ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ, পুলিশ কমিশন গঠনে ঐকমত্য

প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ, পুলিশ কমিশন গঠনে ঐকমত্য
×

.

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৫ | ০১:৩০

| প্রিন্ট সংস্করণ

সংসদের উচ্চকক্ষের নির্বাচন পদ্ধতি, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতাসহ কয়েকটি বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ব্যাপক মতবিরোধ থাকলেও আজ সোমবারের মধ্যে সংস্কারের জুলাই সনদের খসড়া প্রণীত হবে। গতকাল রোববার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে ১৯তম দিনের সংলাপে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ এ কথা জানিয়েছেন। 
তিনি বলেছেন, দলগুলোকে সোমবার সনদের খসড়া দেবে কমিশন। এরপর এতে মতামত দেবে দলগুলো। গতকাল সকাল সাড়ে ১০টায় শুরু হয়ে তিন অধিবেশনে প্রায় রাত ১০টা পর্যন্ত চলে সংলাপ। এতে স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনে একমত হয়েছে দলগুলো। এক ব্যক্তি ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারবেন না– এ প্রস্তাবেও শর্ত সাপেক্ষে ঐকমত্য হয়েছে। বিএনপি এবং সমমনা দলগুলো জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা যদি খর্ব করা না হয়, তবে তারা মেয়াদ নির্ধারণের প্রস্তাবে রাজি। 

এদিন সংবিধান এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি, নারী আসনে নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হলেও ঐকমত্য হয়নি। বিএনপি প্রস্তাব করে, আসন্ন নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলো অন্তত ৫ শতাংশ আসনে নারীদের মনোনয়ন দেবে। পরের নির্বাচনে ১০ শতাংশ আসনে নারীদের মনোনয়ন দিতে হবে। এ প্রস্তাব নিয়ে তৃতীয় অধিবেশনে আলোচনা হলেও সিদ্ধান্ত হয়নি। 
বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ অধিকাংশ দল মূলনীতিতে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস’ ফিরিয়ে আনতে চায়। তবে সিপিবি, বাসদ, বাংলাদেশ জাসদসহ বামপন্থি দলগুলোর দাবি, মূলনীতিতে ধর্মনিরপেক্ষতা বহাল রাখতে হবে। বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি মূলনীতিতে ‘ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি’ অন্তর্ভুক্ত করতে রাজি হয়েছে। সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচারকে মূলনীতিতে যুক্ত করতে রাজি হয়েছে দলগুলো। 

সনদের খসড়ায় মতামত দেবে দলগুলোজুলাই সনদে থাকবে– কী কী সংস্কার হবে। এতে সই করবে দলগুলো। চলতি মাসের মধ্যে এই সনদ প্রণয়নের কথা। আলী রীয়াজ বলেছেন, সনদের প্রাথমিক খসড়া তৈরি হয়েছে। মতামত দিতে সোমবারের (আজ) মধ্যে দলগুলোকে তা দেওয়া হবে। 
খসড়া নিয়ে সংলাপে আলোচনা হবে কিনা– এ প্রশ্নে আলী রীয়াজ বলেন, যদি বড় রকমের মৌলিক আপত্তি ওঠে, তাহলে আলোচনায় আনব। ১০টি সংস্কার প্রস্তাবে ঐকমত্য হয়েছে। সাতটি বিষয় অসমাপ্ত। ৩টি বিষয়ে আলোচনা হয়নি। 

