ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

‘শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট আচরণে কোটা সংস্কার আন্দোলন বৈষম্যবিরোধীতে পরিণত হলো, কিন্তু বৈষম্য তো রয়ে গেছে’

‘ইতিহাসের ভেতরে থেকেই আবদুল মতিন তা বদলের চেষ্টা করেছিলেন’
×

ভাষাসংগ্রামী আবদুল মমতিনের ৯৮তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভা। ছবি: সমকাল

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২২ ডিসেম্বর ২০২৪ | ০২:১২ | আপডেট: ২২ ডিসেম্বর ২০২৪ | ০২:১৫

ভাষাসংগ্রামী আবদুল মতিন সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, ইতিহাস মানুষই তৈরি করে। কিন্তু মানুষ ইতিহাসের ভেতরে থেকেই সেই তৈরির কাজটা করে। ইতিহাসের বাইরে যাওয়া সম্ভব হয় না। ভাষাসংগ্রামী আবদুল মতিন এই ইতিহাসের ভেতরে থেকেই তা বদলানোর চেষ্টা করেছিলেন।

শনিবার বিকেলে রাজধানীর রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। আবদুল মতিনের ৯৮তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ‘বিজ্ঞান চেতনা পরিষদ’ এর আয়োজন করে।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, মতিন উপলব্ধি করেছিলেন যে, পাকিস্তানের রাষ্ট্রব্যবস্থা পুঁজিবাদের দিকে যাচ্ছে। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ কার্জন হলে যে বক্তৃতা দিয়েছিলেন, তাতে দুইটি অংশ ছিল। একটা অংশে তিনি উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার কথা বলেন। তখন মতিন ভাই সর্বপ্রথম এর বিরোধিতা করেন। তখন জিন্নাহ কিছুক্ষণের জন্য চুপ হয়ে যান। এরপর তিনি আরেকটা প্রসঙ্গে চলে যান। সেই প্রসঙ্গটা অনেক তাৎপর্যপূর্ণ। সেই প্রসঙ্গে তিনি বলেন যে, পাকিস্তান সবার জন্য সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। এসময় তিনি একজন কেরানির এক বছরের মাথায় বেতন দ্বিগুণ হওয়ার উদাহরণ দেন। অর্থাৎ জিন্নাহ সবাইকে আত্মকেন্দ্রিক হতে বললেন। পুঁজিবাদী হওয়ার আহ্বান জানালেন। তিনি একটা জাতি তৈরি করতে চেয়েছিলেন। তিনি নিজে উর্দুভাষী না হয়েও, এই ভাষার ভিত্তিতে একটি জাতি গঠনের চেষ্টা করেছিলেন। একইসঙ্গে তিনি পাকিস্তানকে একটা পুঁজিবাদী আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গঠন করতে চেয়েছিলেন। এর মধ্য দিয়ে ব্যবসায়ী ২২ পরিবার বিকশিত হলো। এর মধ্যে পূর্ববঙ্গে মাত্র একটা পরিবার ছিল। সেই ২২ পরিবারের মধ্যে এক পরিবারের ইন্সুরেন্স কোম্পানিতে শেখ মুজিবুর রহমান এই অঞ্চলের ম্যানেজার ছিলেন। এই দেশকে একটা অভ্যন্তরীণ উপনিবেশ বানাতে চেয়েছিলো পশ্চিম পাকিস্তান।

তিনি বলেন, পুঁজিবাদ এখন দৌরাত্ম করছে, নৃশংস আকার ধারণ করেছে। একইসঙ্গে পুঁজিবাদ একটা ফ্যাসিবাদী চরিত্র ধারণ করেছে। পুঁজিবাদ যখন ফ্যাসিবাদী চরিত্র ধারণ করে, তখন তা মানুষের কণ্ঠ রোধ করতে চায়। গণতন্ত্রকে পদদলিত করে। মানুষের সব অধিকার কেড়ে নেয়। আমাদের তরুণরা কোটা সংস্কারের জন্য বিদ্রোহ করেছিল। সেই কোটা সংস্কার আন্দোলন কীভাবে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে পরিণত হয়েছে, তা আমরা দেখেছি। এই আন্দোলন এত বড় হতো না, যদি না শেখ হাসিনা সরকার ফ্যাসিস্ট আচরণ করতো। তাদেরই কারণে এই আন্দোলন বৈষম্যবিরোধী নামে পরিচিত হলো। কিন্তু বৈষম্য তো রয়ে গেছে। পুঁজিবাদের সংকট সামনে আরও বাড়বে। আমরা যেন আশা করি যে, নতুন সরকার এসে দুধ ও মধুর বন্যা বইয়ে দেবে। সেটা মোটেও সম্ভবপর নয়। এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থা আরও কঠিন হবে।

অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন দৈনিক সমকালের উপদেষ্টা সম্পাদক আবু সাঈদ খান, বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের কেন্দ্রীয় সদস্য অধ্যাপক ডা. হারুন-উর-রশীদ, বিজ্ঞান লেখক এম. এ. আজিজ মিয়া এবং আবদুল মতিনের মেয়ে মালিহা শুভন। ‘ভাষা আন্দোলনে আবদুল মতিনের ভূমিকা এবং রাজনীতি’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিজ্ঞান চেতনা পরিষদের যুগ্ম-আহ্বায়ক কবি মোহাম্মদ আলী। স্বাগত বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ড. হারুন রশীদ। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বিজ্ঞান চেতনা পরিষদের আহ্বায়ক আব্দুল কাদের।

অনুষ্ঠানে আবু সাঈদ খান বলেন, আবদুল মতিনের জীবনে দুইটি অধ্যায় রয়েছে। একটা হলো- ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ, আরেকটি হলো- তার রাজনৈতিক সংগ্রাম। ভাষা আন্দোলনে তিনি যে দৃঢ়তা দেখিয়েছেন, তা আলোচিত হয়েছে। জিন্নাহর মুখের ওপর ‘না না’ বলার যে ধ্বনি উঠেছিলো, সেখানে তিনি ছিলেন অগ্রগণ্য। ভাষা আন্দোলনের পর অনেকে ঘরে ফিরে গেছেন, পেশায় ফিরে গেছেন। কিন্তু আবদুল মতিন ঘরে ফেরেননি। এমনকি কোনো পেশাকেও গ্রহণ করেননি। তিনি কৃষকের জীবনের সঙ্গে নিজেকে মিলিয়েছিলেন। 

মূল প্রবন্ধে মোহাম্মদ আলী ভাষাসংগ্রামী আবদুল মতিনের পারিবারিক জীবন, ভাষা আন্দোলনে ভূমিকা, রাজনৈতিক আদর্শ ও সংগ্রাম তুলে ধরেন। ভাষাসংগ্রামী আবদুল মতিনের পারিবারিক জীবন, ভাষা আন্দোলনে ভূমিকা, রাজনৈতিক আদর্শ ও সংগ্রাম তুলে ধরেন।

স্মৃতিচারণ করে মালিহা শুভন বলেন, ছাত্র বয়সেই ভাষা আন্দোলনে আবদুল মতিন ভূমিকা রেখেছিলেন। তবে ছোটবেলা থেকেই আমি তাকে কমরেড ও বিপ্লবী নেতা হিসেবে জানতাম। পরে জানতে পারি তিনি একজন ভাষা সৈনিক। ছোটবেলা থেকেই তিনি প্রতিবাদী ছিলেন। তার কাছে মানুষই ছিলো সব।

আরও পড়ুন

×