ঢাকা শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

জেকেজির উত্থানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসাধু চক্র

জেকেজির উত্থানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসাধু চক্র
×

আতাউর রহমান

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২০ | ১২:০০

চলতি বছরের মার্চ মাসের আগে জোবেদা খাতুন হেলথ কেয়ার (জেকেজি) নামের কোনো 'স্বেচ্ছাসেবী স্বাস্থ্যসেবা' প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বই জানা ছিল না কারও। করোনাভাইরাসের সংকটকে পুঁজি করে হঠাৎ করেই উত্থান হয় নিবন্ধনহীন এই প্রতিষ্ঠানের। করোনার নমুনা সংগ্রহের লাইসেন্সও পেয়ে যায় তারা। কীভাবে ভুঁইফোঁড় এ প্রতিষ্ঠানটি এমন স্পর্শকাতর কাজের অনুমতি পেল- সে বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
ডিবি কর্মকর্তারা বলছেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি অসাধু চক্র জেকেজির মতো অবৈধ প্রতিষ্ঠানকে করোনার নমুনা সংগ্রহের কাজ পাইয়ে দিয়েছিল। চক্রটি জেকেজিকে হাজার হাজার পিপিইসহ নানা সরঞ্জাম দিয়ে গেছে। বিনিময়ে তারা আর্থিকভাবে লাভবানও হয়েছে। পাশাপাশি এ কাজ পেতে প্রভাব খাটিয়েছিলেন জেকেজির চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরী এবং প্রধান নির্বাহী আরিফুল হক চৌধুরী। ডিবির রিমান্ডে তারা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ওই চক্রের সঙ্গে জড়িত বেশ কয়েকজনের নামও বলেছে। ডিবি এসব তথ্য যাচাই করছে।
জানা যায়, বুথের মাধ্যমে বিনামূল্যে করোনার নমুনা সংগ্রহের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গত মার্চে জেকেজির সঙ্গে চুক্তি করে। চুক্তি অনুযায়ী পরের মাস থেকেই প্রতিষ্ঠানটি দেশের বিভিন্ন এলাকায় বুথ বসিয়ে নমুনা সংগ্রহ করা শুরু করে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি টাকার বিনিময়ে নমুনা সংগ্রহ ও টেস্ট রিপোর্ট দেওয়া শুরু করে। ওই ঘটনায় রাজধানীর এক ব্যক্তি তেজগাঁও থানায় মামলা করলে ২৩ জুন পুলিশ আরিফসহ প্রতিষ্ঠানটির পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে। পাশাপাশি জেকেজি অফিস থেকে ল্যাপটপসহ নানা আলামত জব্দ করে। এসব যাচাইয়ে টেস্ট ছাড়াই প্রতিষ্ঠানটি ভুয়া করোনা রিপোর্ট বিক্রি করার প্রমাণ পায় পুলিশ। দুই কর্মী ভুয়া রিপোর্ট বিক্রির কথা জানিয়ে আদালতে স্বীকারোক্তিও দেন। অপকর্মের কথা স্বীকার করেন আরিফও। এরপর গত ১২ জুলাই পুলিশ ডা. সাবরিনাকে গ্রেপ্তার করে। মামলার তদন্তভার ডিবির কাছে গেলে সংস্থাটি তাকে প্রথম দফায় তিন দিনের রিমান্ডে নেয়। কারাগার থেকে রিমান্ডে এনে চিকিৎসক স্ত্রীর মুখোমুখি করা হয় আরিফকে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) যুগ্ম কমিশনার মাহবুব আলম সমকালকে বলেন, আরিফ থানা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে দাবি করেছিলেন ভুয়া টেস্টে জড়িত থাকায় তিনি তার স্ত্রী ও জেকেজির চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনাসহ কয়েকজনকে প্রতিষ্ঠান থেকে বের করে দিয়েছেন। কিন্তু সাবরিনা তা অস্বীকার করেছেন। শেষ পর্যন্ত দু'জনকে রিমান্ডে মুখোমুখি করা হলে একজন আরেকজনের ওপর দোষ চাপান। সাবরিনা প্রতিষ্ঠানটির কেউ নন বলে দাবি করলেও তিনি যে সেখান থেকে বেতন নিতেন, সেই নথি তাকে দেখানো হলে চুপ করে যান।
ডিবি কর্মকর্তা মাহবুব বলেন, জেকেজির কোনো ধরনের লাইসেন্স ছিল না। এরপরও তারা কীভাবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে চুক্তি করল- সে বিষয়ে দু'জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তারা জানিয়েছেন, লাইসেন্স না থাকার বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানত। এ বিষয়ে আরও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডা. সাবরিনাকে নতুন করে দু'দিনের হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
আরিফ-সাবরিনাকে জিজ্ঞাসাবাদে যুক্ত ডিবির সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, সাবরিনা জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের একজন সরকারি চিকিৎসক হওয়া সত্ত্বেও অনৈতিকভাবে বেসরকারি জেকেজির শীর্ষ পদে বসেন। ওই পদের পরিচয়েই তিনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন। তার স্বামী সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিজের ঘনিষ্ঠতার ভুয়া তথ্য দিয়ে প্রভাব খাটাতেন। পাশাপাশি অধিদপ্তরের অসাধু চক্রকে টাকার বিনিময়ে ম্যানেজ করতেন। এ বিষয়টি দু'জনই স্বীকার করেছেন।
ওই সূত্র আরও জানায়, সাবরিনা জিজ্ঞাসাবাদে বলেছেন, গত মার্চে চুক্তি করার সময়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জেকেজির ট্রেড লাইসেন্স চেয়েছিলেন। তখন অধিদপ্তরের ডিজি মৌখিকভাবে বলেছিলেন আপাতত দ্রুত কাজ শুরু করতে হবে। পরে লাইসেন্স জমা দিলেই হবে। সে অনুযায়ী গত জুনে আরিফ ট্রেড লাইসেন্স জমা দেন। ডিবির এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসাধু চক্রটি জেকেজির ভুয়া সনদ দেওয়ার বিষয়ে কিছু জানত কিনা অথবা জানলেও কোনো অনৈতিক সুবিধা নিয়েছিল কিনা, সে বিষয়ে আরিফ-সাবরিনাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

আরও পড়ুন

×