গতকাল প্রথম আলোচনা হয় মূলনীতি নিয়ে। আলী রীয়াজ জানান, এ বিষয়ে চতুর্থ দিনের আলোচনায় ঐকমত্য হয়নি। দ্বিতীয় আলোচ্য বিষয় ছিল ‘বাংলাদেশ পুলিশ কমিশন’ গঠন। এতে সবাই একমত।  কমিশন হবে স্বাধীন, ৯ সদস্যবিশিষ্ট এবং এর কাঠামো, দায়িত্ব ও এখতিয়ার আইনের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। কমিশনের চেয়ারম্যান হবেন আপিল বিভাগের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি। সদস্যদের মধ্যে কমপক্ষে দুইজন নারী থাকবেন। সরকারি ও বিরোধী দলেরও প্রতিনিধি থাকবেন। 
আলী রীয়াজ বলেছেন, কমিশনের উদ্দেশ্য হবে পুলিশ বাহিনীর পেশাদারিত্ব ও প্রভাবমুক্তভাবে দায়িত্ব পালনের নিশ্চয়তা, বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের নিষ্পত্তি এবং নাগরিকদের পক্ষ থেকে পুলিশের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের নিষ্পত্তি। পুলিশের বেআইনি কার্যকলাপের ক্ষেত্রে শাস্তির মাত্রা নির্ধারণ ও বাস্তবায়নের নির্দেশ দিতে পারবে কমিশন। 
তৃতীয় আলোচ্য বিষয় ছিল প্রধানমন্ত্রী পদে মেয়াদের সীমা। আলী রীয়াজ জানান, রাজনৈতিক দলগুলো সর্বসম্মতভাবে একমত– একজন ব্যক্তি জীবনে ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারবেন না। 
আলী রীয়াজ জানান, ঐকমত্য কমিশন প্রস্তাব করেছিল, বিদ্যমান ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসন বহাল রেখে সরাসরি নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলগুলো যেন অন্তত ২০ শতাংশ আসনে নারী প্রার্থীদের মনোনয়ন দেয়। তবে এ বিষয়ে ঐকমত্য হয়নি। 

নারী আসনে বিএনপির প্রস্তাব, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদে শর্ত
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দীন আহমেদ বলেছেন, ‘আমরা একবার বলেছি, ১০ বছরের বেশি কোনো ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী পদে বহাল থাকবেন না। তবে সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের কমিটি থাকলে বিষয়টি মানব না। নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনে সাংবিধানিক কমিটি গঠন সংবিধানে যুক্ত করতে রাজি বিএনপি। এর বাইরে আলোচনা হলে আমাদের শর্ত বহাল থাকবে।’
বিএনপি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), সরকারি কর্মকমিশন (পিএসসি), ন্যায়পাল, মহা হিসাব নিরীক্ষক পদে নিয়োগে সাংবিধানিক কমিটি চায় না। আইনের মাধ্যমে সরকারের হাতে নিয়োগের ক্ষমতা রাখতে চায়। দলটি বলেছে, এসব পদের নিয়োগেও সাংবিধানিক নিয়োগ কমিটি করা হলে প্রধানমন্ত্রীর পদের মেয়াদ মানবে না। প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা খর্বের বিপক্ষে যুক্তি দিয়ে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং স্বাধীন ইসির অধীনে নির্বাচন হলে আর স্বৈরতন্ত্র ফিরবে না।  

বিএনপি গতকালের আলোচনায় প্রস্তাব করেছে, আগামী সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলগুলো অন্তত ৫ শতাংশ আসনে নারী প্রার্থী দেবে, যা পরের নির্বাচনে বৃদ্ধি করে ১০ শতাংশ করা হবে। 
নারী আসন বৃদ্ধিতে একমত জামায়াতের দাবি, নারী আসন রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাত (পিআর) পদ্ধতিতে বণ্টন করতে হবে। এনসিপি সরাসরি নির্বাচন চায়। সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ঐকমত্য কমিশনকে বলেছেন, নারীদের জন্য সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা রাখতে হবে। সংরক্ষিত আসনে নারীর ক্ষমতায়ন হয়নি। 
এ নিয়ে আলোচনার মধ্যে রোববার বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ দলটির নতুন প্রস্তাব সম্পর্কে সাংবাদিকদের জানান, সংরক্ষিত নারী আসন ৫০ থাকবে। তবে অন্তত ৫ শতাংশ আসনে নারী প্রার্থী দেবে দলগুলো। যেহেতু আসন্ন নির্বাচনে সংবিধান সংশোধিত হচ্ছে না সংসদ না থাকায়, তাই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ‘জেন্টেলম্যান এগ্রিমেন্ট’-এর মাধ্যমে ৩০০ আসনের ৫ শতাংশ অর্থাৎ ১৫টি আসনে নারীদের সরাসরি নির্বাচনের জন্য মনোনয়ন দেওয়া হবে। যখন সংবিধান সংশোধন হবে, তখন ১০ শতাংশ আসনে নারীদের মনোনয়নের বিধান রাখা হবে। 
সরাসরি নির্বাচনের বিরোধিতা করে সালাহউদ্দিন বলেছেন, ৫০টি সংরক্ষিত এবং ১০ শতাংশ আসনে মনোনয়নসহ নারী এমপির সংখ্যা ৮০তে উন্নীত হবে। এভাবে যদি সমাজের অগ্রগতি লক্ষ্য করা যায়, তাহলে পরবর্তী সংসদে সরাসরি নির্বাচনের বিধান আরও সম্প্রসারণ করা যাবে। 

