ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

মাইলস্টোনে বিমান বিধ্বস্ত

সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখানো, কোচিং সেন্টার বন্ধসহ ৮ দাবিতে অভিভাবকদের বিক্ষোভ 

সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখানো, কোচিং সেন্টার বন্ধসহ ৮ দাবিতে অভিভাবকদের বিক্ষোভ 
×

ছবি: সংগৃহীত

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৫ | ১৭:৩৮

যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার দিনের স্কুলের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখানো এবং কোচিং সেন্টার বন্ধসহ আট দফা দাবি জানিয়েছেন রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অভিভাবকেরা। মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে দিয়াবাড়ি গোলচত্বরে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় নিহত ও আহত শিক্ষার্থীদের পরিবারের সদস্যরা মানববন্ধন করেন। এতে ৮ দফা দাবি জানানো হয়। এসময় তাদের হাতে ছিল সন্তানের ছবিযুক্ত প্ল্যাকার্ড, চোখে অশ্রু।

অভিভাবকদের দাবিগুলো হচ্ছে- ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা; সারা দেশে মাইলস্টোনসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করা; সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিটি নিহত শিশুর জন্য ৫ কোটি টাকা এবং আহতদের জন্য ১ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ; স্কুলের পক্ষ থেকে নিহতদের জন্য ২ কোটি এবং আহতদের জন্য ১ কোটি টাকা জরিমানা; রানওয়ে থেকে স্কুল সরিয়ে নেওয়া অথবা রানওয়ের অবস্থান পরিবর্তন; কোচিং ব্যবসার মূল হোতা স্কুল শাখার প্রধান শিক্ষিকা খাদিজাকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে অপসারণ ও বিচার; ঘটনার দিনের স্কুলের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখানো; বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ জনবসতিহীন এলাকায় করা এবং মানববন্ধন করতে চাইলে কনক নামের এক শিক্ষক এক অভিভাবকের গায়ে হাত তোলেন। তাকে অপসারণ করতে হবে। 

কোচিং না করলে মিসরা আদর করত না

নিহত শিক্ষার্থী মারিয়াম উম্মে আফিয়ার মা উম্মে তামিমা আক্তার বলেন, ‌আমার বাচ্চাটাকে কখনও কোচিংয়ে দিইনি। কিন্তু একদিন সে এসে বলল, আম্মু, আমি যদি কোচিং না করি, মিসরা আমাকে আদর করে না। আমি তখন ভেঙে পড়ি... দেড় মাস হলো দিয়েছি। কোচিংয়ে দেওয়ার পর সে খুশি হয়ে বলেছিল, মা, এখন মিসরা আমাকে অনেক আদর করে।

আফিয়া বাংলা মাধ্যমের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। তামিমা আক্তার বলেন, যে বাচ্চাগুলো মারা গেছে, সবাই কোচিং করত। পরীক্ষায় খারাপ করিয়ে চাপ দেওয়া হয়, যেন অভিভাবকেরা বাধ্য হয় কোচিং করাতে।

মানসিক টর্চার করে কোচিং করানোর অভিযোগ তুলে ধরেন নিহত বোরহান উদ্দীন বাপ্পীর বাবা মোহাম্মদ আবু শাহীন। তিনি বলেন, শিক্ষকেরা বলে আপনার ছেলে ক্লাসে পড়া পারে না। মানসিক টর্চার দেয়, যাতে কোচিংয়ে ভর্তি করাতে হয়। তার আরেক ছেলে বেলাল উদ্দীন প্লে গ্রুপে পড়ে, তাকেও কোচিং করানোর জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

একজন অভিভাবক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, স্কুল শাখার প্রধান খাদিজা মিস কোচিং ব্যবসার মূল হোতা। নিহত শিক্ষক মাহরীন চৌধুরী এ বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। কিন্তু খাদিজা মিস শোনেননি।

কেউ আমাদের কাছে আসেনি

মানববন্ধনে অংশ নেওয়া অভিভাবকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা সন্তান হারিয়েছি, তবু স্কুল কর্তৃপক্ষের কেউ এসে আমাদের পাশে দাঁড়ায়নি। উল্টো মানববন্ধনে আসা শিক্ষার্থীদের স্কুলে ডেকে নেওয়া হয়েছে। অভিভাবকেরা অভিযোগ করেন, মানববন্ধনের সময় কনক নামের এক শিক্ষক এক অভিভাবকের গায়ে হাত তোলেন। এর প্রতিবাদে তারা তার অপসারণও দাবি করেন।

মানববন্ধনে অংশ নেওয়া অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা স্লোগান দেন- কোচিংয়ের নামে ব্যবসা, বন্ধ কর, বন্ধ কর; ফুল-পাখি সব পুড়ল কেন, জবাব চাই, দিতে হবে; শিক্ষা না ব্যবসা- শিক্ষা, শিক্ষা। প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল- আমার সন্তানকে ফেরত দাও, নিরাপদ আকাশ চাই, দোষীদের বিচার চাই..।

ট্র্যাজেডির পরও নীরবতা

দিয়াবাড়ির আকাশে এখনও ভেসে বেড়াচ্ছে সেই কালো ধোঁয়ার স্মৃতি। অভিভাবকেরা বলছেন, এই দুর্ঘটনা কোনো একদিন হঠাৎ হয়নি- এটি অবহেলা, লোভ আর দায়িত্বহীনতার ফল। তাদের দাবি, সন্তান হারানোর শোক শুধু পরিবারের নয়, এটি গোটা সমাজের ব্যর্থতার প্রতীক। অভিভাবকদের চোখে এখন শুধু একটি লক্ষ্য- সত্য উদঘাটন ও দোষীদের শাস্তি। তাদের কথা, আমাদের ফুলগুলো ঝরে গেছে, কিন্তু যেন আর কোনো ফুল না ঝরে।

আরও পড়ুন

×