসেন পরশ
প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ১৩ জুন ২০২০ | ১৫:৩৫
'করোনা আসার আগে কখনও বাসে, কখনও-বা টেম্পোতে মালিকের বাসায় যাতায়াত করতাম। কিন্তু এখন করোনার মধ্যে সেসবে চলাফেরায় ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক বেশি। তার ওপর ভাড়াও বেড়েছে। কয়েকদিন হলো তাই নিজের সাধ্যের মধ্যে পাঁচ হাজার টাকায় একটা সাইকেল কিনে নিয়েছি। সাইকেলে করে কাজে যাচ্ছি, ফিরে আসছি। ভাইরাসের ঝুঁকি একেবারেই কমে এসেছে, আবার যাতায়াতের খরচও হচ্ছে না।'
বললেন ভাসানটেকের ইব্রাহিম হোসেন। মিরপুর ১০ নম্বরের এক বাসার মালিকের প্রাইভেট কার চালকের কাজ করেন তিনি। নিজের বাসা থেকে প্রতিদিন এখন পাঁচ কিলোমিটার দূরে কর্মস্থলে সাইকেল নিয়েই আসা-যাওয়া করছেন ইব্রাহিম।
যাতায়াতে যুগ যুগ ধরেই বিশ্বব্যাপী পরিবেশবান্ধব আর নিরাপদ বাহন হিসেবে পরিচিত বাইসাইকেল। একবার খরচ করে কেনার পর দুই চাকার এই বাহনের জন্য আর খুব বেশি খরচ করতে হয় না। করোনার এমন সংকটকালীন পরিস্থিতিতে সাইকেল আবারও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে। বিশেষ করে নিম্ন মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের কাছে। করোনার ঝুঁকি এড়াতে এবং ব্যয়কে সীমিত রাখতে সাইকেলই ভরসা তাদের।
অতএব সাইকেলের বাজার ক্রমেই জমজমাট হয়ে উঠছে এখন। তবে করোনার সংকট কাটলে সাইকেলের বাজার আরও জমবে বলে আশাবাদী এ খাতের ব্যবসায়ীরা। কারণ যারা সাইকেল চালাতে শুরু করেছেন, তাদের কথাবার্তা থেকে অনেকেই উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। যদিও রাজধানীসহ দেশের বড় কোনো শহরে সাইকেল চালানোর স্বতন্ত্র লেন নেই। তাই সড়কে নিরাপত্তার ঝুঁকি নিয়েই সাইকেল চালাতে হয়। তবে করোনা পরিস্থিতির কারণে অনেক রাস্তা এখনও অপেক্ষাকৃত ফাঁকা। তা ছাড়া করোনা সংক্রমণের আগে থেকেই সাইকেলবান্ধব বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে স্বতন্ত্র লেনের দাবি উঠতে শুরু করেছিল- ভবিষ্যতে যা আরও জোরদার হবে এবং কার্যকরও হবে বলে আশা করা যায়।
সাইকেল চালাচ্ছেন, এমন একজন সংবাদমাধ্যম কর্মী আহমুদুল হাসান আশিক। তিনি বলেন, আগে মোটরসাইকেল চালাতাম। এখন যাতায়াতে সাইকেলই ভরসা। ব্যায়ামটা হয়ে যায়, ব্যয়ও নেই বলতে গেলে। দূষণমুক্ত এই যান নিয়ে দিন ভালোই কাটছে তার।
রাজধানীর ১০ নম্বরে বিএফসিতে কাজ করেন মো. রুবেল। করোনার এমন সময়ে নিয়মিত সাইকেল চালিয়ে কর্মস্থলে আসা-যাওয়া করছেন তিনি।
বাংলাদেশ বাইসাইকেল মার্চেন্ট অ্যাসেম্বলিং অ্যান্ড ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিবিএমএআইএ) সভাপতি সাইদুল ইসলাম মন্টি সমকালকে বলেন, 'ধীরে ধীরে দেশে সাইকেলের বাজার বড় হচ্ছে। যাতায়াতে করোনার ঝুঁকি এড়াতে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশে সাইকেলের কদর আরও বাড়বে। তবে দেশে সাইকেল নির্বিঘ্নে চালানোর মতো নিরাপদ সড়কের অভাব রয়েছে।'