রাষ্ট্রের মূলনীতির আলোচনায় উত্তেজনা
বামপন্থি দলগুলো বিদ্যমান জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার সঙ্গে কমিশন প্রস্তাবিত ‘সাম‍্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার, গণতন্ত্র এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি’ যুক্ত করার পক্ষে। সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দিলে সংলাপ বয়কটের হুঁশিয়ারি দেয় সিপিবি, বাসদ, বাসদ-মার্কসবাদী ও বাংলাদেশ জাসদ। 
মধ‍্যাহ্নভোজের বিরতিতে সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স সাংবাদিকদের বলেন, সংবিধানের মূলনীতির প্রশ্নে ঐকমত্য হওয়া সম্ভব না। কারণ এখানে বিভিন্ন আদর্শের মানুষ আছে। এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে জনগণ। রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের কাছে যাবে; তারা সিদ্ধান্ত দেবে। 
সিপিবি সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেছেন, সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত চার মূলনীতি পরিবর্তনের কোনো ইঙ্গিত জাতির সামনে প্রকাশিত করা হলে সেটার সঙ্গে আমরা একেবারেই নেই। 

জামায়াত মূলনীতিতে আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস চায় জানিয়ে দলটির নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, বামপন্থিরা শক্ত করে বলে, কিন্তু আমরা নীরব থাকি। আমরা শক্ত করে বললে এখানে বিষম ব্যাপার হবে। তাই তাদেরও সংযত হওয়া দরকার। 
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান বলেন, কমিশন প্রস্তাবিত সংবিধানের মূলনীতিতে গণতন্ত্র, সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মতো বিষয়গুলো পরবর্তী সংসদে পাস হবে।

এনসিপির সদস‍্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, আমাদের দলীয় অবস্থান– পূর্বের মূলনীতিসহ সবকিছু বাতিল করা। স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন বিষয়ে এনসিপিসহ সব দল একমত। 
সালাহউদ্দিন বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির ক্ষেত্রে কমিশনের প্রস্তাবে আমরা একমত হয়েছি। রাষ্ট্র পরিচালনা মূলনীতির ক্ষেত্রে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে উল্লিখিত বিষয়গুলো সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক, ন্যায়বিচার; তার সঙ্গে গণতন্ত্র, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি– এই বিষয়গুলো যুক্ত করার কথা বলেছি। পঞ্চম সংশোধনীতে গৃহীত আল্লাহর উপর আস্থা ও বিশ্বাস ফেরাতে হবে। 

নির্বাচন নিয়ে নেতারা যা বলেন
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এইচএম হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন, নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা কিছু বলেননি। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে তাঁর সাম্প্রতিক বৈঠক নির্বাচন নিয়ে নয়।
জামায়াতের রফিকুল ইসলাম বলেন, সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব বিষয়ে কমিশনের প্রস্তাব– অন্তত ২০ শতাংশ আসনে নারীদের সরাসরি মনোনয়ন দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে জামায়াত পিআর পদ্ধতি অনুসরণের পক্ষে।
আখতার হোসেন বলেছেন, ‘সব দলের সঙ্গে আলোচনা না করে নির্বাচনের তারিখ সুনির্দিষ্ট বা খোলাসা করা যাবে না। এর আগে জুলাই সনদ ঘোষণা করতে হবে। নিশ্চিত হতে হবে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড। বাহাত্তরের মূলনীতিগুলো বাদ দিতে হবে।’
সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, নির্বাচন নিয়ে ইসিকে যখন প্রধান উপদেষ্টা আনুষ্ঠানিকভাবে বলবেন, তখনই তা ধর্তব্যের মধ্যে আসবে। 

 

আরও পড়ুন

×