বিএমএআইএর সাধারণ সম্পাদক ও 'সাইকেল হেভেন'-এর কর্ণধার হাদিবুল ইসলাম জাহিদ জানান, নতুন নতুন পেশাজীবী সাইকেল কেনার দিকে ঝুঁকছে। দেশি সাইকেলের ওপরেও আস্থা বেড়েছে মানুষের।
এদিকে মেঘনা ও আরএফএল ছাড়াও জার্মান বাংলা, আলিটা ও করভো নামের প্রতিষ্ঠান দেশেই সাইকেল তৈরি করছে। ঢাকা, গাজীপুর ও চট্টগ্রামে এসব প্রতিষ্ঠান রপ্তানিমুখী সাইকেল তৈরির কারখানা করেছে। গত অর্থবছরে তারা প্রায় সাড়ে সাত লাখ পিস সাইকেল রপ্তানি করেছে; যা থেকে মোট আয় আট কোটি ৪২ লাখ ডলার।
১৯৯৬ সালে সরকারি সাইকেল তৈরির একটি কারখানা কিনে নেয় মেঘনা গ্রুপ এবং এ খাতে প্রথম বেসরকারি উদ্যোক্তা হিসেবে কার্যক্রম শুরু করে। মেঘনার তৈরি একেকটি বাচ্চাদের সাইকেলের দাম সাড়ে তিন হাজার থেকে সাত হাজার টাকা। বড়দের সাইকেলের দাম সাড়ে পাঁচ হাজার থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত। 'সাইকেল লাইফ' ও 'সাইকেল লাইফ এক্সক্লুসিভ' নামে পৃথক দুটি বিক্রয় কেন্দ্র রয়েছে মেঘনার। ২০১৪ সালে হবিগঞ্জে উৎপাদন কারখানা স্থাপন করে দুরন্ত ব্র্যান্ড নিয়ে সাইকেলের বাজারে আসে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ।
বিভিন্ন কোম্পানির তৈরি সাইকেল অনলাইনেও কেনা যায়। আবার পুরোনো সাইকেল কেনাবেচার জন্যও অনলাইনে একাধিক সাইট রয়েছে।
বিবিএমএআইএর তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর পুরান ঢাকায় বংশালে দুই শতাধিক বাইসাইকেল বিক্রির দোকান রয়েছে। সারাদেশে সাড়ে চার হাজার খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বর্তমানে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও রংপুর মিলে দেশের অন্তত ৭৫ আমদানিকারক বিদেশ থেকে সাইকেল আনছেন।
এক সময় দেশে ফনিক্স ও হিরো ব্র্যান্ডের সাইকেল বেশ জনপ্রিয় ছিল। এখন দেশীয় আরও কিছু প্রতিষ্ঠানের সাইকেলের দিকেও ঝুঁকছে তরুণরা। ফনিক্স, ফক্সস্টার, কম্বেটসহ বিভিন্ন চাইনিজ ব্র্যান্ডের সাইকেলের দাম সাত থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত।
রাজধানীসহ দেশের অনেক বড় শহরে একাধিক সাইক্লিস্টের দল রয়েছে। তারা বিভিন্ন সময় দলবদ্ধ হয়ে দেশের নানা প্রান্তে ঘুরতে যায়। বিশেষ করে ছুটির দিনে তারা সাইকেল নিয়ে ঘুরতে বের হয়। বিভিন্ন দিবস এবং মধ্যরাতেও দলবেঁধে সাইকেল চালায় তারা। তরুণদের মধ্যে সাইকেল জনপ্রিয় করতে এসব সাইক্লিস্টের বড় ভূমিকা আছে।
গত পাঁচ বছরে দেশে সাইকেলের চাহিদা বেড়েছে তিনগুণ। ২০১৪ সালে বার্ষিক চাহিদা ছিল পাঁচ লাখ পিস। এখন তা ৬০ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ২০ লাখ। টাকার হিসাবে বাজারের আকার এক হাজার ২০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। স্থানীয় বাজারের ৩০ শতাংশ জোগান দিচ্ছে দেশি ব্র্যান্ডগুলো। যদিও ২০১০ সাল পর্যন্ত এ বাজারের পুরোটাই ছিল আমদানিনির্ভর।
- বিষয় :
- নিরাপদ চলাচল
- দুই চাকার যান
- করোনা পরিস্থিতি